কৃষ্ণেন্দু অধিকারী, কলকাতা :  যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অশান্তির মধ্যেই ভাঙচুর করা হল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী এমব্লেমের একাংশ। এই এমব্লেমের নকশার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে  শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর নাম। এই প্রতীকে পদ্মের পাপড়ির বলয়ের  কেন্দ্রে রয়েছে প্রদীপ এবং তিনটি শিখা, যা জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। ফলে এমব্লেমের একাংশ ভেঙে যাওয়ার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বুধবার রাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মুহুর্মুহু স্লোগান, বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট ধরে টানাটানি এবং গেট টপকে ভিতরে ঢোকার চেষ্টাকে ঘিরে তৈরি হয় উত্তেজনা। সেই পরিস্থিতির মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল গেটের কাছে থাকা ঐতিহ্যবাহী এমব্লেমের একাংশ ভেঙে পড়ে।

Continues below advertisement

ঘটনার একটি ভিডিওয় দেখা যায়, এমব্লেমের ভাঙা অংশ মাটিতে পড়ে রয়েছে। আরও একটি ভিডিওয় গেটের ফাঁক দিয়ে ভাঙা অংশ অন্যদিকে ছুড়ে ফেলার দৃশ্যও দেখা যায়। এই ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে  চাপানউতোর। বহু মানুষ এক বাক্যে নিন্দা জানাচ্ছেন এই আচরণের। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাজ্যেশ্বর সিংহ ব্যাখ্যা করলেন এমব্লেমের তাৎপর্য। বললেন, জাতীয় গৌরব ও জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত এই এমব্লেমকে পা দিয়ে মাড়িয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাঁর নিশানায় রয়েছে ABVP। “এই এমব্লেম জাতীয় গৌরবের প্রতীক। জাতীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এটি তৈরি করেছিলেন নন্দলাল বসু। পা দিয়ে দাঁড়িয়ে, মাড়িয়ে, ভেঙে ফেলা হল। তারপর সেই ভাঙা অংশ অন্যদের দিকে ছুড়ে দেওয়া হল।” রাজ্যেশ্বর সিংহ আরও বলেন, এই এমব্লেমের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জ্ঞানের শিখা, পদ্ম-শতদল এবং মানুষের আবেগ ও সম্মান। এই প্রতীককে পদদলিত করে যাদবপুরের বাইরের অসংখ্য মানুষের আবেগকেও আঘাত করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত করে প্রশাসন ও সরকারের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

অশান্তির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যও। তিনি জানালেন, ক্যাম্পাসে শান্তি বজায় রাখার জন্য তিনি আগেই সমস্ত স্টেকহোল্ডারকে বারবার সতর্ক করেছিলেন। বুধবারের ঘটনা কোনওভাবেই কাম্য নয় বলেও জানিয়েছেন তিনি। “ঘটনাটা আমি অনেক দিন ধরেই চেক করার চেষ্টা করছিলাম, যাতে কোনওরকম সমস্যা না হয়। আমি সব স্টেকহোল্ডারকে বারবার মৌখিকভাবে বলেছি, সবাই যেন শান্তি বজায় রাখে। কারণ ক্যাম্পাসে শান্তি বজায় রাখাটা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। গতকাল যে ঘটনাটা ঘটেছে, আমি তার তীব্র নিন্দা করছি।”

Continues below advertisement

১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। তার আগে এই প্রতিষ্ঠান ছিল জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অংশ। সেই সময় শান্তিনিকেতনের কলাভবনের প্রাক্তন অধ্যক্ষ শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু বিশ্ববিদ্যালয়ের এই এমব্লেমের নকশা তৈরি করেছিলেন বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই প্রতীক। পদ্মের পাপড়ির আকারের এই এমব্লেমের মধ্যে রয়েছে একটি প্রদীপ এবং তিনটি শিখা। জ্ঞানের আলো ও শিক্ষার ভাবনাকে সামনে রেখেই এই প্রতীকের নকশা তৈরি করা হয়েছিল। তাই শুধু একটি স্থাপত্য বা চিহ্ন হিসেবে নয়, যাদবপুরের গৌরবময় ঐতিহ্য ও আবেগের প্রতীক এটি। সেই এমব্লেমও ভাঙা পড়ল ক্যাম্পাসের অশান্তিতে, যা কার্যত নজিরবিহীন।