সৌরভ বন্দ্যোপাধ্যায়, হুগলি: বাংলার মিষ্টির জগতে এমন এক স্বাদ, যা এক কামড়েই মন হরণ করে নেয়। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি (Hooghly) জেলার জনাইয়ের (Janai) বিখ্যাত এবং ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি 'মনোহরা' (Monohora) নিয়ে এমন কথাই বলতে হয়। প্রায় ২০০ বছরের পুরনো এই মিষ্টির ইতিহাস দারুণ আকর্ষণীয়। এবার সেই মনোহরাই পেল GI তকমা। আর তাতে খুশি জনাই মনোহারা শিল্প সমবায়ের সক্কলে। 

জনশ্রুতি অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে জনাইয়ের এক বিখ্যাত জমিদার পরিবারের আমন্ত্রণে সেখানে এসেছিলেন কিছু দক্ষ মিষ্টি কারিগর। জমিদার বাড়ির অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য তাঁরা তৈরি করেন ছানা, ক্ষীর, নারকেল আর এলাচের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এই মিষ্টি খেয়ে অতিথিরা এতটাই মুগ্ধ হন যে, এর নাম দেওয়া হয় 'মনোহরা'—অর্থাৎ যা সকলের মন হরণ করে।

তবে মনোহরার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে রয়েছে এটি বানানোর প্রক্রিয়াতে। গোল ছানা বা ক্ষীরের পুরটিকে চিনির ঘন রসে ডুবিয়ে ওপরে একটি শক্ত চিনির আবরণ তৈরি করা হয়। ফলে এর ভেতরের অংশটি থাকে একদম নরম আর তুলতুলে, আর বাইরের শক্ত আবরণটি কাজ করে প্রাকৃতিক প্রিজারভেটিভ বা সংরক্ষণ স্তর হিসেবে। এই কারণেই অন্যান্য ছানার মিষ্টির চেয়ে মনোহরা অনেকদিন পর্যন্ত ভাল থাকে।

জনাই মনোহারা শিল্প সমবায়ের সম্পাদক স্বপন দাস জানান, ২০২১ সাল থেকে তাঁরা মনোহরার জিআই স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেন। এরপর ২০২২ সালের মধ্য়ে তাঁরা এই সংক্রান্ত সমস্ত কাগজ জমা দেন। আর অবশেষে ২০২৬ সালে এসে এই লড়াইয়ের ফল পেলেন জনাইয়ের মনোহরা মিষ্টির কারিগর থেকে শুরু করে জনাই মনোহারা শিল্প সমবায়ের সক্কলে। মনোহরা মিষ্টির কারিগর ও জনাই মনোহারা শিল্প সমবায়ের সম্পাদক স্বপন দাস জানান, এই মনোহরা মিষ্টি ফ্রিজের বাইরে রাখলে ৬-৭ দিন পর্যন্ত ভাল থাকে। 

মনোহরা মিষ্টি জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার ফলে হুগলির জনাই অঞ্চলের মনোহরা মিষ্টির কারিগর থেকে শুরু করে বাসিন্দারা ভীষণ খুশি। মনোহরা মিষ্টির কারিগররা আশা করছেন জিআই ট্যাগ পাওয়ার ফলে মনোহরার কদর আগের থেকে বেড়ে যাবে। একসময় জনাই অঞ্চলে যে কোনও শুভ অনুষ্ঠানে আত্মীয়দের বাড়িতে মনোহরা উপহার দেওয়ার একটা সুন্দর রেওয়াজ ছিল। আর বর্তমানে? আজ এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি জিআই ট্যাগ অর্জন করে নিজের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও স্বকীয়তাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।