Ranji Trophy: ৫০ জনের দল! বিশ্লেষণ ছাপিয়ে অন্ধবিশ্বাসে আস্থা! বাংলার হারের ময়নাতদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য
Bengal Cricket Team: সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে গেলেই যে ভাল ক্রিকেট খেলা যায় না, ক্রিকেটারদের চাপমুক্ত রাখা যায় না, বাংলার সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার, প্রাক্তন অধিনায়ক লক্ষ্মীরতন শুক্ল কবে বুঝবেন?

সন্দীপ সরকার, কলকাতা: মাঠে নামবে ১১ জন ক্রিকেটার। ম্যাচের দল করতে হবে ১৫ জনের। মরশুমের শুরুতে সব রাজ্যই ২৫ বা ৩০ জনের একটা সম্ভাব্য দল ঘোষণা করে। যাদের নিয়ে মরশুম শুরুর আগে থেকেই ঘষামাজা করা হয়। ট্রেনিং চলে। ফিটনেস ড্রিল শুরু হয়ে যায়।
গত বছরের জুলাই মাসে বাংলার যে সম্ভাব্য সিনিয়র দল ঘোষণা করা হয়েছিল, সেখানে রাখা হয়েছিল ৫০ জনের নাম! যা শুনে অনেকে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। বলাবলি শুরু হয়েছিল, সিনিয়র দলে খেলার মতো এত প্রতিভা রয়েছে বাংলায়? এও আলোচনা হয় যে, নির্বাচনের আগে সিএবি-তে কি সব ক্লাবকে খুশি করার কৌশল নেওয়া হয়েছে সম্ভাব্য তালিকায় সেই ক্লাবের ক্রিকেটার রেখে?
যদিও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ায় যে, অভিষেক পোড়েল চোট পাওয়ার পর বিকল্প উইকেটকিপার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। শাকির হাবিব গাঁধীকে খেলানো হয়। যিনি উইকেটের পিছনে ধরেন পাঁচ বল, ফেলেন পাঁচটি!
রঞ্জি ট্রফিতে ফের এক হতাশার মরশুম। ঘরের মাঠে সেমিফাইনালে লজ্জাজনকভাবে হারতে হয়েছে জম্মু ও কাশ্মীরের কাছে! প্রথম ইনিংসে লিড নেওয়ার পরেও দ্বিতীয় ইনিংসে ৯৯ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল বাংলা। ১২৬ রান তাড়া করতে নেমে ৪ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যপূরণ জম্মু ও কাশ্মীরের। বাংলার ক্রিকেটারেরা যখন মুখ লুকোচ্ছেন, কল্যাণীর বেঙ্গল ক্রিকেট অ্যাকাডেমির মাঠে বিজয়োৎসব চলছে আকিব নবি-আব্দুল সামাদদের। কোচ অজয় শর্মাকে কাঁধে তুলে ভিকট্রি প্যারেড চলছে। বাংলা ক্রিকেটের কঙ্কালসার চেহারাটা ফের বেআব্রু করে দিল জম্মু ও কাশ্মীর।
বাংলার কোচ লক্ষ্মীরতন শুক্ল দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে চারবার রঞ্জি ট্রফি খেলে দুবার গ্রুপ থেকে বিদায় বাংলার। একবার সেমিফাইনাল, একবার ফাইনাল। সীমিত ওভারের ক্রিকেট হোক বা লাল বলের ফর্ম্যাট - ট্রফি শূন্য।
কী কারণে এই বিপর্যয়? হারের ময়নাতদন্তে বসে উঠে আসছে একাধিক কারণ। অনেক প্রশ্ন। কেন ৫০ জনের সম্ভাব্য দল গড়ে শুরুতেই একটা অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্টের পরিস্থিতি তৈরি করা হবে? কেন ৪১ বছরের অনুষ্টুপ মজুমদারকে এখনও টেনে নিয়ে যাওয়া হবে? ৯ ম্যাচের ১৩ ইনিংসে যিনি করেছেন ৩৯৩ রান। এক ইনিংসে ১৩৫ রান, বাকি ১২ ইনিংসে ২৫৮। বাংলার প্রাক্তন অধিনায়ক ও কোচ অশোক মলহোত্র পর্যন্ত বলছেন, 'কখন থামতে হবে, সেটা তো একজন ক্রিকেটারকে জানতে হবে।' সূরয সিন্ধু জয়সওয়ালের ভূমিকাটা ঠিক কী? কেন সুমন্ত গুপ্তকে বিশেষজ্ঞ ব্যাটার হিসাবে খেলালেও নামানো হচ্ছে আট নম্বরে?
বাংলা শিবির থেকেও নানা প্রশ্ন উঠছে। কেউ কেউ বলছেন, প্রতিপক্ষের ক্রিকেটার ধরে ধরে বিশ্লেষণ করা নিয়ে নাকি অনীহা রয়েছে টিম ম্যানেজমেন্টের। এখন যেখানে অনেক দল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) পর্যন্ত ব্যবহার করছে স্ট্র্য়াটেজি তৈরিতে, ভিডিও অ্যানালিস্ট চুলচেরা কাটাছেঁড়া করে প্রতিপক্ষের সেরা ব্যাটার বা বোলারের শক্তি-দুর্বলতা বার করে ফেলেন, সেখানে বাংলা শিবিরে নাকি প্রাধান্য় পায় ভোক্যাল টনিক ও নানা কুসংস্কার। সেটা 'চলো ভাই করে দেখাই' মার্কা স্লোগান হোক, মন্দিরে পুজো দেওয়া হোক, কিংবা দাড়ি না কাটা, ম্যাচের আগের দিন সন্ধ্যায় ড্রেসিংরুমে আসা এমন বিভিন্ন বিষয়।
বাংলার কোচ লক্ষ্মীরতন শুক্লর কাছে প্রতিপক্ষের কোনও নামী প্লেয়ারকে নিয়ে কী কৌশল জানতে চাইলেই বলে থাকেন, 'আমরা প্রতিপক্ষ নিয়ে ভাবছি না। নিজেদের নিয়ে ভাবছি।' যা শুনে স্তম্ভিত বাংলার শেষ রঞ্জি জয়ী কোচ সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বলছিলেন, 'বাংলা শিবিরের মানসিকতা পাল্টাতে হবে। আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রতিপক্ষ দেখে সেই অনুযায়ী দল তৈরি করতে হবে, কৌশল সাজাতে হবে। উইকেট দেখে একাদশ নির্বাচন করতে হবে। প্রতিপক্ষের শক্তি ও দুর্বলতা নিয়ে আরও ভাবতে হবে। শুধু নিজেদের নিয়ে ভেবে ম্যাচ খেলব, এই মানসিকতার আমূল পরিবর্তন দরকার। ক্রিকেট এখন অনেক এগিয়ে গিয়েছে।'
সাপ্লাই লাইন নিয়েও কি যথেষ্ট পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল বাংলা দল বা সিএবি-র তরফে? সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ভিশন ২০২০ বা ভিশন ২০২৮ প্রকল্প হয়েছে। কিন্তু বলার মতো প্লেয়ার উঠে আসেনি। অভিষেক পোড়েল চোট পেলে বিকল্প উইকেটকিপার কিংবা শাহবাজ আমেদ না খেললে পরিবর্ত স্পিনার খুঁজতে গাঁ উজাড় হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
কেন এত উদাসীনতা? কেন তৃণমূল স্তরে আরও জোর দেওয়া হবে না? কেন একটা শক্তিশালী রিজার্ভ বেঞ্চ তৈরি থাকবে না? প্রশ্ন অনেক। সদুত্তর দেওয়ার লোক নেই। থাকবেই বা কী করে? বাংলার কোচ যে ফতোয়া জারি করেছেন, ম্যাচের আগে বা ম্যাচ চলাকালীন কোনও ক্রিকেটার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন না। এমনকী, দিনের সেরা পারফর্মারের মুখেও কুলুপ। যাবতীয় কথা বলবেন শুধু কোচ। যা শুনে পোড়খাওয়া অনেকে হতবাক। প্রশ্ন উঠছে, এটাকে কি আগলে রাখা বলে, নাকি এভাবে ফোকাস ধরে রাখা যায়?
ঘরের মাঠে নিউজ়িল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে পরপর টেস্ট সিরিজ হেরেছে ভারত। লজ্জার ইতিহাস তৈরি হয়েছে। কিন্তু ম্যাচের আগে বা ম্যাচ চলাকালীন দলের কোনও একজন আবশ্যিকভাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে গেলেই যে ভাল ক্রিকেট খেলা যায় না, ক্রিকেটারদের চাপমুক্ত রাখা যায় না, বাংলার সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার, প্রাক্তন অধিনায়ক লক্ষ্মীরতন শুক্ল কবে বুঝবেন?




















