আবীর দত্ত ও বিটন চক্রবর্তী, কলকাতা : ২৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার পর পেরিয়ে গেছে প্রায় সাড়ে তিন মাস। এখনও বিচার পায়নি নাজিরাবাদে নিহতদের পরিবার ? ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ওই অভিশপ্ত গোডাউনে এখনও নারকীয় ঘটনার ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু এখনও পাওয়া যায়নি ফায়ার অডিটের রিপোর্টই। এই পরিস্থিতিতে কোন পথে এগোবে তদন্ত ? খুব দ্রুত নাজিরাবাদ ফাইলস খুলবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন সোনারপুর উত্তরের সদ্য নির্বাচিত বিধায়ক দেবাশিস ধর।
তিলজলায় ভয়ঙ্কর ছবি। ফের মৃত্য়ু, ফের প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। নিয়ম কানুন শিকেয় তুলে ব্য়বসা চালানো। গরিবের জীবনের কোনও মূল্য় না দেওয়া। মনে করিয়ে দিচ্ছে, জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে কনকনে এক শীতের রাতের কথা। হাড়হিম করা ঠান্ডার মধ্যেই জীবন্ত পুড়ে ছাই হয়ে গেছিলেন ২৭ জন। গোডাউনের গেটে বাইরে থেকে ছিল তালা। ভিতর থেকে শোনা যাচ্ছিল শুধুই আর্তনাদ। শেষমেষ পড়ে ছিল শুধু হাড়গোর আর ছাই। মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে অসহায় গলা শুনে ছুটে এসেছিলেন অনেকের পরিজনরা। কিন্তু শেষমেষ বাঁচানো যায়নি ভিতরে থাকা কাউকেই। আনন্দপুরের নাজিরাবাদের মৃত শ্রমিকদের পরিবার বিচার পায়নি আজও।
পুড়ে যাওয়া গোডাউনের বাইরে থেকে দেখলে ভয়াবহতার আঁচ যতটুকু পাওয়া যায়, তার থেকে অনেক ভয়ঙ্কর ছবি ভিতরের। কিন্তু কাদের জন্য ২৭ জনের এই পরিণতি ? কাদের গাফিলতিতে প্রাণ গেল গোডাউনের শ্রমিকদের ? কোথায় দাঁড়িয়ে তদন্ত ? এ প্রসঙ্গে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেছেন, "সমস্যা যেগুলো আছে, সেগুলো আমরা এর আগেও একটা কমিটি করে ফায়ারের দায়িত্ব দিয়ে ফায়ার অডিট করাতে বলেছিলাম। রিপোর্টটা আসেনি। কিন্তু শেষগুলো করে যাতে একটা সুষ্ঠু সমাধান হয়। না সে রিপোর্ট আসেনি।"
এখানেই নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে, এখনও ফায়ার অডিট রিপোর্ট আসেনি কেন ? কার দায় ?কার গাফিলতি ? কাউকে কি আড়াল করা হচ্ছে ? আনন্দপুরের নাজিরাবাদে যে জায়গায় এই ঘটনা ঘটেছিল, তা সোনারপুর উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। ঘটনার সময় এখানকার বিধায়ক ছিলেন তৃণমূলের ফিরদৌসী বেগম। এখন রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। বিধানসভা নির্বাচনে সোনারপুর উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছেন বিজেপির দেবাশিস ধর। প্রাক্তন IPS অফিসার। নতুন সরকার নাজিরাবাদ ফাইলস খুলবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেছেন, "আমরা মানুষকে কথা দিয়েছিলাম যারা যারা দোষী আছে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। ফলে খুব বড় ধরনের আমরা এই ব্য়াপারটা নিয়ে এগোব। আমরা প্রশাসনকে নিয়ে আদতে কারা কারা জড়িত, এর মধ্যে কাদের কাদের রোল ছিল, সেই ব্য়াপারে কিন্তু আমরা প্রত্যেকটি জিনিস খুঁটিয়ে নাটিয়ে দেখে তার পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।।"
শহরে অগ্নিকাণ্ডের ইতিহাসে ভয়াবহ অধ্যায় হিসাবে উঠে এসেছে নাজিরাবাদ। বেআইনি নির্মাণ...। অগ্নিনির্বাপক ব্য়বস্থাকে হেলায় উড়িয়ে দিয়ে, ব্য়বসা চালানোর ফল যে কী মারাত্মক হতে পারে, তার পরিণাম নাজিরাবাদ।
কখনও নাজিরাবাদ। কখনও তিলজলা। আগুন লাগে, প্রাণ যায়। রিপোর্ট আসার অপেক্ষায় থাকে নিহতদের পরিবার। কিন্তু মাথাদের কি কখনও কোনও শাস্তি হয় ? রাজ্য়ে রাজনৈতিক পালাবদলের পর কি হবে ? যেভাবে বুলডোজার দিয়ে বেআইনি নির্মাণ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তাতে আশায় বুক বাঁধছে রাজ্য়বাসী। তাঁদের আশা, এবার কিছু একটা হবে। মূল দোষীরা আর পার পাবে না।
