কলকাতা: শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় তাঁর কড়া অবস্থান প্রতিদিন দেখেছে পশ্চিমবঙ্গ। শিক্ষা-দুর্নীতি নিয়ে তাঁর আপসহীন অবস্থান নজর কাড়ে গোটা রাজ্যের। কলকাতা হাইকোর্টের সেই সদ্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ এবার এবিপি আনন্দের স্টুডিওয় ক্যামেরার মুখোমুখি হলেন। (Justice Biswajit Basu on SSC Case:) নিয়োগ দুর্নীতি মামলা নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরলেন তিনি। জানালেন, এভাবে দুর্নীতি হতে পারে বলে ধারণাই ছিল না তাঁর। দমবন্ধ হয়ে আসত। অনেক বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন। (Justice Biswajit Basu Exclusive)
প্রশ্ন: স্টুডিওতে স্বাগত, নাকি পাবলিক লাইফে স্বাগত বলব?
উত্তর: আমি সেই অর্থে কোনও দিনই পাবলিক লাইফ থেকে ডিট্যাচড হইনি। তবে বিচারপতি হিসেবে একটা দূরত্ব তো মেনটেন করতে হয়।, সেটা মেনটেন করেছি। কিন্তু আমি সবার মধ্যে থাকতে পছন্দ করি। বোধহয় এটাই আমার চরিত্র।
প্রশ্ন: আপনি তো কোনও দিনই রেখেঢেকে কথা বলেন না! তৈরি থাকুন হয়ত দু'ঘণ্টা পর থেকে এই বলে আক্রমণ করা হবে আপনাকে যে আপনি রাজনীতিতে আসতে চাইছেন। সেই জন্য এই সিস্টেম বা সিস্টেমটা যাঁরা চালান, সেই প্রভাবশালীদের যাবতীয় ব্যর্থতা, ভুলত্রুটি তুলে ধরছেন। আপনি সেই আক্রমণের জন্য প্রস্তুত?
উত্তর: দেখুন, বিষয়টা হচ্ছে রাজনৈতিক সচেতনতা, আর রাজনীতিতে আসা, দু'টির মধ্যে বিস্তর ফারাক। আমি চিরকালই রাজনৈতিক সচেতনন। যখন আইনজীবী ছিলাম, পরবর্তীতে সমাজের যে কোনও অংশের লোক, তাঁরা সকলেই রাজনৈতিক সচেতন। কিন্তু যে রাজনৈতিক বাতাবরণ আজ ভারতে তৈরি হয়েছে, তাতে যাঁরা রাজনীতিতে এলে দেশের উপকার হতো, তাঁরা সযত্নে সেটি এড়িয়ে চলেন। আমি তাঁদের দলে।
প্রশ্ন: আপনি বাতাবরণের কথা বলছেন। আপনি কখনও ভেবেছেন, যে এখন বিচারপতি পরিচয়ের আগে অবসরপ্রাপ্ত শব্দবন্ধ বসে গিয়েছে। যে রাজ্যে রায় পছন্দ না হলে সরাসরি রাজনৈতিক দলের মুখপাত্ররা বিচারপতির নাম নিয়ে আক্রমণ করেন, বিচারপতির বাড়িতে রাতে দুষ্কৃতীরা পোস্টার সেঁটে দেয়, সেই সিসিটিভি ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তাদের ধরতে পারে না বা ধরে না। সেই রাজ্যে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির মুখ খোলাটা কতটা ঝুঁকির?
উত্তর: ঝুঁকি, না ঝুঁকি নয়, সেটা বিচার্য বিষয়। আমি মনে করি আইনজীবীরা প্রত্যেকেই একটু সাহসী অন্য পেশার লোকেদের থেকে। সাংবাদিকদারও বা যাঁরা জনগণকে নিয়ে ডিল করেন। সুতরাং বিচারপতিদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বা ভয় খুব একটা কাজ করে না। আমারও তেমন কিছু মনে হয় না।
প্রশ্ন: একজন সাধারণ মানুষের মনে "বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু"র নাম ভেসে উঠলে, ভেসে ওঠে শিক্ষা দুর্নীতির কথা। মানে শম্ভু মিত্রের নাটকের ভাষায়, 'যে দুর্নীতির তল নাই, তল নাই, কত বাঁও জল দেখো'। আপনি বিচারপতি হিসেবে শিক্ষা দুর্নীতি মামলার তল খুঁজে পেয়েছিলেন?
উত্তর: দেখুন বিচারপতি তো আর অর্ডার এগজিকিউট করবেন না! বিচারপতি দেখবেন কোথায় ভুল রয়েছে, কোথায় গন্ডগোল হয়েছে। আমি এবং যাঁরা এটা নিয়ে ডিল করেছিলেন, তাঁরা তল বা গন্ডগোলটা কোথায়, তা শনাক্ত করতে পেরেছিলেন। কিন্তু এই তলে পৌঁছনোর কাজটা যেটাকে আনডু করার দায়িত্ব যাদের উপর ছিল, তারা ব্যর্থ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ব্যর্থ।
প্রশ্ন: বাগ কমিটির রিপোর্ট দেখিয়েছিল দুর্নীতি হয়েছে, স্পষ্ট দুর্নীতি হয়েছে। স্কেলটার আভাসও দিয়েছিল যে বিপুল দুর্নীতি হয়েছে। কিন্তু সমাধান কী? সেই পুরনো কথা, কোর্টের কথায় যেতে হবে যে চাল ও কাঁকর আলাদা করা। চাল ও কাঁকর আলাদা করা গেল না, নাকি যে আশঙ্কাটা সবার মনে উঁকি দিচ্ছিল যে, কাঁকরের স্বার্থ রক্ষা করতে ইচ্ছে করে চাল ও কাঁকরকে আলাদা করা হল না?
উত্তর: আমার প্র্যাকটিস জীবন ছিল মূলত দেওয়ানি আদালতে, সিভিল মামলায়। আমি খুব মামলা করতাম ম্যাট্রিমোনিয়াল মামলা। সারা ভারতে ম্যাট্রিমোনিয়াল মামলা করে বেড়াতাম। শিক্ষা সংক্রান্ত মামলা নিয়ে ধারণা ছিল, এটাকে আইনের ঠিক কোনও ব্যাখ্যা মনে করতাম না আমি। কারণ কিছু সরকারি নির্দেশ, বিজ্ঞপ্তির উপরই সবটা নিয়ন্ত্রিত। আইনের ব্যাখ্যার খুব একটা স্কোপ আছে বলে মনে করতাম। এ নিয়ে অনেক ঠাট্টা-ইয়ার্কিও করতাম। সিনিয়র উকিল বন্ধু, জজেরা বলতেন আপনি বেশি টেকনিক্যাল। হাসি ঠাট্টা চলত খুব।
কিন্তু একটা ধারণা ছিল যে, এমপ্লয়ার যখন রাজ্য, সেক্ষেত্রে সংবিধানে যে গ্যারান্টি রয়েছে, পাবলিক এমপ্লয়মেন্টের ক্ষেত্রে একটা পরিচ্ছন্নতা মেনটেন করা হবে। শিক্ষা সংক্রান্ত মামলার দায়িত্ব যখনআমার উপর পড়ল, সেটা ডিল করতে গিয়ে পুরনো সব ধ্যান-ধারণা বদলে গদেল। দুর্নীতি যে এভাবে হতে পারে, আমার এই ধারণা ছিল না। অনেক দিন আগে প্রাথমিক ভাবে আমি ভেবেছিলাম, নিয়োগ প্রক্রিয়াই বাতিল করতে হবে। এছাড়া উপায় নেই। সেই সময় বন্ধুস্থানীয় জজসাহেবদের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছিলাম যে, একটা ভিন্ন মত রয়েছে যে সবাই দুর্নীতিপরায়ণ নয়। যারা চাকরি পেয়েছে, সবাই যে গণদুর্নীতি করে চাকরি পেয়েছে, তা নয়।
এই মিশিয়ে দেওয়াটা হয়ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যাতে বাছা না যায়। কিন্তু মামলা ডিল করতে গিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম যে, না করা যায়! এসএসসি-র সার্ভারের সঙ্গে সিবিআই যা রিট্রাইভ করল, সেটা, মিলছে না। সেটা কি কঠিন ব্যাপার ছিল! আমার তো মনে হয় না। একটি মামলায় দেখেছিলাম, অদ্ভুত ঘটনাক্রম ছিল মামলাটির। একজন প্রোথিতযশা আইনজীবী বললেন যে, একজন একটি নির্দিষ্ট স্কুলে চাকরি করছেন। তিনি কোনও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অংশই নেননি। কিন্তু চাকরি করছেন। কী ভাবে করছেন? খোঁজ খোঁজ খোঁজ...জানা গেল, অন্য এক শিক্ষক যিনি সিলেকশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চাকরি পেয়েছেন, তাঁর রেকমেন্ডেশন মেমোটি নকল করে এবং আর একজনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট মেমো নকল করে সে ওই স্কুলে চাকরি করছেন। সিআইডি-র অধীনে আমি একটি SIT তৈরি করি। তারা ডিটেক্ট করল, ওই স্কুলে আরও এমন দু'-তিন জন শিক্ষক পাওয়া গেল যাঁরা ওইভাবে পাঁচ-সাত বছর চাকরি করে যাচ্ছেন। আমি খুব আশ্চর্য হয়েছিলাম যে এটা কী করে সম্ভব!
প্রশ্ন: এটা কি মুর্শিদাবাদের গোথা হাই স্কুল!
উত্তর: হ্যাঁ হ্যাঁ।
প্রশ্ন: সেখানে তো এমন ঘটনাও ছিল যে, বাবা স্কুলে, ছেলে জালিয়াতি করে চাকরি পাচ্ছে!
উত্তর: এই জালিয়াতির যে ধরন, আমার একটা বিষয় মনে হয়েছিল যে, একজন দু'জনের জন্য এত বড় একটা প্ল্যান হ্যাচ করা খুব একটা হয়ত কার্যকরী নয়, অর্থনৈতিক ভাবেও নয়। তাহলে কি শিকড় অনেক দূর পর্যন্ত? আমি একটা অদ্ভুত অ্যাপ্রোচ দেখেছিলাম। সিআইডি-র তরফে বলা হয়, 'আমাদের কাছে অভিযোগ এলে খুঁজে বের করব'। কিন্তু এই অভিযোগ...একজন আর কত জানবেন?
প্রশ্ন: আপনি এজলাসে বসে বলেছিলেন, একজন-দু'জনের জন্য এই দুর্নীতি হতে পারে না!
উত্তর: এমন দু'একটি জেলায় বিচ্ছিন্ন ভাবে দু'একজনকে পাওয়া গেল। তার পর সেই তদন্ত বেশি দূর এগিয়েছিল বলে জানা নেই। এমন একটি মামলা ডিল করতে গিয়ে আমি একটি নির্দেশ দিয়েছিলাম, যে কমিশন অফ স্কুল এডুকেশন, বোর্ডের প্রেসিডেন্ট এবং স্কুল সার্ভিস কমিশনের প্রেসিডেন্টকে নিয়ে একটি কমিটি তৈরি করে দিই। বলেছিলাম, বাংলায় যে ১-১.৫ লক্ষ শিক্ষক-শিক্ষিকা আছেন। তোমরা একটি ওয়েবসাইট তৈরি করো, যেখানে টিচারদের নিয়োগের তারিখ থেকে নিয়োগ প্রক্রিয়া, অবসররের তারিখ সব থাকবে।
প্রশ্ন: এমপ্লয়ি ডেটাবেস রয়ে গেল, স্বচ্ছতা তৈরি হল!
উত্তর: হ্যাঁ এতে অনেকগিলি জিনিস বেরিয়ে আসবে, কোমন স্কুলে কোন সময় শিক্ষক শিক্ষিকার সংখ্যা কত, অবসররের পর শূন্যপদ কত, পড়ুয়া এবং শিক্ষকের হার কত...সমস্ত পাওয়া যাবে। শূন্যপদ নিয়ে বিভিন্ন মামলা পেয়েছি। কোন সময় বিচার হবে মামলা, তাহলে প্রত্যেকের কাছে নিয়োগ প্রক্রিয়ার আগে পরিষ্কার ছবি থাকবে, যে এত সংখ্যক শূন্যপদ। চাল আর কাঁকর বললেন না, ওটাই আমার মাথায় ছিল। এটা করা গেলে চাল আর কাঁকর বাছতে ওই ডেটাবেস কাজে লাগানো যেত। কিন্তু কিছুটা গেলেও, দুর্ভাগ্যজনক ভাবে করা যায়নি।
প্রশ্ন: প্রথমে আইনজীবী, তার পর বিচারপতি হিসেবে সম্পর্ক ভাঙাগড়ার মামলা করতেন। সেখান থেকে সরাসরি চলে এলেন স্বপ্ন ভাঙাগড়াতে। কারণ ছাত্রদের স্বপ্ন, শিক্ষকদের স্বপ্ন এবং যোগ্য শিক্ষক, যোগ্য প্রার্থীদের স্বপ্ন। একধাক্কায় এতগুলো ভেঙেচুরে যাচ্ছে। এই সংশোধনের প্রক্রিয়া, যা আপনি সুপারিশ করেছিলেন, যাদের তদন্তভার যাদের দিয়েছিলেন, তাতে আসতে চাই। আদালতে দাঁড়িয়ে SSC দুর্নীতি স্বীকার করে যে চাল ও কাঁকর আলাদা করতে পারছে না, ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভাবে। নবম-দশমের একটি মামলায় আমি দেখছিলাম, SSC-কে বললেন, 'আপনি এখন বাল্মীকি, আবার রত্নাকরের রূপে ফিরে যাবেন না'। কিন্তু যে তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে দায়িত্ব দিয়েছেন বার বার, সিআইডি এবং বিশেষ করে পরের দিকে সিবিআই। শিক্ষা-দুর্নীতির তদন্তে তাদের নিয়ে এজলাসে বসে বার বার হতাশা ব্যক্ত করতে হয়েছে!
উত্তর: আমার সেই হতাশা বেড়েছে বই কমেনি একটুও। সত্যিই কথা বলতে কী, বাস্তব কথা বলি, শেষের দিকে আমার দমবন্ধ হয়ে আসত, যে এটা কী হচ্ছে! আমি নিজে বিচারপতি হিসেবে অনেকর বিনিদ্র রাত কাটিয়েছি। এটকা উদাহরণ দিই। একসময় দেখা গেল, প্রমাণ করার কিছু নেই। দুর্নীতি ডকুমেন্টেট। শূন্য পাওযা প্রার্থীর নম্বর হয়ে গিয়েছে ৫৫। এসএসসি হলফনামা দিয়ে সেটা বলল। 'আমি প্রশ্ন তুলেছিলাম, এর চাকরি পাওয়ার কোনও অধিকার নেই। জালিয়াতি প্রক্রিয়া। এটাই যদি তোমার স্ট্যান্ড হয়, কারণ তোমার যে ক্ষমতা, তাতে কেউ মিথ্যে বলে, জালিয়াতি করে চাকরি হাতালে, তুমি সুপারিশ যে কোনও সময় তুলে নিতে পারো। মামলা যখন সুপ্রিম কোর্টে গেল, SSC বলল, 'বিচারপতির নির্দেশে করেছি'। তাহলে রত্নাকর থেকে বাল্মীকিতে উত্তরনের আশা যে আমি রেখেছিলাম তাদের উপর, তা সত্যিই থাকল না। বুঝলাম, তারা সত্যিই চায় না এটা পরিচ্ছন্ন হোক।
প্রশ্ন: কিন্তু যাদের পরিচ্ছন্ন করার দায়িত্ব আপনি দিয়েছেন, তাদের ভূমিকা! ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসি আপনি বলেছিলেন, 'যেভাবে স্কুলে নিয়োগ দুর্নীতির তদন্ত CBI চালাচ্ছে,তা চলতে পারে না। যা করার তাড়াতাড়ি করুন।' সামগ্রিক ভাবে আজ যদি জিজ্ঞেস করি, প্রথম কোনও বিচারপতিকে বলতে শুনলাম দমবন্ধ পরিস্থিতি, বিনিদ্র রাত কাটাতে হয়েছে। কতটা ফ্রাস্ট্রেটিং, কতটা হতাশাজনক যখন দেশের সবচেয়ে বড় তদন্তকারী সংস্থা, তারা আপনাকে সন্তুষ্ট করতে পারছেন না, বা আপনি যেভাবে তদন্ত আনআর্থ করতে চাইছেন, সেভাবে তারা রিপোর্ট দিতে পারছে না?
উত্তর: বিষয়টা আমার কাছে পরিষ্কার ছিল না।
প্রশ্ন: কারণ কী মনে হয়?
উত্তর: কারণের জায়গায় জানার মতো এত তথ্য় বিচারপতির কাছে আসে না। আর আমি ব্যক্তিগত ভাবে আমি জানতে চাইও বা। প্রত্যেকটা এজেন্সি, প্রত্যেক সংস্থার কাজ আলাদা। বিচারপতির কাজ এটা নয়। বিচারপতি বড় জোর বলতে পারেন, এই আইন অনুযায়ী হয়নি। সুতরাং এটা হতে পারে না। এটা বেআইনি। কিন্তু বেআইনিকে কী ভাবে 'আনডু' করবে, তার নির্দেশ, তার এগজিকিউশন বিচারপতি করতে পারেন না।
প্রশ্ন: আমি বলছি CID বা SSC-র যা ভূমিকা তা নিয়ে সন্দেহ আমি বুঝি। কারণ SSC অবস্থান বদল করছে মারাত্মত, তাদের বডিই দুর্নীতি করেছে। কিন্তু CBI-এর মতো সংস্থা, যাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সুতোতে কোনও যোগাযোগ পাচ্ছি না, তারা ফেল করছে, অথবা কাজ করছে না, এবং আপনি নন শুধু, পর পর কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিরা তাদের তদন্তে হতাশ হচ্ছেন! এটা কী করে সম্ভব, কেন?
উত্তর: এটা সত্যিই একটা রহস্য। এটা আমি একটাই কথা বলতে পারি, ভূতের গল্পের মতো। বিশ্বাস করি আছে, ভয় লাগে। কিন্তু আদতে দেখিনি কখনও। কেন ঘটনাটা ঘটল, কেন হল না, এর কোনও ব্যাখ্যা আমি নিজের যু্কতি দিয়ে করতে পারিনি। একটি মামলায় CBI-কে দায়িত্বকে দেওয়া হল, সেই মামলা সুপ্রিম কোর্টে গেল, CBI সেই মামলায় হাজির হল না। কী করবেন! জজ সাহেব নিজে গিয়ে সওয়াল করবেন যে এটা এই হওয়া উচিত?
প্রশ্ন: টু জি মামলায় বিচারপতি বলেছিলেন, 'প্রতিদিন ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করি যে আজ CBI তথ্যপ্রমাণ নিয়ে আসবে এবং তারা আসে না। আমি প্রতিদিন হতাশ হই'। সেই মন্তব্য মনে পড়ে যাচ্ছে!
উত্তর: একদম। আপনাকে বলি, এর পর বোধহয় আর কোথাও নামার নেই, আর কোথাও যাওয়ার নেই। একটি ছবির কথা মনে পড়ছে, হলিউড ছবি, ইনস্ট্যান্ট জাস্টিস। তাতে জজসাহেবরা হতাশ হয়ে পড়ছিলেন। জামিন পাওয়া, বেরিয়ে যাওয়া। বিচারপতিরা মিলে ঠিক করেন যে আমরাই এগজিকিউশন ফোর্স তৈরি করব। কিন্তু সিস্টেমটা এমন যে দেখা গেল, বিচারপতিরা বুঝলেন দু'টি কাজ একসঙ্গে হয় না। এটাই ঘটনা। যে অর্ডারের এগজিকিউশন নেই...একটা সময় আসতে পারে, বিচারক মনে করতে পারেন, কী হবে? কী হতে পারে? আমি বলব, সবাই বুঝবে! যেটা খুব লক্ষ্যণীয়, দুর্নীতি বা নীতির দিক থেকে যেটা স্ট্যান্ডার্ড যেটা বাঙালি সমাজের ক্ষেত্রে বিশেষ করে বলব, বাঙালি বা মধ্যবিত্ত বাঙালি মেনে নিতে পারত না, আজ কিন্তু কেমন একটা গ্রহণযোগ্যতার জায়গা চলে এসেছে।
প্রশ্ন: আপনি বলছেন দুর্নীতির বাঙালির গা সয়ে গিয়েছে? মারাত্মক ব্যাপার।
উত্তর: সামাজিক ভাবে মারাত্মক ঘটনা কিন্তু। ও তো হবেই। কিছু করার নেই। হতাশার লক্ষণই শুধু নয়। নীতি হিসেবে যদি এটাকে মেনে নিই বা মেনে নেওয়ার অভ্যাস হয়ে যায়, তাহেল সমাজটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা ভাববার বিষয়।
প্রশ্ন: এই পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি, যেটা আপনি বলছেন বঙ্গসমাজকে গ্রাস করেছে কার্যত, তার অভিঘাত তো বঙ্গসমাজের সর্বত্র পড়েছে! চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্যদের জন্য সৎ-যোগ্যরা বঞ্চিত হয়েছেন, আবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অযোগ্যদের পাশাপাশি একই সঙ্গে চাকরি হারিয়ে ওই যোগ্য-সৎ চাকরিপ্রাপকরা বঞ্চিত হয়েছেন! এই ডামাডোলে বছরের পর বছর পরীক্ষা না হওয়ায় নতুন চাকরিপ্রার্থীরা বঞ্চিত হয়েছেন! এঁরা অন্তত মামলা করার সুযোগ পেয়েছেন আদালতে। এজলাসে তাঁদের কথা আলোচনা হয়েছে বিভিন্ন সময়। কিন্তু আর একটি পক্ষ আছে, যারা চূড়ান্ত বঞ্চিত। প্রায় একটা প্রজন্ম, যাদের শিক্ষার ভিত নড়বড়ে হয়ে গেল। টাকা দিয়ে শিক্ষকের চাকরি কেনা একশ্রেণির জালিয়াতদের হাতে পড়ে যআদের ভবিষ্যৎ চিরকালের মতো লঝঝরে গয়ে গেল। তাদের হয়ে তো কেউ মামলা করলেন না? দিনের শেষে বাঙালি কি দুর্নীতির সবচেয়ে বড় শিকার ছাত্রছাত্রীদের কথা ভুলে গেল?
উত্তর: বললাম না, আমার শেষের দিকে মনে হতো, এটা আমি কী করছি? সত্যি সত্যিই কি আমি আমার অবলিগেশন, কমিটমেন্ট, ওথ যা-ই বলুন, তা কি পালন করতে পারছি আমি? মানুষ কিন্তু শেষ সহায় হিসেবে বিচারব্যবস্থার দিকে তাকিয়ে থাকেন। এই পুরো শিক্ষাব্যবস্থার বেনিফিশিয়ারি কে? পড়ুয়া! কিন্তু আমার প্রতি মুহূর্তে মনে হয়েছে, পুরো বেনিফিশিয়ারি কারা না একমাত্র শিক্ষকদের চাকরি, তাঁদের রোজগারের সঙ্গে জড়িত। স্কুলে একটা বাচ্চা, মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলগুলি এখনও বাংলার মেন স্ট্রাকচার, শিক্ষার ভিত্তি। সেই সব স্কুলগুলি কী ভাবে প্রভাবিত হচ্ছে, ছাত্রদের কথা কেউ বলল একজন এসে! একটি মামলাও পাইনি কেউ ছাত্রদের কথা বলছেন! হ্যাঁ, কী হয়েছে, ঘটনাচক্রে যখন ছাত্রদের কথা উঠেছে, কোর্ট সক্রিয় হয়েছে। আমি একটা কথা বলতে পারি, শিক্ষক সমাজে একটা গ্রিভান্স আছে আমার অ্যাপ্রোচ টুওয়ার্ডস ট্রান্সফআর নিয়ে। আপনি যদি পরিসংখ্যান নেন, এই 'উৎসশ্রী' বলে যে পোর্টাল তৈরি হয়েছিল, বিজ্ঞানসম্মত, কিন্তু অপব্যবহারে গ্রামের স্কুলগুলি ফাঁকা হয়ে গেল এবং শহর ও শহরতলির সব স্কুল ভর্তি হয়ে গেল, কী জন্য? শহরের সুবিধাগুলি পাওয়ার জন্য। আপনি স্কুল দেখুন, কলকাতার সব বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলিতে...এমন স্কুল আছে পাঁচ জন ছাত্র, ১০ জন শিক্ষক। টিচার্স রুম ভর্তি, ক্লাস রুম ফাঁকা।
প্রশ্ন: অথচ 'উৎসশ্রী' পোর্টালের উদ্দেশ্য ঠিক উল্টো হওয়ার কথা ছিল যে আমি বিকেন্দ্রীকরণ করব!
উত্তর: ঠিক তাই। যখন এই মামলাগুলি ডিল করছি, সেই সময় আমার ভাবনা ছিল যে, ইটস ইনসিডেন্ট অফ ইওর সার্ভিস। এমন করলে হবে না। এর মধ্যে কিছু রুল ছিল। কিন্তু রুলগুলিকে এমন ভাবে ব্যাখ্যা করা হল যেন ট্রান্সফার অধিকারের মধ্যে পড়ে। স্কুল চুলোয় যাক। ৩০০০ পড়ুয়া, একজন ইংরেজির শিক্ষক, একজন অঙ্কের শিক্ষক। পরিস্থিতি ভাবতে পারছেন! এমন পরিস্থিতিতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কী করেছিলেন ভাবুন। আমি সুপারিশ করেছিলাম ব়্যাশনালাইজেশন প্রোগ্রাম। পড়ুয়া ও শিক্ষকদের হার অনুযায়ী ডিস্ট্রিবিউশন হোক।
প্রশ্ন: শিক্ষা দফতর এই প্রস্তাব নিয়েছিল?
উত্তর: কিছুটা এগিয়ে কোথায় হারিয়ে গেল জানা গেল না আর। একটা ব়্যাশনালাইজেশন প্রোগ্রাম, কাগজে কলমে অনেক কিছু হয়। তার কার্যকারিতা...আমি বিচারপতি হিসেবে বলছি, চাপ দিচ্ছি। আমাদের পূর্বতন অ্যাডভোকেট জেনারেল সক্রিয় ছিলেন খুব, করেওছিলেন অনেক কিছু। কিন্তু কার্যকরার করার জায়গায় নিয়ে যাওয়া হল না।
প্রশ্ন: হিন্দু স্কুলের বাচ্চারা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছে যে তাদের ৪৬ জন শিক্ষক থাকার কথা, সেখানে ২৬ জন পড়াচ্ছেন। এবছরের শেষে তা ২৩-এ নেমে যাবে এবং পড়ুয়া ও শিক্ষকের অনুপাত হল ১=৮০। চাঙড় খসে পড়ছে, ল্যাবের অবস্থা তথৈবচ, চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর টয়লেট। হিন্দু স্কুলের এমন অবস্থা হলে জেলার সাধারণ স্কুলের কী অবস্থা?
উত্তর: আমাদের সময় হিন্দু স্কুলের ছাত্র মানে অন্য চোখে দেখা হতো। হিন্দু স্কুলের শিক্ষ মানে কুলীন শিক্ষক। এই স্কুলটা খারাপ হওয়ার শুরু কিন্তু আজকে নয়। যেদিন থেকে লটারি পদ্ধতি চালু হল, সেদিন থেকেই উৎকর্ষ হারাতে শুরু করল। কেন করা হয়েছিল জানি না। কলকাতা শহরের স্কুলের পরিসংখ্যান যদি দেখেন, কত স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। শিক্ষা দফতরের তো চিন্তা করা উচিত! আর সিলেবাসের কথা এলে, আগে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের সিলেবাস CBSC, ICSC বোর্ড ফলো করত। শেষ বার কবে সিলেবাস রিভাইস হয়েছে? এটা কি ছাত্ররা করবে? শিক্ষা দফতর কেন আছে?
প্রশ্ন: জালিয়াত আর শিক্ষক যে পাশাপাশি উচ্চারণ করছে, তাই লজ্জা। যা ছবি এসেছে জেলা থেকে...ছাত্র অঙ্ক জিজ্ঞেস করলে...মাস্টারমশাই তো টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছে...মারছে ছাত্রছাত্রীকে। তারা রাস্তায় নামছে, অভিযোগ করছে। একের পর এক। বাংলামাধ্যম স্কুলের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলি ব্যাঙের ছাতার মতো পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে উঠল। চূড়ান্ত শোষণ। ন্যায্য বেতন পাচ্ছেন না শিক্ষকরা। মানের ঠিক নেই, কী ইংরেজি শেখানো হচ্ছে, কেউ জানে না। অ্যাবরাপ্ট ফি হাইক। কোনও আলোচনা নয়, এবং ভাবটা এমন দিতে পারলে দাও, নইলে ছেলেমেয়ে নিয়ে বিদায় হও!
উত্তর: ছাত্রদের কথা ভেবে মামলা কমপক্ষে আমার কোর্টে হয়নি। ট্রান্সফার মামলায় জানা গেল, একমাত্র শিক্ষক, অনেক অসুবিধা আছে। বললেন, 'আমার ছেলে ছোট, মেয়ে ছোট'। কয়টি সন্তান জানলে একমাত্র বা কিছু বলেছিলেন। আমি বলেছিলাম, 'কে বলল! আপনার স্কুলে ৯৫০ পড়ুয়া। প্রচ্যেকেই তো আপনার সন্তান। একজনের জন্য তাদের ছেড়ে চলে যাবেন, তা তো ঠিক নয়।' এতে প্রধান শিক্ষিকা জানালেন স্কুলে না আছে ওয়াশরুম...স্টেশনের কাছে স্কুলটি। সাইকেল স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয় স্কুলকে। সারাদিন লোক ঢুকছে। আমি নির্দেশ দিয়ে ভদ্রস্থ ওয়াশরুম করতে বললাম। গেটে সিভিক ভলান্টিয়ার দিতে বললাম অন্তত। আদিবাসী স্কুলের হস্টেল হয়েছে...এগুলি মামলা নয়, ঘটনাক্রমে আসছে। হস্টেলের বাউন্ডারি নেই। প্রধান শিক্ষিকা বললেন, সাহস পাচ্ছেন না মেয়েদের রাখতে। ডিপার্টমেন্টকে ধরে তবে কাজ হল। আমি আবার জানতে চাইলাম, হল তো! এটা তো বিচারপতির কাজ নয়!
প্রশ্ন: এটাকে তো বিচারপতির অতিসক্রিয়তাও বলতে পারেন কেউ। বিচারপতি তো স্কুলইনস্পেক্টর নন! অথচ মাইত্রোলেভেলে গিয়ে করতে হচ্ছে তাঁকে! জলপাইগুড়ির ফণীন্দ্রদেব বিদ্যালয়ে চলে গিয়েছিলেন সোজা। কেন যেতে হয়েছিল?
উত্তর: ওই স্কুলের পাশ দিয়ে সার্কিট বেঞ্চে যেতে হয় আমাকে। আমার ড্রাইভার একদিন বলল, একটি জিনিস দেখবেন! দেখুন কী সব পড়ে আছে। স্কুল থেকে ভাত ফেলা, মিড ডে মিলের বা অন্য কিছুর। জানতে চাইলাম এমন দশা কেন? আমি স্কুলে ঢুকে পড়েছিলাম। ডিআই-কে খবর দিয়েছিলাম। উনি এসেছিলেন। আমি দেখলাম সেদিন ৩২ জনের মধ্যে অর্ধেক অনুপস্থিত। কেন অনুপস্থিত? কেউ কেউ জানালেন, মাধ্যমিকের খাতা আনতে গিয়েছে। তৎক্ষণাৎ বোর্ডের কাছে জানতে চাই, খাতা আনতে গেলে সারাদিন স্কুল কামাই করতে হবে?
প্রশ্ন: বা অন্য সময় আনা যাবে না? স্কুলের পর?
উত্তর: আগে হেড এগজামিনারের বাড়ি থেকে আনতে হতো। পরে বোর্ড ব্যবস্থা করে, কাছাকাছি জায়গা থেকে আনতে হবে। এটা একটা অজুহাত মাত্র। একটা ছুটি পাওয়া যায়! আমি এমনও দেখেছি, ডিআই দেখলেন, গতকাল একজন অনুপস্থিত দেখছি! তিনি বললেন, "আমি সই করে দেব!" আমি বললাম, "কালকেরটা আজকে সই করতে পারলে আসারই তো প্রয়োজন নেই। না এসেও সই করতে পারেন!" হালকা ভাবেই আমি বলেছিলাম, বায়োমেট্রিকের কথা, যাতে সবটা নজর রাখা যায়। এই সিস্টেমগুলি বসানো কিন্তু কঠিন কাজ নয়।
প্রশ্ন: যাঁরা শিক্ষাদান করবেন, নৈতিকতার বিচারে তিনি এটা করবেন! যে শিক্ষক আমাকে শেখাবেন, তাঁকে থাম্ব ইম্প্রেসন দিয়ে বাঁধব!
উত্তর: সমাদের অবক্ষয় যদি একটি অঙ্গে ঘটে, তাহলে আর একটি জায়গা যে পুরোপুরি শুদ্ধ থাকবে তা প্রত্যাশা করতে পারি না। আমার মনে হয়, এই মুহূর্তে কঠোর হওয়ার প্রয়োজন আছে। শুধু শিক্ষকদের বললে হবে না। মিড ডে মিল যেমন, ওখানে সুস্থ লোক বসে খেতে পারবে না। খোলা নর্দমা, নোংরা। কর্মীদের জিজ্ঞেস করলে বলল, রোজ পরিষ্কার হয়। আমি ঝাড় চেয়ে বললাম নিজেই করি। তখন সেই লজ্জায় দু'চার জন এগিয়ে এসে হাত লাগাল। এটা ঠিক আইন করে, কোর্ট সবকিছু করতে পারবে না। আগে স্কুল ইনস্পেক্টর আসতেন। শেষ বার কবে হয়েছে জিজ্ঞাস করুন।