হিন্দোল দে, পার্থপ্রতিম ঘোষ, কলকাতা: বারুইপুরকাণ্ডে এনকাউন্টার, পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়েছে ধৃত অভিযুক্ত অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের। পুলিশ সূত্রের খবর, বারুইপুরে নাবালিকা নির্যাতন ও খুনকাণ্ডের পুনর্নির্মাণের সময় পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনতাই করে গুলি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করে প্রভাস। তখনই পাল্টা গুলি করে পুলিশ। তাতেই মৃত্যু হয় অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের। এই ঘটনার আগের দিনই মঙ্গলবার বিকেলে বারুইপুর যান মুখ্যমন্ত্রী। সেদিন তিনি পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্তাদের সঙ্গে ম্যারাথন মিটিং করেন। কড়া হুঁশিয়ারি দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্য পুলিশের ভারপ্রাপ্ত DG সিদ্ধিনাথ গুপ্তকে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য ৭২ ঘণ্টার ডেডলাইন বেঁধে দেন তিনি। স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কারও এক শতাংশ শিথিলতা থাকলেও কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মঙ্গলবার বারুইপুরে গিয়ে নিহত নাবালিকার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি গোটা ঘটনা এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়েও খোঁজখবর নেন তিনি। এরপরই রাজ্য পুলিশের ভারপ্রাপ্ত DG সিদ্ধিনাথ গুপ্তকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আমি DGP-কে ৭২ ঘণ্টা সময় দিয়েছি। ওঁর যে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে, প্রক্রিয়া অনুযায়ী একটা রিপোর্ট দেবেন, রিপোর্ট দেওয়ার পরে, তদন্তের পার্টে আমাদের যে অ্য়াকশন নেওয়ার, আমাদের কোনও লোকের যদি কোনও, ওই টাইমের মধ্য়ে কোনও শিথিলতা থাকে, ১%-ও, সেক্ষেত্রেও খুব কঠিন ব্য়বস্থা নেওয়া হবে।”
নিহত নাবালিকার পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। এই ঘটনায় জড়িত সকলকে বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে পরিবারকে। নিহত নাবালিকার এক আত্মীয় বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন ন্য়ায় বিচার হবে এবং যেটা ক্য়াপিটাল পানিশমেন্ট সেই প্রসেসটা উনি করবেন। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত যারা, তাদেরকে উনি বিচারের আওতায় আনবেন।”
বারুইপুরে ১২ বছর বয়সী নাবালিকাকে যৌন নির্যাতন ও খুনের ঘটনায় শুরু থেকেই পুলিশের ভূমিকা নিয়েও একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দা থেকে নিহত নাবালিকার আত্মীয়দের একাংশের অভিযোগ, শনিবার নাবালিকাকে খুঁজে না পাওয়ার পর স্থানীয় ফাঁড়িতে অভিযোগ জানানো হয়েছিল। সেখানকার দুই পুলিশকর্মী স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নাবালিকাকে খুঁজতে বের হলেও পরে আর সেভাবে পুলিশের সহযোগিতা মেলেনি বলে অভিযোগ। পরিবার ও স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, রবিবার পুকুর থেকে নাবালিকার মৃতদেহ উদ্ধারের সময়ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয় প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে। এরপর পুলিশের সামনেই ইন্দ্রজিৎ মণ্ডল নামে এক যুবককে পিটিয়ে খুন করার অভিযোগ ওঠে। নিহত নাবালিকার কাকিমার অভিযোগ, “পাবলিক ধরল আসামীকে। পুলিশের হাতে তুলে দিল। পুলিশ ওই আসামীকে সাইড থেকে ছেড়ে দিচ্ছে। পুলিশ ব্যবস্থা নেয়নি।”
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের পর রাজ্য পুলিশের ভারপ্রাপ্ত DG সিদ্ধিনাথ গুপ্তও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, “যদি পুলিশের ভূমিকার ওপর প্রশ্ন আসে...দেরিতে রেসপন্স হয়েছে, পুরো তদন্ত করে, যা ব্য়বস্থা আছে, সম্পূর্ণ ব্য়বস্থা নেব।”মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রীও পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন, পুলিশের তরফে কোনও গাফিলতি থাকলে কাউকে রেয়াত করা হবে না। নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আমি ক্ষমতায় আসার পরে বা মুখ্য়মন্ত্রিত্বের দায়িত্বের পরে, আর জি করের মামলায় ৩ জন শীর্ষ IPS অফিসারকে সাসপেন্ড করেছি। এক্ষেত্রে আমার বার্তা খুব পরিষ্কার আছে, সবাই সেটা দেখেছে।”
যদিও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সরব হয়েছেন তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ও। তাঁর বক্তব্য, “আমার মনে হয়, মুখ্য়মন্ত্রীর বার্তা পুলিশের কাছে পৌঁছোচ্ছে না। তৎপরতা কোথায় ছিল? অভিযুক্তদের ধরেছে মানুষ। দেহ খুঁজে বার করেছে মানুষ। মুখ্য়মন্ত্রী বলছেন, যারা গণপিটুনি দিয়েছে, তাঁদের শিক্ষা দেবে। আগে পুলিশকে তৎপর করার কথা দেখা উচিত।”
বারুইপুরকাণ্ডে একদিকে যেমন নাবালিকাকে যৌন নির্যাতন ও খুনের ঘটনায় অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে, তেমনই পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত DG-র রিপোর্টের দিকে নজর রয়েছে সকলের। রিপোর্টে পুলিশের কোনও গাফিলতি উঠে এলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। মঙ্গলবার নিহত নাবালিকার পরিবারের সঙ্গে কথা বলার পর শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, এক সপ্তাহ পরে তিনি ফের বারুইপুরে আসবেন।
