আশাবুল হোসেন, সৌমিত্র রায়, ময়ূখ ঠাকুর চক্রবর্তী, কলকাতা: যে যখন ক্ষমতায়, তখন সেই শাসকদলের ঘনিষ্ঠ হতে দেখা গেছে গায়ক ইন্দ্রনীল সেনকে (Former West Bengal minister Indranil Sen arrested)। ২০১১-র আগে বাম শাসকের সঙ্গে ওঠাবসা। আবার ৩৪ বছরের সিপিএমের রাজত্বের পতন হতেই, রং পাল্টাতে বেশিদিন দেরি করেননি ইন্দ্রনীল সেন। ইন্দ্রনীল সেনের এই রংবদল নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)।
শুধু তৃণমূল সরকার নয়, বাম সরকারেরও ঘনিষ্ঠ ছিলেন ইন্দ্রনীল!
'চিনিলে না আমারে কি...', রবি ঠাকুরের এই গান একাধিক অনুষ্ঠানে গাইতেন ইন্দ্রনীল সেন! তিনি গ্রেফতার হওয়ার পর এখন প্রশ্ন উঠছে, সত্য়িই কি পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদরাও ইন্দ্রনীল সেনকে ঠিকভাবে চিনতে পেরেছিলেন? যে যখন ক্ষমতায়, ইন্দ্রনীল সেন তখন তাঁর ঘনিষ্ঠ! বাম আমলে বাম শাসকের সঙ্গে ওঠাবসা! আবার ৩৪ বছরের সিপিএমের রাজত্বের পতন হতেই রং পাল্টাতে বেশিদিন দেরি করেননি তিনি! অনেকেই বলে থাকেন, গায়ক হিসাবে স্বরের ওঠা-নামা তো জানতেনই! তেমনই সুবিধাজনক অবস্থায় থাকতে, কখন কার সঙ্গে ওঠাবসা করতে হয়, তাও ভালই জানতেন ইন্দ্রনীল সেন!
অধ্যাপক শুভময় মৈত্র বলছেন, 'ইন্দ্রনীল সেন যেহেতু সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যে ছিলেন, ফলে সিপিএম রাজত্বের শেষের দিকেও বুদ্ধবাবুর সঙ্গে সেই পরিমণ্ডলের সঙ্গে ঢুকে পড়া এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেহেতু দীর্ঘসময় ধরে গান-কবিতা-ছবি আঁকা, এইসব জয়গাতেই এক ধরনের প্রশংসা আশা করেছেন মানুষের কাছ থেকে এবং সেই জায়গায় এই ধরনের যারা শিল্প সংস্কৃতিজগতে আছেন, তাঁদের সঙ্গে একটা যোগাযোগ ছিল। পরিবর্তে তাঁরা ক্ষমতা পেয়েছেন, এবং অনেক সময় স্টেজেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ইন্দ্রনীলবাবুরা থাকতেন এবং প্রচারের আলোয় এসেছে।'
ইন্দ্রনীল সেন তৃণমূলে কার্যত সেই বিরল ব্য়াক্তিত্ব ছিলেন, যাঁর মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায় ও অভিষেক বন্দ্য়োপাধ্য়ায় - দুজনেরই ঘনিষ্ঠ বৃত্তে অবাধ বিচরণ ছিল! রাজাগোপাল ধর চক্রবর্তী বলছেন, 'অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাদের যে পটুতা আছে, যে একঘর থেকে আরেক ঘরে চলে যাওয়ার, ইন্দ্রনীল সেনের স্বাভাবিকভাবেই... আমরা সবাই আশা করেছিলাম, হয়তো ওর সেই প্রচেষ্টা থাকবে। প্রচেষ্টা করেনি, সেরকম নয়। কিন্তু বিজেপি দেখল যে, একে যদি কোনওভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, ওদেরই বিপদ আছে।'
কিভাবে তৃণমূলে বাড়ে ইন্দ্রনীলের প্রভাব প্রতিপত্তি?
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বহরমপুর কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রার্থী করেন। সেখানে পরাজিত হলেও তিনি দলনেত্রীর আস্থাভাজন হিসেবেই থাকেন ইন্দ্রনীল। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে চন্দননগর কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করার পর তিনি রাজ্য মন্ত্রিসভায় জায়গা পান এবং তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের প্রতিমন্ত্রী হন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে চন্দননগর থেকে ফের জয়ী হওয়ায় তাঁকে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের পাশাপাশি পর্যটন দফতরের স্বাধীন দায়িত্ব দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা দফতরের প্রতিমন্ত্রীরও দায়িত্ব সামলেছেন।
আবার সদ্য় বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের ভরাডুবির পরই রাজনীতি ছাড়াও ইঙ্গিত দিয়ে দিয়েছিলেন ইন্দ্রনীল সেন! মুখ্যমন্ত্রী গতকাল বলেন, 'তিনি যেমন আগে সিপিএমকে খাইয়ে খেতেন, সিপিএমের সবচেয়ে বড় ক্যাম্পেনার ছিলেন... তারা পরবর্তীকালে সব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন। রাজ্যের মন্ত্রী হয়েছিলেন। যা পরিণতি হওয়ার হচ্ছে।' কুণাল ঘোষ এদিন বলেন, 'ইন্দ্রনীল সেন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী, এনিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তিনি একসময় সিপিএম করতেন। পরবর্তীকালে তিনি তৃণমূলে এসেছেন। কিন্তু এরকম তো আরও অনেকে এসেছেন।'
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য থেকে মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায়! দুঁদে রাজনীতিবিদদের কাছের মানুষ হয়ে ওঠার কৌশল কীভাবে রপ্ত করেছিলেন ইন্দ্রনীল সেন? সুজন চক্রবর্তী বলেন, 'মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগের যিনি মুখ্যমন্ত্রী, তিনি শিল্প সংক্রান্ত সংস্কৃতি, রুচি ইত্যাদি, সবার মতো তিনি পছন্দ করতেন, কোনও সন্দেহ নেই। তখনও পর্যন্ত ইন্দ্রনীল সেন রাজনীতির লোক নয়, শিল্পী। ফলে শিল্পী রাজনীতির যে কদর ছিল, হ্যাঁ বটেই তো বাম আমলেও তার কদর ছিল। মুখ্যমন্ত্রীর নাম ছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। এখন ইনি শিল্পী না, এখন ইনি মন্ত্রী, এখন ইনি রাজনীতির লোক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ, কেন না দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত।'
শাসক ঘনিষ্ঠতা থেকে আজ পুলিশ হেফাজতে... চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়। নজরুল ইসলামের লেখা এই লাইনটা কি ইন্দ্রনীল সেনের ক্ষেত্রেও খেটে গেল?
