কলকাতা: দুর্গাপুজোর সময় বর্ধমান মহারাজা আসতেন এই বাড়িতে, দেবী এখানে দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী নন, পূজিত হন হরগৌরী রূপে। বর্তমানে পুজোয় জমিদার বাড়িতে ছাগ বলি-র বদলে হয় মণ্ডা বলি।

Continues below advertisement

জানেন বর্ধমানের কোন বাড়ির দুর্গাপুজো এটি?

একচালার কাঠামোয় দেবী পার্বতীর ডানপাশে আসীন দেবাদিদেব মহাদেব। তাঁদের দু'পাশে লক্ষ্মী ও সরস্বতী এবং নিচে বিরাজমান কার্তিক ও গণেশ। হরগৌরী রূপেই প্রায় দেড়শো বছর ধরে দেবী পূজিত হয়ে আসছেন বর্ধমান শহরের খাজা আনোয়ার বেড়ের দাস বাড়িতে। আজও মহাঅষ্টমীর সন্ধিক্ষণে এবং বিজয়া দশমীতে ওড়ে শঙ্খচিল।

Continues below advertisement

কিন্তু কী ভাবে শুরু হয় দাস পরিবারের পুজো?

এই পুজো ঘিরে রয়েছে নানান রোমাঞ্চকর কাহিনীও। তৎকালীন জমিদার মাখনলাল দাস প্রথম এই পুজোর সূচনা করলেও তখন এই পুজো হত ঘটে। পরবর্তী সময়ে তাঁর পুত্র ব্রজেন্দ্রলাল দাস স্বপ্নাদেশ পেয়ে মৃন্ময়ী মূর্তিপুজো শুরু করেন। বর্ধমানের মহারাজার ঘনিষ্ঠ বন্ধু তথা দাপুটে জমিদার ব্রজেন্দ্রলালবাবুর কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। কথিত আছে, দেবীর স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর হরগৌরী রূপের আরাধনা করতেই তাঁর ঘরে জন্ম নেয় এক পুত্রসন্তান। দেবীর পুজোর পরই সন্তান হওয়ায় পুত্রের নাম রাখা হয় দুর্গাচরণ দাস।

দাসবাড়িতে পুজোর সূচনা হয় পঞ্চমী তিথিতে বোধনের মাধ্যমে। জমিদারি আমলে এই পুজোকে কেন্দ্র করে দাসবাড়ির দরদালানে বসত যাত্রাপালা ও গানের আসর, যা দুর্গামণ্ডপ সংলগ্ন দোতলার ঘর থেকে উপভোগ করতেন অন্দরমহলের মহিলারা। স্বয়ং বর্ধমানের মহারাজা ও তাঁর পরিবারের সদস্যরাও একসময় এই পুজো দেখতে আনোয়ার বেড়ে আসতেন। 

নৈবেদ্যের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষত্ব 

প্রতিদিন দেবীকে নিবেদন করা হয় গাওয়া ঘিয়ে ভাজা লুচি, কাঁঠালিকলা এবং নারকেলের নানা পদ। প্রায় ৮০ বছর আগে সন্ধিপূজোর ছাগবলি প্রথা বন্ধ হয়ে যায়, তার বদলে চালু হয় মিষ্টি মণ্ডা বলি দেওয়ার রেওয়াজ। আজ আর সেই জমিদারি নেই, চুন-সুরকির দেওয়ালে খসে পড়েছে পলেস্তারা, ফিকে হয়েছে সাবেক জৌলুসও।তবুও ছেদ পড়েনি ঐতিহ্য ও আচার-অনুষ্ঠানে। 

দাস পরিবারের বর্তমান সদস্য শিবশংকর দাস বলেন, আজও মহাঅষ্টমীর সন্ধিক্ষণে মন্দিরের উপরে  এবং বিজয়া দশমীতে মল্লিকপুকুরে বিসর্জনের মুহূর্তে আকাশে উড়তে দেখা যায় শঙ্খচিল। এই পরিবারের সঙ্গে বর্ধমান রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং রাজপরিবারের সদস্যরা পুজোয় আসতেন। আগে ঠাকুরদালানের উঠোনে নিয়মিত যাত্রাপালার আয়োজন হত, তবে বর্তমানে গান-বাজনা ও সঙ্গীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো উদযাপিত হয়। বর্তমানে পরিবারের বহু সদস্য বাইরে থাকলেও পুজোর সময় তারা সকলে ফিরে আসেন দাস বাড়িতে এবং সকলে মিলে একসাথে পুজো দিনগুলি কাটানো হয়।

শতবর্ষ পেরিয়েও নিয়ম-নিষ্ঠা ও শ্রদ্ধায় অমলিন খাজা আনোয়ার বেড়ের দাসবাড়ির এই প্রাচীন দুর্গাপুজো।