কলকাতা: মাটির মূর্তি নয়, এখানে দেবী পূজিত হন, শাল কাঠের পাটাতনের উপর আঁকা একচালার বিশেষ পটে। বলা হয়, দেবী এখানে পূজিত 'পটেশ্বরী দুর্গা' রূপে। এই রাজবাড়ির প্রতিমায় গণেশ ছাড়া, সমস্ত মূর্তিরই একটি করে চোখ রয়েছে। সময় গিয়েছে, রাজবাড়ির পুজোর সেই জৌলুস এখন আর নেই। একটা সময়ে এখানের পুজোয় নহবত বসত, দামি দামি ঝাড়বাতিতে ঝলমল করত রাজবাড়ির অঙ্গন। দামোদর পেরিয়ে গরুর গাড়িতে চেপে দলে দলে মানুষও আর আসে না এই পুজো দেখতে। তবু প্রায় ৩৫০ বছরেরও বেশি পুরনো বর্ধমান রাজপরিবারের এই দুর্গাপুজো আজও যেন ধরে রেখেছে তার চেনা গাম্ভীর্য। মহালয়ার পরে প্রতিপদে ঘট স্থাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই পুজো, চলে ১০ দিন।

Continues below advertisement

পটে আঁকা দেবী, দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিকের চোখ ১টি করে!

মন্দিরের প্রধান পুরোহিত উত্তম মিশ্র জানালেন, প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর আগে বর্ধমানের মহারাজা মহতাব চাঁদ স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই পুজোর সূচনা করেন। সেই প্রথমদিন থেকে আজও দেবী পূজিত হচ্ছেন একই পটে। প্রতি ১২ বছর অন্তর একবার হয় অঙ্গরাগ। দেবীর পটেও রয়েছে বৈশিষ্ট্য, গণেশ ছাড়া দেবী দুর্গা ,লক্ষ্মী, সরস্বতী ও কার্তিক প্রত্যেকেরই দেখা যায় একটি করে চোখ। আর মা দুর্গার বাহন সিংহটিকে দেখতে অনেকটা ঘোড়ার মত। তিনি আরও বলেন, আগে পুজো শেষে নিয়ম করে কৃষ্ণসায়রে পটটি ডুবিয়ে তুলে আবার তুলে আনা হত মন্দিরে, তবে এখন আর সেই প্রথা নেই।

Continues below advertisement

পুজো উপলক্ষ্যে হত ডান্ডিয়া নাচ

বর্তমানে যেখানে মেয়েদের কলেজ, সেখানেই একসময় ছিল মূল দুর্গা দালান। সেটা ভেঙে পড়ার পরে, পুজো স্থানান্তরিত হয় লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরে। বৈষ্ণব ভাবধারার এই মন্দিরে পুজো হওয়ার কারণে আগে সুপারি বলি হলেও পরে বন্ধ হয়ে যায় বলি প্রথা। নবমীর দিন হয় কুমারী পুজো। আগে রাজবাড়ী দুর্গা পুজো উপলক্ষে ১০ দিন ধরে গুজরাটের সম্প্রদায়ের ডান্ডিয়ার নাচের পাশাপাশি চলতো নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।মেলা বসত পুজো উপলক্ষ্যে। দূর দূরান্ত থেকে রাজবাড়ীর পুজো দেখতে আসতেন বহু লোক। কালের নিয়মে কমেছে জৌলুস আগের মত আর নেই জাঁকজমক কিন্তু এখনও গুজরাটি সম্প্রদায়ের ডান্ডিয়া নাচ অনুষ্ঠিত হয়। কিন্ত গত বছর নাটমন্দিরের একাংশ ভেঙে যাওয়ার পর থেকে গত বছর থেকে ডান্ডিয়া নাচ হচ্ছে সোনার কালীবাড়ি মন্দিরে।

জীর্ণ মন্দির, সাধারণ মানুষের প্রবেশে রাশ

পুজোর সময় নিত্য ভোগের পাশাপাশি অষ্টমী ও নবমীর দিন দেওয়া হয় বিশেষ ছোলা, হালুয়া ও পুরী ভোগ। বয়সের ভারে জীর্ণ অট্টালিকা। চুন-সুরকি খসে পড়া নাটমন্দিরের একাংশ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ২০২৫ সালের ২রা সেপ্টেম্বর ভেঙে পড়ে। মন্দিরের একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বছরের অন্যান্য সময় সাধারণের প্রবেশে রাশ টানা হলেও, ঐতিহ্যের টানে যাতে ভক্তরা বঞ্চিত না হন, তাই দুর্গা পুজোর ক'দিন মন্দিরের দরজা সকলের জন্য খোলাই থাকবে। তবে পুজো মিটলেই শুরু হবে মন্দির সংস্কার বলে জানান মন্দিরের প্রধান পুরোহিত। সেই মেরামতি শেষ হলে ফের আগের মতো সারা বছরই ভক্তদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে ঐতিহাসিক এই লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দির।

আরও পড়ুন: Durga Puja 2026: দেবী দুর্গার গায়ের রং এখানে কালো! ভোগে থাকে পান্তা, ইলিশ মাছ! অদ্ভুত এই পুজো হয় এই বাংলাতেই