Ayatollah Ali Khamenei Obituary: অকেজো হাত, ক্ষুরধার মস্তিষ্ক, বৈপরীত্যে ভরা জীবনকাল…আয়াতোল্লা খামেনেই যুগের অবসান
Ayatollah Ali Khamenei: শনিবার সকালে ইরানে একযোগে হামলা চালায় আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল। লক্ষ্য যে খামেনেই ছিলেন, তা গোড়াতেই স্পষ্ট হয়ে যায়।

নয়াদিল্লি: শক্তহাতে অন্ধকারের মোকাবিলা। আগুনের লেলিহান শিখা, উল্কাবৃষ্টি ভেদ করে এগিয়ে যাওয়া। চেহারা দেখা না গেলেও, ঝলসে উঠছে তরবারির ফলা। ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ শাসক, আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডল থেকে শেষ বার পোস্ট করা হয় এমনই ছবি। বদরের যুদ্ধের সময় হজরত আলিকে যে ‘জুলফিকর’ তরবারিটি দিয়েছিলেন পয়গম্বর মহম্মদ, সেটিই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ছবিতে। শিয়া মুসলিমদের মধ্যে সাহসিকতার প্রতীক ‘জুলফিকর’ তরবারি। পশ্চিমি শক্তির রক্তচক্ষুর সামনে শিয়াদের মধ্যে সাহসিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন খামেনেইও। তাই তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডল থেকে পোস্ট করা ছবিটি যথেষ্ট অর্থবহ বলেই মনে করছেন সকলে। ওই একটি ছবি খামেনেইয়ের জীবনকালকে বর্ণনা করার জন্যও যথেষ্ট বলে মনে করছেন তাঁরা। (Ayatollah Ali Khamenei Obituary)
শনিবার সকালে ইরানে একযোগে হামলা চালায় আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল। লক্ষ্য যে খামেনেই ছিলেন, তা গোড়াতেই স্পষ্ট হয়ে যায়। কারণ মুহুর্মুহু হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় তাঁর বাড়ি ও দফতর। সেই ধ্বংসস্তূপের ছবি সামনে আসতেই প্রহর গোনা শুরু করে দিয়েছিলেন অনেকে। দেরিতে হলেও, শেষ পর্যন্ত খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবরে সিলমোহর দেয় ইরানও। খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর গত ২৪ ঘণ্টায় অদ্ভুত বৈপরীত্যও চোখে পড়ছে। খামেনেই বিরোধীদের একাংশ ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ উদযাপনে শামিল হয়েছেন যেমন, অনেকে আবার সাবধানী। খামেনেই বিরোধী হলেও, যে আগ্রাসনের শিকার হলেন খামেনেই, যেভাবে ইরানের সার্বভৌমত্ব খর্ব করা হল, তা মেনে নিতে পারছেন না তাঁরা। অন্য দিকে, আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের নিন্দা করে, ইরান সরকারের পাশেও দাঁড়িয়েছেন অনেকে। খামেনেইয়ের জীবনকালেও এমন বহু বৈপরীত্য চোখে পড়েছে। (Ayatollah Ali Khamenei)
১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল মধ্য ইরানের মাশাফে জন্ম আলি হোসেইনি খামেনেইয়ের। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। বাবা জাভেদ খামেনেই ইরাকের নাজাফ থেকে মাশাদে চলে আসেন। তিনি পেশায় আলিম, মুজতাহিদ ছিলেন। চার বছর বয়সে ‘কোরান’, ‘মকতব’ শিক্ষা শুরু খামেনেইয়ের। তবে শুধুমাত্র ধর্মশিক্ষার মধ্যে নিজেকে বেঁধে রাখেননি। ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গেও ওঠাবসা শুরু হয় তাঁর, যুক্ত হয়ে পড়েন Movement of God Worshipping Socialists আন্দোলনের সঙ্গে, যা আসলে একটি ইসলামি সমাজতন্ত্রের সমর্থক একটি রাজনৈতিক সংগঠন ছিল। কার্ল মার্কস, চে গেভারা, টিটো, আলি শরিয়তির দ্বারাও প্রভাবিত হন খামেনেই। ১৯৫৭ সালে নাজাফে গেলেও, শেষ পর্যন্ত মাশাদেই ফিরে আসেন। ১৯৫৮ সালে কোমে থিতু হয় গোটা পরিবার। সেখানে সৈয়দ হোসেইন বরুজা্দি এবং রুহোল্লা খোমেইনির সান্নিধ্যে আসেন খামেইনি। সেই সময় ইরানের ধর্মগুরুদের অধিকাংশই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ধর্মশিক্ষার চেয়ে রাজনীতিতে বেশি সক্রিয় ছিলেন খামেনেই।
পরবর্তীতে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে খামেনেই জানান, দরিদ্র পরিবারে দু’বেলার খাবারই জুটত অনেক কষ্ট করে। স্বামীর পুরনো জামা কেটে ছেলেমেয়েদের পোশাক বানিয়ে দিতেন তাঁর মা। মা যেহেতু ইমাম পরিবারের সদস্য, তাই তাঁর শৈশবেও জায়গা করে নেয় ধর্মশিক্ষা। প্রার্থনার সময় পেরিয়ে যাওয়ার ভয়ে একবার চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপিয়েও পড়েন তিনি। সময়ের সঙ্গে গণিত, ভূগোল, সর্বোপরি ইতিহাসের প্রতি আকর্ষণ জন্মায় তাঁর। তরুণ বয়সে ঝোঁক বাড়ে সাহিত্য, কবিতা, উপন্যাস পড়ার প্রতি। নিজে কবিতা লিখতে শুরু করেন তিনি। তবে খোমেইনির সান্নিধ্যই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় খামেনেইয়ের। রাজতন্ত্রের বিরোধী, মহম্মদ রেজা শাহ পেহলভির সমালোচক খোমেনেই তখন একটু একটু করে জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। দেশের তৈলভাণ্ডারকে পুরোপুরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা হলে, ১৯৫৩ সালে ব্রিটেনের MI6 এবং আমেরিকার CIA ইরানে অভ্যুত্থান ঘটায়। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ মোসাদ্দেগকে সরিয়ে ইরানে ফের রাজতন্ত্রের আগমন ঘটে, যার বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে শুরু করেন সাধারণ মানুষ।
সেই বিদ্রোহে শামিল হয়ে যান খামেনেইও। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে বার বার গ্রেফতার হন তিনি। শাহের গোপন পুলিশবাহিনী SAVAK তাঁকে গ্রেফতার করে দক্ষিণ-পূর্বের প্রত্য়ন্ত ইরানশেহরে নির্বাচনে পাঠিয়ে দেয়। ১৯৭৮ সালে সেখান থেকে ফিরে এসে ফের পেহলভির বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগ দেন খামেনেই। রাজতন্ত্র বিরোধী সেই বিপ্লবের অন্যতম রূপকার হয়ে ওঠেন তিনি। ইরানে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর সরকারেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। ১৯৮০ সালে দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হন। ইরান এবং ইরাকের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে আধা সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পসের সুপারভাইজার নিযুক্ত হন। বাগ্নী হওয়ার দরুণ তেহরানে শুক্রবারের নমাজে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বও বর্তায় তাঁর কাঁধে।
১৯৮১ সালে খামেনেইকে প্রাণে মেরে ফেলার চেষ্টা হয়। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে মসজিদের প্রার্থনাসভায় যোগ দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে প্রশ্নোত্তর পর্ব চলাকালীন টেপ রেকর্ডারে লুকনো বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় মুজাহিদিন-ই-খালক। খামেইনির টেবিলে প্রশ্ন লেখা কাগজ জমা দেওওয়ার সময় টেপ রেকর্ডারটির বোতাম টিপে দেয় এক তরুণ। কিছু ক্ষণ পর টেপ রেকর্ডার থেকে অদ্ভুত ভাবে বাজতে থাকে। এর পরই তীব্র শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। ওই বিস্ফোরণের গুরুতর জখম হন খামেনেই। ডান হাতটি অক্ষম হয়ে পড়ে, কণ্ঠনালী, ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেশ কয়েক মাস চিকিৎসাধীন থাকলেও ডানহাতের কর্মক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে ফেলেন। সেই হাত ঢেকে রাখতেন বরাবর। ১৯৮১ সালে মহম্মদ-আলি রাজাইকে হত্যা করা হলে রেকর্ড ভোটে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন খামেনেই। ধর্মগুরু হিসেবে দেশের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট তিনিই। গোড়া ধর্মচর্চাকে প্রশাসন থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন খামেনেই, কিন্তু পরবর্তীতে নিজেই মত বদলান। ১৯৮৫ সালে পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি।
১৯৮৯ সালে খোমেইনির মৃত্যুতে ইরানের ভাগ্যও বদলে যায়। মৃত্যুর আগে দীর্ঘদিনের সহযোগী, তথা পূর্ব নির্ধারিত উত্তরাধিকারী আয়াতোল্লা হোসেন আলি মনতাজেরির সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে খোমেইনির। সংবিধানে রদবদল ঘটাতে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। বলা হয় খামেনেইকে নিযুক্ত করতে। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ শাসক হতে গেলে যে যোগ্যতার প্রয়োজন ছিল, তা ছিল না খামেনেইয়ের। শীর্ষস্থানীয় শিয়া ধর্মগুরু হতে যে ‘হোজাতোলেসলাম’ উপাধির প্রয়োজন ছিল, তাঁর তা ছিল না। খামেনেইয়ের জন্য সেই মাপকাঠি শিথিল করা হয় সেই সময়। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেও খামেনেইয়ের বক্তব্য ছিল, “আমি বিশ্বাস করি, এই পদে বসার যোগ্য নই আমি। আপনারাও হয়ত জানেন, আমিও জানি। তাই আসল নয়, প্রতীকী নেতৃত্ব চলবে।” কিন্তু খামেনেইয়ের শাসনকাল কোনও অর্থেই প্রতীকী ছিল না। আয়াতোল্লা হিসেবে আবির্ভূত হয়েই দেশ পুনর্গঠনের কাজে হাত দেন খামেনেই। ইরাকের সঙ্গে আট বছর ব্যাপী যুপদ্ধের ক্ষত সারিয়ে পুনরায় ইরানকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে সচেষ্ট হন। ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধে ১০ লক্ষের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলেন, ধসে গিয়েছিল দেশের অর্থনীতি। ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক মহল থেকে বিষয়টি নিয়ে সেভাবে সাড়া না মেলায়, পশ্চিম শক্তি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন খামেনেই। নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হতেন তিনি, যার ফলে রেভলিউশনারি গার্ডসের সঙ্গে ভরসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাঁর। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরাসরি তাঁর কাছে খবর এসে পৌঁছত। ফলে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল তাঁর।
জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির মিডল ইস্ট স্টাডিজের অধ্যাপিকা নার্গিস বাজোঘলির কথায়, “খোমেইনির মতো কোনও ভিত্তি ছিল না খামেনেইয়ের। তাই গোড়া থেকে সব কিছু শুরু করেন তিনি। তরুণ প্রজন্মের জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজান। তরুণ প্রজন্ম যাতে সামরিক বাহিনীতে অংশ নিতে পারে, তার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন।” রেভলিউশনারি গার্ডস-কেও অনেক সুযোগ সুবিধা প্রদান করেন খামেনেই, যাতে তাদের অর্থের জোগানে ঘাটতি না থাকে, প্রশিক্ষণ চলে অবাধে। নতুন নতুন পদ তৈরি হয় রেভলিউশনারি গার্ডসে। কিন্তু পশ্চিমি শক্তির বিরোধিতা করতে গিয়ে দেশের অন্দরে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয় খামেনেইকে। নয়ের দশক থেকেই বিপ্লবের ইতিহাস বিস্মৃত হতে থাকে। আন্তর্জাতিক মহলে ইরানের গ্রহণযোগ্যতা তৈরির সপক্ষে সওয়াল করতে থাকেন বহু মানুষ। পরিবর্তনের ডাক দিয়ে ১৯৯৭ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মহম্মদ খাতামি।
২০০৯ সালে আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে চান খাতামি। শেষ পর্যন্ত মীর-হোসেন মৌসভির পরামর্শে পিছু হটেন তিনি। ওই বছর পশ্চিমি শক্তি বিরোধী মাহমুদ আহমদিনেজাদের প্রেসিটেন্ড নির্বাচন ঘিরে বিরোধ দেখা দেয়। প্রতিবাদ, বিক্ষোভ শুরু হয় দেশ জুড়ে। সেই বিক্ষোভ সামাল দিতে নামানো হয় আধাসেনা বাহিনীকে, যার নিন্দায় সরব হয় বিরোধী শিবির। হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়। মারা যান অনেকে। কিন্তু নির্বাচনী ফলাফলকে সমর্থন জানান খামেনেই। গোটা পরিস্থিতির জন্য পশ্চিমি শক্তিকেই দায়ী করেন ইরানের নেতৃত্ব।
খামেনেই বাস্তববাদী হিসেবেও পরিটিত ছিলেন। পশ্চিমি বিশ্বের বিরুদ্ধে লড়তে হলে কৌশল পাল্টাতে হবে বলে বিশ্বাস করতেন তিনি। তাই পশ্চিমি আগ্রাসনের বিরোধিতা করলেও, আলাপ-আলোচনার পথে এগোতে রাজি ছিলেন। ২০১৫ সালে পরমাণু শক্তি প্রকল্প নিয়ে নিষেধাজ্ঞার ভারে যখন ধুঁকছে ইরান, সেই সময় প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে পশ্চিমি বিশ্বের সঙ্গে আলোচনার পথে এগনোর অনুমতি দেন তিনি। এর ফলে ২০১৫ সালে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার আওতায় পরমাণু প্রকল্প নিয়ে কিছুটা পিছু হটে তেহরান। পরিবর্তে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয় অনেকটা। কিন্তু এর তিন বছর পরই আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকার ওই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ান। নতুন করে নিষেধাজ্ঞা চাপান ইরানের উপর। এর পর গত কয়েক বছরে পরমাণু প্রকল্পে ইউরেনিয়ামের ব্যবহার ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি করে উরান। এর ফলে ৯০ শতাংশ অস্ত্রশস্ত্রকে পরমাণু অস্ত্রে পরিণত করার রাস্তা পরিষ্কার হয়ে যায়। ইরান বরাবর দাবি করে এসেছে, কারও উপর হামলা করা তাদের লক্ষ্য নয়। বরং স্বাভাবিত কারণেই পরমাণু প্রকল্পের সূচনা করেছে তারা। ২০০৩ সালে থামেনেই নিজে পরমাণু অস্ত্র তৈরি, ব্যবহার এবং মজুত রাখার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
পেট্রোলের মূল্যবৃদ্ধি ঘিরে ২০১৯ সালে নতুন করে তেতে ওঠে ইরান। সেবারও বিক্ষোভকারীদের উপর বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। ১০০-র বেশি মানুষ মারা যান বলে জানায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। আন্দোলনকারীদের ‘গুন্ডা’ বলে আক্রমণ করেন খামেনেই। বহির্শত্রুর ইন্ধন রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন। এতে আরও কোণঠাসা হতে শুরু করে ইরান। ইব্রাহিম রইসি-র প্রেসিডেন্ট হওয়া নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়। আটের দশকে গণহত্যার ঘটনায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে চর্চা শুরু হয় নতুন করে। বহু মানুষ নির্বাচনে অংশই নেননি। ২০২২ সালে হিজাব ‘ঠিক করে না পরা নিয়ে’ নীতি পুলিশের হাতে নিগ্রহের শিকার হন মেহসা আমিনি নামের এক তরুণী। পুলিশি হেফাজতে তাঁর মৃত্যু ঘিরে তপ্ত হয়ে ওঠে গোটা দেশ। ইরানের সাধারণ নাগরিকের উপর রক্ষণশীলতা চাপিয়ে দেওয়ার জন্য নিন্দিত হন খামেনেই। যেভাবে আন্দোলনকারীদের উপর বলপ্রয়োগ করা হয়, ৫০০-র বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে আন্তর্জাতিক মহলেও। কিন্তু সেবারও গোটা পরিস্থিতিতে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জুড়ে দেন খামেনেই। পশ্চিমি বিশ্ব, বহির্শত্রুর ইন্ধন রয়েছে বলে দাবি করেন।
নিজের দেশের সীমান্তের বাইরেও প্রতিরোধ গড়ে তোলার পক্ষপাতী ছিলেন খামেনেই। সেই মতো ‘প্রতিরোধ অক্ষশক্তি’ গড়ে তোলেন তিনি। রেভলিউশনারি গার্ডসের শাখা কুদস বাহিনীর কম্যান্ডার কাসেম সোলেমনি এর রূপকার ছিলেন, যার আওতায় লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হেজবোল্লা, সিরিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ, প্যালেস্তাইনের হামাস, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের সশস্ত্র সংগঠনও ইরানের সঙ্গে হাত মেলায়। ২০২০ সালে সোলেমনিকে হত্যা করে আমেরিকা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের তরফে ইজ়রায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়। সেই থেকে এখনও পর্যন্ত গাজায় ৭০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছে ইজ়রায়েলের হাতে। হামাসের শীর্ষ নেতৃত্বের অধিকাংশও মারা গিয়েছেন। লেবাননে হেজবোল্লাকেও আক্রমণ করে ইজ়রায়েল। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হাসান নাসরাল্লার মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদ্রোহীদের হাতে সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন ঘটে। সিরিয়ার মাধ্যমে হেজবোল্লার সঙ্গে যে সংযোগ গড়ে উঠেছিল ইরানের, তা ভেঙে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে ইজ়রায়েলের প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে সরব শক্তি সঞ্চয় করতে শুরু করেন। ২০২৫ সালের ১৩ জুন আমেরিকার সহযোগিতায় ইজ়রায়েলি সেনা ইরানের একাধিক শীর্ষস্থানীয় পরমাণু বিজ্ঞানীকে হত্যা করে। ইরানের পরমাণু গবেষণাকেন্দ্রগুলি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ইরান যাতে পরমাণু শক্তিধর না হয়ে উঠতে পারে, তার জন্যই হামলা চালানো হয় বলে দাবি করে ইজ়রায়েল। যদিও আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগ এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংগঠনের দাবি ছিল, পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে তখনও দূরে ছিল ইরান। আমেরিকার সঙ্গে পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই ওই হামলা চালানো হয়। জবাবে তেল আভিবে হামলা চালায় ইরানও। এর পাল্টা আমেরিকা ইরানের পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রগুলিতে মুহুর্মুহু বোমাবর্ষণ করে। সেই সময়ই খামেনেইকে হত্যা করার ডাক দেন নেতানিয়াহু। ট্রাম্প নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু ইরান জানিয়ে দেয়, হুমকির সামনে মাথা নোয়াবে না তারা। খামেনেই বলেন, “ইতিহাস সাক্ষী, ইরান কখনও আত্মসমর্পণ করবে না।” ১২ দিন ব্যাপী যুদ্ধের সময় ইজ়রায়েলের তরফে ইরানের সাধারণ মানুষকে অভ্যুত্থান ঘটাতে আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু সেবারও তেমন কিছু ঘটেনি।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞার গেরো ক্রমশ গলায় চেপে বসতে থাকে ইরানের। ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে দলে দলে রাস্তায় নামতে শুরু করেন ইরানীয়রা। খামেনেইয়ের মৃত্যু কামনা করে স্লোগান ওঠে দেশে। সেই বিক্ষোভে ৩০০০-এর বেশি মানুষ মারা যান বলে জানা যায়। আমেরিকার মানবাধিকার সংগঠন দাবি করে, নিহতের সংখ্যা ছিল ৭০০০। এর দরুণ সামাজিক বিধিনিষিধ কিছুটা শিথিল করা হয় ইরানে। নতুন করে আলোচনা শুরু হয় আমেরিকার সঙ্গে। নিষেধাজ্ঞা থেকে রেহাই পেতে পরমাণু প্রকল্পে রাশ টানা নিয়ে কথা শুরু হয়। আলোচনায় মধ্যস্থতা করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আলোচনা সফল হয়নি। ইরানকে পরমাণু প্রকল্প থেকে পুরোপুরি সরে দাঁড়াতে হবে বলে দাবি তোলে আমেরিকা। ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমানো, আঞ্চলিক সহযোগীদের সাহায্য় না জোগানোর দাবিও জানানো হয়। ইরানের তরফে অন্য সব ক্ষেত্রে নমনীয় ভাব দেখানো হলেও, ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি হ্রাসে রাজি হয়নি তারা। ইরাকে যে আমেরিকা বিরাট বাহিনী মোতায়েন রেখেছে, তাও স্মরণ করায় তারা। শেষ পর্যন্ত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের ঘোষণা করেন ট্রাম্প। ইরানে যে তাঁরা ক্ষমতার পালাবদল চাইছেন, তাও স্পষ্ট জানিয়ে দেন। ১ ফেব্রুয়ারি মারা যান খামেনেই।
























