Ranji Trophy: এগোচ্ছে বিশ্বক্রিকেট, অন্ধকারে বাংলা, রঞ্জির লজ্জা বাড়িয়ে ভুল ধরিয়ে দিল প্রতিপক্ষ কোচ!
BCCI: গোটা ক্রিকেট বিশ্ব যখন এগোচ্ছে, বাংলা ক্রিকেট দল তখন পড়ে প্রাগৌতিহাসিক যুগে। রঞ্জি ট্রফিতে ঘরের মাঠে সেমিফাইনালে জম্মু ও কাশ্মীরের কাছে হেরে লজ্জার বিদায়ের পর যা নিয়ে শুরু হয়ে গিয়েছে বিতর্ক।

সন্দীপ সরকার, কলকাতা: বব উলমার সেই নয়ের দশকে ল্যাপটপ কোচিং করিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। পরে যে রাস্তায় হেঁটে প্রযুক্তি ও দক্ষতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে ক্রিকেট কোচিংয়ে বিপ্লব এনে ফেলেছেন ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বিভিন্ন কোচেরা। প্রতিপক্ষের সব খুঁটিনাটি তথ্য এখন সকলের হাতের নাগালে।
অথচ বাংলা দলে ভিডিও বিশ্লেষণ করে অঙ্ক সাজানোর পদ্ধতি এখনও পিছনের সারিতে! এখনও প্রযুক্তির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় স্বতঃস্ফূর্ততা! প্রতিপক্ষের সেরা খেলোয়াড়ের শক্তি-দুর্বলতা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণের পরিবর্তে ভোকাল টনিক অর্থাৎ কথা বলে মনোবল বাড়ানোয় প্রাধান্য দেওয়া হয়!
গোটা ক্রিকেট বিশ্ব যখন এগোচ্ছে, বাংলা ক্রিকেট দল তখন পড়ে প্রাগৌতিহাসিক যুগে। রঞ্জি ট্রফিতে ঘরের মাঠে সেমিফাইনালে জম্মু ও কাশ্মীরের কাছে হেরে লজ্জার বিদায়ের পর যা নিয়ে শুরু হয়ে গিয়েছে জোর বিতর্ক। বাংলা ক্রিকেট দলের অন্দরেও অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি। কোচ লক্ষ্মীরতন শুক্লকে নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে ক্রিকেটারদের মানসিক দৃঢ়তা ও দায়বদ্ধতাকেও। প্রযুক্তি ব্যবহারে কেন এত অনীহা, জোরাল প্রশ্ন উঠছে ময়দানে।
কল্যাণীতে বেঙ্গল ক্রিকেট অ্যাকাডেমির মাঠে প্রথম ইনিংসের লিড নেওয়ার পরেও ম্যাচ হেরেছে বাংলা। জম্মু ও কাশ্মীরের বিরুদ্ধে খেলতে নামার আগে কি পর্যাপ্ত হোমওয়ার্ক সেরেছিলেন অভিমন্যু ঈশ্বরণরা? আকিব নবি এক জায়গায় বল করে দুদিকে স্যুইং করালে কীভাবে সামলানো হবে, কিংবা আব্দুল সামাদ ক্রিজে নেমে আগ্রাসী ব্যাটিং শুরু করলে থামানো হবে কী উপায়ে, তা নিয়ে নীল নকশা তৈরি হয়েছিল? বাংলা দলের অনেকের সঙ্গে কথা বলেও সদর্থক উত্তর পাওয়া গেল না।
বাংলার কোচ লক্ষ্মীরতনকে ম্যাচের আগে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বলেছিলেন, 'আমরা প্রতিপক্ষ নিয়ে ভাবি না। নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে ভাবি।' যদিও সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে অরুণ লাল, বাংলার প্রাক্তন অধিনায়ক তথা শেষ রঞ্জি জয়ী দলের সদস্য এরকম অনেকেই যে মনোভাব মেনে নিতে পারছেন না। প্রতিপক্ষকে নিয়ে হোমওয়ার্কের অভাব বাংলাকে ভুগিয়েছে, মেনে নিচ্ছেন সকলেই।
জম্মু ও কাশ্মীর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, শুধুমাত্র হোমওয়ার্ক দলের পারফরম্য়ান্সকে কোথায় তুলে নিয়ে যেতে পারে। রঞ্জি ফাইনালে ওঠার পর দলের একজন বলছিলেন, 'প্রথম ইনিংসে সুদীপ কুমার ঘরামি ১৪৬ রান করার পরই আমরা বিশ্লেষণে বসেছিলাম। আমাদের বোলিং কোচ ভিডিও দেখে বলে দেন যে, সুদীপ শট খেলার সময় ভেতরে সামান্য শাফল করে আসে। তাই দ্রুত পরিকল্পনা হয় যে, দ্বিতীয় ইনিংসে ওকে অফ-মিডল স্টাম্প লাইনে বল করে বাইরে বার করা হবে। সেই ফাঁদেই পা দিয়ে সুনীল কুমারের বলে দ্বিতীয় ইনিংসে কোনও রান না করে এলবিডব্লিউ হয় সুদীপ।' জম্মু-কাশ্মীর পারলে, বাংলা পারবে না কেন? প্রশ্ন উঠছে।
লজ্জা বাড়াচ্ছে আরও এক ঘটনা। বাংলার পেসার মুকেশ কুমারের পারফরম্যান্স নিয়ে দলে অসন্তোষ রয়েছে। যদিও ম্যাচের শেষে জম্মু ও কাশ্মীরের বোলিং কোচ পি কৃষ্ণকুমার বাংলা শিবিরে এসে বলে গিয়েছেন যে, মুকেশ বল করার সময় ডানহাতি পেসারের ল্যান্ডিং ফুটে সমস্যা হচ্ছে। পা 'ব্রেক' করে যাচ্ছে। সেটা মেরামত করলেই ধারাল হয়ে উঠবেন মুকেশ। যা শুনে মুগ্ধ বাংলা শিবিরের অনেকে। এত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ দেখে তাঁরা অভ্যস্ত নন যে! মনে করিয়ে দেওয়া যাক, প্রাক্তন ক্রিকেটার কৃষ্ণকুমার রাজস্থানের রঞ্জি জয়ী দলের সঙ্গেও ছিলেন।
বলা হচ্ছে, বাংলার পেস বোলিং কোচ শিবশঙ্কর পাল কিংবা স্পিন বোলিং কোচ অরূপ ভট্টাচার্যের ভূমিকা তাহলে ঠিক কী? কেন তাঁরা বোলারদের রোগ সারাতে ব্যর্থ হচ্ছেন? এক মহম্মদ শামি আর কিছুটা আকাশ দীপ বাদ দিলে হাতে পড়ে থাকে শুধু পেন্সিল। ঈশান পোড়েল হারিয়ে যাচ্ছেন। সূরয সিন্ধু জয়সওয়ালকে চোখে দেখা যাচ্ছে না। কোনও স্পিনার উঠে আসছে না। প্রদীপ্ত প্রামাণিকের মতো স্পিনার দলের বাইরে। বিশাল ভাটিকে দিয়ে চেষ্টা করা হয়েছিল। বাঁহাতি স্পিনার বিশাল ভাটিকে সিএবি থেকেও যেভাবে তুলে ধরা হচ্ছিল, তাতে ময়দানে কানাঘুষো শুরু হয়েছিল, বাংলা ক্রিকেট কি বিষাণ সিংহ বেদী পেল নাকি! বিশাল তিনটি রঞ্জি ম্যাচ খেলে ৪১.৫ ওভার বল করে ২টি উইকেট পেয়েছেন। এই মরশুমেই রঞ্জি অভিষেক হওয়া অফস্পিনার রাহুল প্রসাদ ৪ ম্যাচ খেলে ৫৭ ওভার বল করে পেয়েছেন ৭ উইকেট। রঞ্জির সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি একশো বোলারের তালিকার ধারেকাছেও নেই!
এই ব্যর্থতার দায় কার? উঠছে প্রশ্ন।
মরশুমের শুরুতেই বেনজিরভাবে ৫০ জন ক্রিকেটারের সম্ভাব্য দল ঘোষণা করেছিলেন বাংলার নির্বাচকেরা। যা শুনে অন্য রাজ্যের নির্বাচকেরা হাসাহাসি করছেন। রঞ্জি ট্রফির সম্ভাব্য দল যে ৫০ জনের হতে পারে, সেই ধারণাই নাকি কারও ছিল না। পথ দেখিয়েছে বাংলা।
বাংলা শিবিরে আর এক আজব তথ্য পাওয়া গেল। প্রাথমিক দলের ৫০ জনকে নিয়েই প্রি সিজন ট্রেনিং শুরু হয়েছিল। যদিও মরশুমের মাঝপথে এসে তাঁদের অনেকের কে কোথায় রয়েছেন, কী খেলছেন, বাংলা দলেরই অনেকে জানেন না। অভিষেক পোড়েল চোট পাওয়ার পর উইকেটকিপার খুঁজতে গিয়েই তো নাজেহাল অবস্থা। তাহলে কেন এতজন ক্রিকেটারকে নিয়ে মরশুম শুরুর কথা ভাবা হচ্ছে? সবাইকে প্রাক মরশুম প্রস্তুতিতে দলের সঙ্গে রেখে দেওয়া মানে শুধু খরচ বৃদ্ধিই নয়, অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা। অথচ রিজার্ভ বেঞ্চই তৈরি হচ্ছে না!
বঙ্গ ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত অনেকে বলছেন, বাংলার ফিল্ডিং নিয়েও সমস্যা রয়েছে। ক্রিকেটারেরা এমনভাবে শরীর ছুঁড়ে বল বাঁচাচ্ছেন যে, চোট লাগছে। ক্যাচ পড়া তো আছেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ফিল্ডিংয়ের সঙ্গে একেবারেই বেমানান। ফিল্ডিং কোচ চরণজিৎ সিংহকে নিয়েও থাকছে প্রশ্ন। দাবি উঠছে, আর শ্রীধরের মতো বিশেষজ্ঞ এনে কেন ফিল্ডিংয়ের কোনও শিবির করা হচ্ছে না!
শোনা গেল, সেমিফাইনালে হারের পর, বিশেষ করে দ্বিতীয় ইনিংসে ৯৯ রানে অল আউট হওয়ার পর কোচ লক্ষ্মীরতন অধিনায়ক অভিমন্যু ঈশ্বরণ-সহ দলের ক্রিকেটারদের যে ভাষায় ভর্ৎসনা করেছেন, তা কোথাও সীমা লঙ্ঘন করেছে। ব্যর্থতার মাঝেও যা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে ক্রিকেটারদের মধ্যে। বলাবলি হচ্ছে, কোচ এভাবে দোষারোপ করলে ক্রিকেটারদের ওপর চাপ কমার পরিবর্তে বাড়বে বৈকি!
পরিকল্পনার অভাবের কথাও বলা হচ্ছে। জম্মু কাশ্মীরের পেস বোলিং নির্ভর আক্রমণ সত্ত্বেও কল্যাণীতে সবুজ পিচে খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে রান তাড়া করে জিতছিল বলে এমনই বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয় যে, পুদুচেরির বিরুদ্ধে হায়দরাবাদের মন্থর পিচেও রান তাড়া করার কৌশল নেওয়া হয়। পিচ না বুঝে। ৮১ রানে সেই ম্যাচ হেরে টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে যায় বাংলা। কেন পরিস্থিতি অনুযায়ী স্ট্র্যাটেজি তৈরি করা হচ্ছে না, সেই প্রশ্নও রয়েছে।
রঞ্জি ট্রফি থেকে বাংলার বিদায়ে বিষণ্ণ সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও। বৃহস্পতিবার ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ় বনাম ইতালি টি-২০ ম্যাচ ছিল। খেলা দেখার ফাঁকে সৌরভ ক্লাব হাউসে দাঁড়িয়ে বললেন, 'এবার যেরকম গ্রুপ পড়েছিল, ঘরের মাঠে নক আউট খেলছিলাম, আশা করেছিলাম ভাল কিছু হবে। একটা খারাপ সেশনে সব পণ্ড হল। রঞ্জি ট্রফি জেতা সহজ নয়।'
বাংলার ব্যর্থতার মরশুম শেষে আত্মসমীক্ষায় বসছেন কবে? সৌরভ বললেন, 'এখনই রিভিউয়ের কিছু নেই। একটা ম্যাচ খারাপ গিয়েছে।' কোচ হিসাবে লক্ষ্মীরতনের বিকল্প নিয়ে নাকি চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। কোচ বা সাপোর্ট স্টাফেদের কোনও বদল হচ্ছে? সৌরভ বলছেন, 'লক্ষ্মী খুব খেটেছে। ভাল কাজ করেছে। বসব ওর সঙ্গে।'
বাংলার ক্রিকেটপ্রেমীরা দিনবদলের আশায়।




















