এল নিনো  ( El Nino )। এই  পরিস্থিতির প্রভাবে ওলটপালট হয়ে গিয়েছে বিশ্বব্যাপী আবহাওয়া। এক্কেবারে ঘেঁটে গিয়েছে ভারতে বর্ষার টাইমলাইন। ইতিমধ্যেই খবর, এল নিনোর প্রভাবে অনেক দেরিতে প্রবেশ করেছে বর্ষা। বর্ষা এসেও থামকে গিয়েছে কোনও কোনও জায়গায়। জলবায়ুগত পরিস্থিতিটাই নাকি বৃষ্টির অনুকূল নয়। তাহলে কি পশ্চিমবঙ্গেও বর্ষা এবার বিক্ষিপ্তভাবেই হবে? অপর্যাপ্ত বৃষ্টি পাবে রাজ্যবাসী ? ভুগবেন চাষিরা ? এই প্রশ্নগুলোরই উত্তর দিলেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা। 

Continues below advertisement

প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে গেলে যে জলবায়ুগত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাকে বলা হয় এল নিনো (El Niño)। সাধারণভাবে অনেকের ধারণা, এল নিনো মানেই ভারতে খরা বা বর্ষার ঘাটতি হবেই । কিন্তু বাস্তবে ছবিটা এতটা সরল নয়। এল নিনোর প্রভাবে বৃষ্টিহীনতা, খরা, অসময়ে অতিবৃষ্টি , অনেকিছুই ঘটতে পারে। তবে সেটা এলনিনো কীভাবে প্রভাব বিস্তার করে ও সেই সঙ্গে স্থানীয় জলবায়ুও অনেকটা প্রভাব ফেলে।  বিশেষ করে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের ক্ষেত্রে। আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এল নিনো বছরের প্রভাব পশ্চিমবঙ্গে সবসময় একরকম হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই কেরল, পূর্ব ভারত এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক বা কখনও কখনও স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি হতে পারে। তবে বৃষ্টির ধরনে বড় পরিবর্তন দেখা যায়।

বৃষ্টির পরিমাণ নয়, বদলে যায় বৃষ্টির প্রকৃতি

Continues below advertisement

এল নিনো বছরে বর্ষাকাল সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে— "ব্রেক" (Break) এবং "বার্স্ট" (Burst) পর্বে।

ব্রেক পিরিয়ডে কী হয়?

এই সময় কয়েকদিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বৃষ্টির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। আকাশে মেঘ থাকলেও বৃষ্টি হয় না বা খুব কম হয়। ফলে, গরম ও আর্দ্রতা অস্বস্তিকর মাত্রায় পৌঁছায়। গুমোট আবহাওয়া বৃদ্ধি পায়। ঘামাচি, হিট স্ট্রোকের মতো সমস্যা হতে পারে এই সময়টায়। স্থানীয়ভাবে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হয়ে মাইক্রোবার্স্ট বা স্থানীয় ভাবে অসম্ভব ভারী বৃষ্টি ও হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। বর্ষার এই খামখেয়ালিপনায় কৃষিক্ষেত্রে জলসংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়। 

বার্স্ট পিরিয়ডে কী হয়?

ব্রেক পর্বের পর হঠাৎ করেই সক্রিয় হয়ে ওঠে মৌসুমি বায়ু। তখন অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর ফলে, কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়। বজ্রপাতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। হঠাৎ এমন বাঁধভাঙা বৃষ্টিতে শহর ও গ্রাম ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়। পাহাড়ি এলাকায় ধসের ঝুঁকি বাড়ে।  কোথাও কোথাও ক্লাউডবার্স্টের মতো চরম আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গে কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হয়?

এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহের বিন্যাস বদলে যায়। এর প্রভাব ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ুতেও পড়ে। ফলে বর্ষা ধারাবাহিকভাবে সক্রিয় না থেকে মাঝে মাঝে দুর্বল এবং পরে হঠাৎ অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই কারণেই এল নিনো বছরে পশ্চিমবঙ্গে বৃষ্টিপাতের মোট পরিমাণ অনেক সময় স্বাভাবিক থাকলেও তার বণ্টন অত্যন্ত অসম হয়ে যায়।

আবহাওয়াবিদরা কী বলছেন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনো ও অন্যান্য বৈশ্বিক জলবায়ুগত ঘটনার প্রভাব আরও জটিল হয়ে উঠছে। ফলে শুধু মোট বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা দেখে বর্ষার মূল্যায়ন করলে ভুল হতে পারে। বরং কখন বৃষ্টি হচ্ছে, কতটা তীব্র হচ্ছে এবং কতদিন বিরতি থাকছে— এই বিষয়গুলিই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।   এল নিনো মানেই পশ্চিমবঙ্গে বৃষ্টি একেবারে উধাও হয়ে যাবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে বৃষ্টি স্বাভাবিক বা স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি হতে পারে। তবে বৃষ্টির ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘ শুষ্ক ও গুমোট আবহাওয়ার পর হঠাৎ প্রবল বর্ষণ, বজ্রপাত এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা বেড়ে যাওয়াই এল নিনো বছরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।