কলকাতা: বকেয়া মহার্ঘভাতার ২৫ শতাংশ মিটিয়ে দিতে হবে বলে রাজ্যকে নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ কার্যকরের দাবিতে ফের রাস্তায় নামলেন DA আন্দোলনকারী, রাজ্য সরকারের কর্মীদের একাংশ। অবিলম্বে সুপ্রিম রায় কার্যকরের দাবি তুলে শহরে মিছিল তাঁদের। রবিবার সুবোধ মল্লিক স্কোয়্যার থেকে রানি রাসমণি অ্যাভিনিউ পর্যন্ত মিছিল করেন আন্দোলনকারীরা। সেই মিছিলে যোগ দেন বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খাঁও। (DA Protests)
সরকারের উপর চাপ বাড়াতে এদিন মিছিল করে সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ। আন্দোলনকারীদের দাবি, এখনই আদালতের রায় কার্যকর করতে হবে। অবিলম্বে বকেয়া DA মিটিয়ে দিতে হবে রাজ্য সরকারকে। কাঁসর বাজিয়ে মিছিলে পা মেলান আন্দোলনকারীরা। স্লোগান তোলা হয়, 'বোল বোল হামলা বোল', 'তুমিও জানো আমিও জানি, DA চোর মহারানি', 'তুমিও জানো আমিও জানি, DA চোর দিদিমণি'। (DA Order)
গত ৫ ফেব্রুয়ারি আদালত জানায়, এখনই ২৫ শতাংশ বকেয়া DA মিটিয়ে দিতে হবে। বাকি ৭৫ শতাংশের প্রথম কিস্তি মিটিয়ে দিতে হবে ৩১ মার্চের মধ্যে। চার সদস্যের কমিটিও গড়ে দেওয়া হয়েছে যে বাকি ৫০ শতাংশ কী ভাবে মেটানো হবে। যদিও রাজ্য জানিয়েছে, অর্ডারের কপি হাতে পেয়েছে তারা। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। (DA News)
কিন্তু এখনই DA মিটিয়ে দিতে হবে বলে দাবি আন্দোলনকারী রাজ্য সরকারি কর্মীদের। তাঁদের বক্তব্য, "আমরা রাস্তায় নেমেছি কারণ দেখতে পাচ্ছি, সরকার নানা বিবৃতি দিচ্ছে বলছে রিভিউয়ে যাবে। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে, সরকার বঞ্চনা মিটিয়ে দিতে চায় না। এই সরকার মালিকশ্রেণির কাছে কাটমানি খেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারীদের ১ শতাংশ যদি DA বাড়ে, সাধারণ ক্ষেত্রের কর্মীদের বেতন বাড়ে ৬ টাকা। ৪০ শতাংশ বকেয়ায় ঢিলেমি, ২৪০ টাকা বেতন, মালিকশ্রেণির লাগবে। তাই এই সরকার শিক্ষিত সমাজকে টাকাটা দিতে চায় না। DA-তে কাটমানি নেই বলে দেবে না বলছে। কাঁচা টাকা দিয়ে ভোট কিনতে চায়। কিন্তু সরকার ভুলে যাচ্ছে, সরকারের যত প্রকল্প, তা সরকারি কর্মীরাই বাস্তবায়ন করে। সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে বঞ্চনা হলে, ১০-১২ লক্ষ সরকারি কর্মচারী, তাঁদের পরিবারের ছ'জন অন্তত...সরকারি কর্মীদের কাছে ৬০-৭০ লক্ষ ভোট রয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের ফেলনা ভাববেন না। এই ভোট যদি আপনার বিরুদ্ধে যায়, আপনি সরকার গড়তে পারবেন তো? ক্ষমতায় আসা হবে তো? সরকারি কর্মচারীরা এই বঞ্চনা আর মেনে নেবে না। অবিলম্বে নির্দেশ কার্যকর করতে হবে।"
যদিও সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের ভাস্কর ঘোষ বলেন, "গণতন্ত্রে কোনও প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি না দিতে চাওয়ার যে মানসিকতা, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। সুপ্রিম কোর্টের রায় মানব না, আমি আমার মতো চলব...সেই জায়গা থেকেই আজ পথে নামা। সরকারকে মনে করিয়ে দিতে হচ্ছে যে, তুমি গণতান্ত্রিক দেশের একটি অঙ্গরাজ্যের সরকার। সুপ্রিম কোর্ট দেশের সর্বোচ্চ আইনি প্রতিষ্ঠান। তার অধিকারকে খর্ব করতে পার না, নির্দেশ কার্যকর করো। আজ রায় কার্যকর করাতে পথে নামা।" সম্প্রতি রাজ্য বাজেটেও ৪ শতাংশ DA-র ঘোষণা করেছে রাজ্য। সীমিত ক্ষমতার মধ্যে যতটা সম্ভব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে। যদিও ভাস্করের কথায়, "এগিয়ে বাংলায় এই সীমিত ক্ষমতাটা কী ভাবে এল এবং কার হাত ধরে এল? এই সরকারই আবার তথ্য পেশ করছে যে, বাম আমলের থেকে রাজ্যের GDP-র সঙ্গে ঋণের আনুপাতিক হার কমে ৩৬ শতাংশে এসে ঠেকেছে। অর্থাৎ বাম আমলের চেয়ে অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে। একদিকে অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে বলছেন, টাকা না থাকলে হল কী করে? ভারতের সমস্ত রাজ্য যদি দিতে পারে, তুমি কেন দিতে পারবে না? আমাদের থেকে আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা বিহার যদি বিগত দু'বছরের মধ্যে ৫ লক্ষ স্থায়ী পদে নিয়োগ করে, কেন্দ্রীয় হারে DA দিতে পারে, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের কী ব্যর্থতা যে তারা দিতে পারছে না? DA শুধুমাত্র কর্মচারীদের অধিকার নয়, আপনার আমার শ্রমের মূল্যের সংযোগ রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রায় মানতে হবে।"
সরকার কোনও পদক্ষেপ না করলে কী করবেন, তাও জানান ভাস্কর। তিনি বলেন, "ধর্মঘট থেকে রাজ্যকে অচল করার সব রাস্তা খোলা আছে আমাদের সামনে। সরকার আমাদের কোন পথে হাঁটাবে, তা সরকার ঠিক করুক।" এদিন DA আন্দোলনকারীদের মিছিলে শামিল হয়ে বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র বলেন, "ভাস্করদা, এঁরা যে লড়াই করেছেন, তাকে স্যালুট জানাতেই এসেছি। গোটা দেশের সব সরকারি কর্মচারীদের এঁদের পাশে থাকা উচিত। আমি মনে করি, সঙ্গত লড়াই ওঁদের। ১১০০ দিন ধরে বসেছিলেন। এটা বিরাট লড়াই।" সৌমিত্রই তাঁদের সমস্যার কথা প্রথম সংসদে তোলেন বলে মন্তব্য করেন আন্দোলনকারীরাও। সৌমিত্রকে ধন্যবাদ জানান ভাস্করও। তিনি বলেন, "বার বার সংসদে আমাদের সমস্যা তুলে ধরেছেন উনি। আমরা কৃতজ্ঞ যে উনি পাশে থেকেছেন, আজ এসেছেন।" 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে'র টাকা বাড়ানো গেলে DA দিতে কী সমস্যা, এই প্রশ্নও তোলেন আন্দোলনকারীরা।
এমতাবস্থায় সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "আন্দোলন করছেন ঠিক আছে। ওঁদের সম্মান করি। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট একটা নির্দেশ দিয়েছে, তাতে সময় আছে এখনও। এখনই হয়ে যাবে না তো! সময়টা তো দেখতে হবে! আন্দোলন করছেন বলেই বিরাট কিছু হয়ে যাচ্ছে না! ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময় দিয়েছে। অপেক্ষা করতে হবে তো! অত তাড়াহুড়ো করলে হয় না।" যদিও আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্ট 'ইমিডিয়েট' মিটিয়ে দিতে বলেছে। অর্থাৎ অবিলম্বে মেটাতে হবে। তা না হলে সরকার অচল করে দিতে পিছপা হবেন না তাঁরা।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ আসার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি বলেন, "আমরা ইতিমধ্যেই পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য কমিটি গড়েছি মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে। তাঁরা বিষয়টি পর্যালোচনা করবেন। অনেক রাজ্য আছে পেনশন পায় না। কোনও রাজ্য পেনশন পায় না, বাংলায় পায়। পেনশন না দিলে কত টাকা বেঁচে যায় বলুন তো!"