US Attacks Iran: মাটিতে ফলে তরল সোনা, ভেনিজুুয়েলার চেয়ে অনেক এগিয়ে, ইরানের তেলই পৃথিবীর মধ্যে সর্বোত্তম
Iranian Crude Oil: ইরানের তেল বাকিদের চেয়ে কতটা আলাদা, গুণমানেই বা কত এগিয়ে?

নয়াদিল্লি: নতুন বছরের শুরুতেই ভেনিজ়ুয়েলায় সামরিক পদক্ষেপ। রাতারাতি ভেনিজুয়েলায় ঢুকে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় আমেরিকা। ভেনিজ়ুয়েলার তেলের উপর নিজেদের কর্তৃত্ব ঘোষণা করে। আর তার দু’মাসের মাথায় ইজ়রায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলা, আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে হত্যা। ইরানে হামলার নেপথ্য়ে পরমাণু চুক্তি থেকে ইজ়রায়েলের অস্তিত্বরক্ষা, এমন একাধিক তত্ত্ব তুলে ধরা হচ্ছে যদিও, তবে দু’ক্ষেত্রেই একটি বিশেষ সংযোগ রয়েছে, তেল। ভেনিজ়ুয়েলা এবং ইরান, দুই দেশই খনিজ তেলে সমৃদ্ধ। তাই দুই দেশে সামরিক পদক্ষেপের নেপথ্যে আমেরিকার বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে কি না, প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। ভেনিজু়য়েলার তুলনায় গুণমানের ইরানে প্রাপ্ত তেল গুণমানের নিরিখে এগিয়ে। ইরানের তেল পৃথিবীর মধ্যে সেরা হিসেবেও গণ্য হয়। তাই আমেরিকার আসল উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। (Iranian Crude Oil)
কিন্তু ইরানের তেল বাকিদের চেয়ে কতটা আলাদা, গুণমানেই বা কত এগিয়ে? বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অপরিশোধিত তেল মানে অভিন্ন তরল নয়। বরং হাজার হাজার হাইড্রোকার্বন অণু মিশ্রণ সেটি, যা আসলে একসঙ্গে আবদ্ধ কার্বন এবং হাইড্রোজেন অণুর শৃঙ্খল বা চেন। এই শৃঙ্খলের রকমফেরের উপর অপরিশোধিত তেলের গঠন নির্ভর করে। কত দ্রুত, কত সহজে অপরিশোধিত তেল রূপান্তরিত করা সম্ভব, তার উপরই নির্ভর করে শোধনাগার থেকে কী বিক্রি হবে, গ্যাসোলিন, ডিজেল, বিমানের জ্বালানি, না কি অন্য পেট্রো-পণ্য গরম করার জ্বালানি তেল। শৃঙ্খল আকারে ছোট হলে, তা শোধন করে পেট্রোল, বিমানের জ্বালানি বের করা হয়। শৃঙ্খল আকারে বড় হলে, তা শোধন করার খরচও বেশি। এ থেকে পিচ, জ্বালানি তেল বের করা হয়। (US Attacks Iran)
অপরিশোধিত যখন শোধনাগারে আনা হয়, প্রথমে দীর্ঘ পাতন টাওয়ারের মধ্যে ফেলা হয় এবং স্ফুটনাঙ্ক অনুসারে সাজানো হয়। হালকা অণুগুলি উপরে উঠে আসে, যা থেকে উচ্চমানের জ্বালানি তৈরি হয়। ভারী অণুগুলি ডুবে থাকে। উপরের দিকে যা উঠে আসে, সেগুলি থেকে সর্বাধিক যা বের করা সম্ভব, তা বের করে আনাই কাজ শোধনাগারগুলির। অপরিশোধিত তেলের ঘনত্ব এবং সালফার উপাদান, তার গুণমান বিচার করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হালকা তেলের অর্থ সালফার কম। এর দামও বেশি। কারণ তা থেকে সহজে এবং সস্তায় পেট্রোল, ডিজেল বের করা যায়। এক্ষেত্রে যে পরিমাপক ব্যবহার করা হয়, তা হল আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের API Gravity. জলের API Gravity ১০। ১০-এর উপরে যা কিছু, তাকে তেল বলে ধরা হয়। ১০-এর থেকে API Gravity যত উপরে থাকবে, ততই হালকা হবে অপরিশোধিত তেল। ইরানের হালকা তেল ৩৩ থেকে ৩৬-এর মধ্যে পড়ে, যা মাঝারি এবং হালকার মধ্যবর্তী। এই তেলের চাহিদাই বেশি শোধনাগারগুলিতে। কম খরচে ভাল গুণমানের তেল বের করা যায় বলেই। মূলধন, সরঞ্জামও কম লাগে। তাই ইরানের তেলকে সর্বোত্তম অপরিশোধিত তেল বলা হয়।
ভেনিজ়ুয়েলায় সর্বাধিক খনিজ তেল মজুত থাকলেও, তার API Gravity ১৬। সালফার রয়েছে ৩ থেকে ৫ শতাংশ। সেটিকে লাভজনক ভাবে শোধন করতে কোকিং ইউনিট, হাইড্রোক্র্যাকার, সারফারমুক্ত করার সরঞ্জামের প্রয়োজন পড়ে। শোধনাগারগুলিতে ওই সব সরঞ্জাম রয়েছে। ভেনিজ়ুয়েলার তেল ইরানের বিকল্পও নয়। দু’টি পৃথক পণ্য, তার জন্য় পৃথক পরিকাঠামো প্রয়োজন। সেই তুলনায় US West Texas তেলের API Gravity ৩৯ থেকে ৪০-এর মধ্যে। সালফারের হার ০.২৫ শতাংশ। খাতায় কলমে আমেরিকার ওই তেল সবচেয়ে পরিষ্কার এবং শোধন করা সবচেয়ে সহজ। এতই হালকা ওই তেল যে শোধনাগার চালানোর জন্য় প্রয়োজনীয় পাতন প্রক্রিয়া চালানো যায় না। ফলে আদর্শ আণবিক ওজন অর্জন করতে আমেরিকার ওই তেলের সঙ্গে ভারী তেল মেশাতে হয়।
ইরানের মাঝারি হালকা তেলে সালফার রয়েছে ১.৩৬ থেকে ১.৫ শতাংশ। ফলে তা থেকে বের করা ৭০ শতাংশ তেলই উচ্চমানের হয়। তাই নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে, ঘুরপথে হলেও এতদিন ইরানের তেল আমদানি করে এসেছে বিভিন্ন দেশ। কোনও ভাবে সেখান থেকে তেলের জোগান বন্ধ হয়ে গেলে উথালপাথাল হয়ে উঠেছে পরিস্থিতি। স্বভাবতই আমেরিকা এবং ভেনিজু়য়েলার তেলের তুলনায়, ইরানের তেলের চাহিদা বেশি। ইরান থেকে হরমুজ প্রণালী হয়ে বেরনো প্রত্যেকটি তেলের ব্যারেল তাই মূল্যবান। ওই ব্য়ারেলে শুধুমাত্র তেল থাকে না, শোধনাগারের উপযুক্ত সর্বোত্তম তেল থাকে। আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল একযোগে ইরানে হামলা চালানোয় সেই জোগান বন্ধ হওয়ার জোগাড়। তাতেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম রাতারাতি বাড়তে শুরু করেছে।
এই মুহূর্তে যা পরিস্থিতি, তাতে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে ইরানের বিকল্প খুঁজছে সব দেশই। এমন পরিস্থিতিতে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে থাকা ভেনিজু়য়েলার তেলের চাহিদাও বাড়তে শুরু করেছে আগের থেকে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, ভেনিজু়য়েলা থেকে ৮ কোটি ব্যারেল তেল পেয়েছেন তাঁরা, যা কাতারের একটি ব্যাঙ্কের মাধ্য়মে তিনি নিজে ‘ম্যানেজ’ করছেন। ভেনিজ়ুয়েলায় তেল উত্তোলনের পরিকাঠামো এই মুহূর্তে সুবিধাজনক জায়গায় না থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আমেরিকার সংস্থাগুলি সেদিকে ঝুঁকতে শুরু করবে। ইরানের সঙ্গে যে যুদ্ধ চলছে এই মুহূর্তে তাতে ইজ়রায়েলকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন ভেনিজু়য়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো, যিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পর্যন্ত ট্রাম্পের হাতে তুলে দেন। ক্ষমতায় এলে ভেনিজু়য়েলার দূতাবাসও জেরুসালেমের হাতে তুলে দিতে অঙ্গীকার করেছেন। ২০১৮ সালে মারিয়া বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে চিঠি লিখে মাদুরো সরকারকে উৎখাতের আবেদনও জানিয়েছিলেন। ভেনিজু়য়েলায় মাদুরো সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল ইরানের। মাদুরো সরকারের পতনের পর ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ সময়ের অপেক্ষা ছিল বলে মনে করছেন অনেকেই। তবে ইরানের তেল নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও মন্তব্য করেননি ট্রাম্প। তবে ইরানে নতুন সরকার গড়ে উঠলে, সেখানকার অর্থনীতি নিয়ে আমেরিকা আলোচনায় এগোবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সেরা শিরোনাম

























