Argentina vs Egypt: পেনাল্টি নষ্টের রাতে গোল করে বিশ্বরেকর্ড মেসির, ১৩ মিনিটে ১৩ ম্যাচের শাপমোচন আর্জেন্তিনার
FIFA World Cup 2026: ফুটবলপ্রেমীরা তিন রাতে তিন মহাতারকার কান্নার ছবি দেখলেন। তফাত বলতে, নেমার ও রোনাল্ডো কেঁদেছেন পরাজয়ের যন্ত্রণনায়, বিদায়ের বিষণ্ণতায়। মেসি কাঁদলেন সাফল্যের সোপানে পৌঁছে

আতলান্তা: বিশ্বকাপ জেতার পরেও মনে হয় লিওনেল মেসিকে (Messi) এভাবে কাঁদতে দেখা যায়নি, মিশরের বিরুদ্ধে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর মঙ্গলবার রাতে আবেগের যে ছবি দেখা গেল আতলান্তা স্টেডিয়ামে...
প্রথমে কেপ ভার্দে, তারপর মিশর। খাতায়-কলমে এমন দুই দেশ, যাদের ফুটবল বিশ্বে কেউ কুলীন পর্যায়ে ধরতেনই না। কিন্তু কৌলিন্যের খোঁজে দুই দেশই বেছে নিল ফুটবলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেশ আর্জেন্তিনাকে। যেন প্রমাণ করার মরিয়া চেষ্টা যে, দেখো, আমরা মেসি-ম্যাজিক সত্ত্বেও নীল-সাদা শিবিরে থরহরিকম্প ধরিয়ে দিতে পারি। বিশ্বকাপে বেড়াতে আসিনি, এসেছি ছাপ ফেলতে।
শেষ ষোলোর ম্যাচে নামার আগেই মিশরের কোচ হোসাম হাসান সদর্পে ঘোষণা করেছিলেন, 'আমার দলের সকলেই মেসি'। তিনি যে কথার কথা বলেননি, বরং তাঁর দলের ফুটবলারদের কানে লড়াইয়ের মন্ত্রগুপ্তি দিয়েছিলেন, মাঠে নেমে তা প্রমাণ করে দিলেন মিশরের ফুটবলাররা। তা না হলে আর্জেন্তিনার বিরুদ্ধে মিশরের ২-০ এগিয়ে থাকাকে আর কীভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব?
আর তিনি, বিশ্বের সর্বকালের সেরা ফুটবলার বলে যাঁকে কুর্নিশ করে গোটা বিশ্ব, সেই মেসি নাকি ঘুরে দাঁড়ানোর সোনার সুযোগ পেয়ে নষ্ট করলেন! পরপর দুই ম্যাচে পেনাল্টি নষ্ট করলেন লিও। তাঁর চোখমুখ বলে দিচ্ছিল যে, প্রবল মানসিক চাপে রয়েছেন।
প্রথমার্ধে ১৫ মিনিটে ও দ্বিতীয়ার্ধে ৬৭ মিনিটে দুটি গোল করে মিশরকে ২-০ এগিয়ে দেন ইয়াসির ইব্রাহিম ও মোস্তফা জিকো। প্রথমার্ধেই ১-১ করে দেওয়ার সুযোগ এসেছিল মেসির সামনে। কিন্তু তাঁর পেনাল্টি বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে বাঁচান মিশরের গোলকিপার মোস্তফা শোবৈর। গোটা ম্যাচে যিনি অসংখ্য সেভ করলেন। ভোজিনহা, শোবৈর - মেসি ম্যাচের পর ভাবতে বসতে পারেন, টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপিং কি তাঁর ও তাঁর চ্যাম্পিয়ন দলের বিরুদ্ধেই হচ্ছে?
দ্বিতীয়ার্ধের ৬৭ মিনিটে ০-২ পিছিয়ে আর্জেন্তিনা, ধারাভাষ্যকারেরা তুলে ধরলেন পরিসংখ্যান। বিশ্বকাপের নক আউট পর্বে এর আগে ১৩ বার এমন হয়েছে যে, ২ গোলে পিছিয়ে পড়েছে আর্জেন্তিনা। উদ্বেগের বিষয় হল, সেই ১৩ বারই হেরেছে আর্জেন্তিনা। যা জানাজানি হতেই হাভিয়ার জানেত্তি থেকে শুরু করে দিয়েগো সিমিওনে, সের্জিও আগুয়েরো, পাবলো সোরিন, আর্জেন্তিনার প্রাক্তনীদের দেখা গেল ভিআইপি বক্সে থমথমে মুখচোখ নিয়ে বসে। যেন শ্মশানের নিস্তব্ধতা। গ্যালারি জুড়ে মিশরের সমর্থকদের উৎসব চলছে। যাঁদের অনেকেই এসেছিলেন ফারাওয়ের বেশে সেজে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বলাবলি শুরু হয়ে গিয়েছিল, তুতেনখামেনের অভিশাপে কি বিদ্ধ হল আর্জেন্তিনা? পরপর দুই রাতে নেমার ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর বিদায়ের পর কি এবার মেসির পালা?
কে ভেবেছিল যে, নিজের সবচেয়ে প্রিয় পুত্রের জন্য বিশ্বকাপের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত, সবচেয়ে বড় বিস্ময়গুলি তুলে রাখেন স্বয়ং ফুটবল ঈশ্বর! ৭৯ থেকে ৯২ - ১৩ মিনিটে ৩ গোল করল আর্জেন্তিনা। শুরুটা করেছিলেন ক্রিস্তিয়ান রোমেরো। মিশর বক্সের ডান প্রান্ত থেকে ক্রস বাড়িয়েছিলেন মেসি। তাতেই দুরন্ত হেডে ব্যবধান কমান রোমেরো। ম্যাচের বয়স ৭৯ মিনিট। গ্যালারির নীল-সাদা সমর্থকদের বুকের ধুকপুকুনি অবশ্য তখনও কমেনি।
তার চার মিনিটের মধ্যে মেসি-ম্যাজিক। মিশর বক্সে ভেসে আসা বলে দুরন্ত ব্যাক ভলি করেছিলেন লউতারো মার্তিনেজ়। তাঁকে এদিন প্রথম দলে রাখেননি আর্জেন্তিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। পরিবর্তে হিসাবে দ্বিতীয়ার্ধে নামান। মার্তিনেজ় নামতেই আক্রমণের ঝাঁঝ বাড়ে আর্জেন্তিনার। তাঁর ব্যাকভলি ঘুরে মেসির পায়ে পড়তেই বিদ্যুৎ চমকের মতো জোরাল শটে শোবৈরকে পরাস্ত করলেন মেসি। স্কোরলাইন ২-২। গ্যালারির শব্দব্রহ্মে কান পাতা দায়। শব্দব্রহ্ম না বলে গর্জন লেখাই ভাল।
বিশ্বকাপে টানা ৯ ম্যাচে গোল করলেন মেসি। যা বিশ্বরেকর্ড। এদিনই তিনি ধরে ফেললেন মিরোস্লাভ ক্লোজ়ের একটি রেকর্ড। বিশ্বকাপের নক আউট পর্বে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার কীর্তি ছিল জার্মানির তারকার। ১৪টি ম্যাচ খেলেছিলেন নক আউট পর্বে। সমসংখ্যক ম্যাচ খেলে ফেললেন মেসিও। কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়া বা স্যুইৎজ়ারল্যান্ড, যাদের বিরুদ্ধেই খেলা হোক না কেন, মেসি মাঠে নামলেই গড়বেন নতুন কীর্তি। নক আউট পর্বে ১৫টি ম্যাচ খেলার।
গ্যালারি যখন ধরেই নিয়েছিল যে, ম্যাচ গড়াবে অতিরিক্ত সময়ে, তখনই এনজো ফার্নান্দেজ়ের গোল। লউতারো মার্তিনেজ়ের ক্রস থেকে দুরন্ত হেডে ৩-২ করলেন।
ম্যাচ ৩-২ গোলে শেষ হতেই মেসির চোখে জল। পেনাল্টি নষ্টের জ্বালা যে তাঁর মনেও কালো মেঘ জড়ো করেছিল... আর্জেন্তিনা জিততেই বৃষ্টি হয়ে নেমে এল চোখ বেয়ে। সামান্য সময়ের জন্য হলেও, পেশাদারিত্বের নির্মম খোলস খুলে রাখলেন।
ফুটবলপ্রেমীরা তিন রাতে তিন মহাতারকার কান্নার ছবি দেখলেন। তফাত বলতে, নেমার ও রোনাল্ডো কেঁদেছেন পরাজয়ের যন্ত্রণায়, বিদায়ের বিষণ্ণতায়। মেসি কাঁদলেন সাফল্যের সোপানে পৌঁছে, রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধ জয়ের আনন্দে...























