কলকাতা: প্রয়াত বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও প্রাক্তন রেলমন্ত্রী মুকুল রায়। একসময়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড বলেই পরিচিত ছিলেন তিনি। মুকুল রায়ের প্রয়াণের খবরে রাজনৈতিক মহলে শোকের ছায়া। চলুন ফিরে দেখা যাক, আজ থেকে ঠিক ৯ বছর আগে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে কী বলেছিলেন মুকুল রায়।
আরও পড়ুন, কলকাতায় বসে বড়স়ড় নাশকতার ছক? পশ্চিমবঙ্গে সক্রিয় মডিউল ! 'অভিযুক্ত লস্কর-ই-তৈবার হ্যান্ডলার..'
তৃণমূল প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই দলে ছিলেন মুকুল রায়। ২০০৬ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে রাজ্যসভার সাংসদ হন তিনি। ২০১২ তেও মুকুল রায়কে রাজ্যসভার টিকিট দেয় তৃণমূল কংগ্রেস। ২০০৯ থেকে ২০১১, দ্বিতীয় UPA সরকারের জাহাজ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন মুকুল রায়। ২০১২ সালে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকার তৈরি হওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেড়ে আসা রেলমন্ত্রী পদে বসানো হয় দীনেশ ত্রিবেদীকে। কিন্তু সেবছরেই রেল বাজেটে ভাড়া বাড়ানো নিয়ে বিতর্কের জেরে দীনেশ ত্রিবেদীকে সরিয়ে মুকুল রায়কে রেলমন্ত্রী করার প্রস্তাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শেষমেশ চাপের মুখে দীনেশ ত্রিবেদী ইস্তফা দিলে তাঁর জায়গায় রেলমন্ত্রী করা হয় মুকুল রায়কে। এই ঘটনার ৫ বছর পর তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে মুকুল রায়ের পথচলায় ঘটে ছন্দপতন।
২০১৭ সালের ১১ অক্টোবর, তৃণমূল তৈরির দু'দশকের মাথায় জোড়াফুল শিবির ছাড়ার ঘোষণা করেন তিনি। মাসখানেকের মাথায়, সেবছরের ৩ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ দেন মুকুল রায়। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে নেপথ্য়ে থেকে কাজ করলেও, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে বিজেপি তাঁকে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্রে প্রার্থী করে। তৃণমূল প্রার্থী কৌশানী মুখোপাধ্য়ায়কে ৩৫ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়ে বিধায়ক হন মুকুল রায়। তবে তারপরেই ফের তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ফের নতুন মোড় আসে।একুশের ভোটে বিজেপির প্রতীকে জেতার মাত্র কয়েকদিনের মধ্য়েই ২০২১ সালের ১১ জুন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে তৃণমূলের অফিসে দেখা যায় মুকুল রায়কে। যদিও এরপর বিধানসভার অধ্যক্ষের ঘরে শুনানিতে, মুকুল রায়ের আইনজীবীরা যে পিটিশন জমা দেন, তাতে দাবি করা হয়, মুকুল রায় বিজেপিতে আছেন। কখনও তৃণমূলে যাননি।
৯ বছর আগের এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার
বিজেপি যোগ দানের পর, ২০১৭ সালের ৬ নভেম্বর এবিপি আনন্দ-র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (Executive Vice President) সুমন দের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনে নিজের মতামত প্রকাশ করেছিলেন মুকুল রায়।
মুকুল রায় : ওয়ান ম্যান পার্টি খুব মুশকিল আছে। আমরা নিশ্চিত সেই ওয়ান ম্যানকে সামনে রেখে, চোখ বন্ধ করে, একটা বাম বিরোধী লড়াইয়ে নিশ্চয়ই ছিলাম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখেই ছিলাম। ..সেই সময় বিজেপি ২০১১ সালে ভোট পেয়েছে ৪ শতাংশ। মানে ভারতীয় জনতা পার্টির লোকেরা তার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। সেই ভারতীয় জনতা পার্টি ২০১৪ সালে পৌঁছে, ১৯-২০ শতাংশ ভোট পেয়ে গেল। আবার ২০১৫ এর উপনির্বাচনে গিয়ে, ২৪-২৫ শতাংশ ভোট পেয়ে গেল।
সুমন দে: ঠিকই । কিন্তু পাশাপাশি তৃণমূলেরও ভোট বাড়ছে..
মুকুল রায় : ..ধুপগুড়িতে ৪০ শতাংশ ভোট এখন ভারতীয় জনতা পার্টির। পাশকুড়াতে ৪২ শতাংশ ভোট তৃণমূল কংগ্রেসের। ..
সুমন দে: প্রত্যেকটা সিটে মুকুলদা, তৃণমূলেরও ২-৩ শতাংশ , ক্ষমতায় আসার ৬ বছর পরেও বাড়ছে ?
মুকুল রায় : কীভাবে বাংলায় নির্বাচন হচ্ছে ? তুমি একজন সাংবাদিক হয়ে তুমি কি মনে করো, পরিচ্ছন্ন ভোট (Free and Fare Election) হচ্ছে ? (পাল্টা প্রশ্ন)
সুমন দে: সেতো অধিকাংশ অভিযোগ, 'তুমি যখন তৃণমূল কংগ্রেসে ছিলে, মুকুল রায় কী চমৎকার মেশিনারি সাজিয়েছে যে, বিরোধীরা ভোট দিতেই পারে না'..
মুকুল রায় : সিপিএম-র বিরুদ্ধে করতাম। ..না না আমি তখন...কোনও লোকসভা কোনও বিধানসভা নির্বাচন, আমি দায়িত্বে আছি, মানুষ ভোট দিতে পারেনি, এই অভিযোগ কেউ করেনি। কেউ করেনি।
সুমন দে: আপনি বলছে মুকুলদা,....২০১৩ সালের ...এখনও আর্কাইভে আছে।
মুকুল রায় : ২০১৩ -তে অভিযোগ হল, ৬৭ জন লোক মারা গিয়েছিল, নির্বাচন হয়েছিল। কেন্দ্রীয় বাহিনী বুথে ছিল। কিন্তু তার পর থেকে কোনও লোকাল সেলফ গভর্নমেন্টের নির্বাচন আমি করিনি।
সুমন দে: বেশ। তাহলে ২০১৭ সালে, মুকুল রায় যে দল ছাড়ল, তার একটা কারণ হচ্ছে, বিজেপির সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের যে সম্পর্ক, তাতে কনসিসটেন্সি ছিল না..
মুকুল রায় : হ্যাঁ নিশ্চয়ই। তার কারণ হচ্ছে, তুমি তোমার বক্তব্য, ..খুঁজলে পাওয়া যাবে। কিন্তু বিজেপি ইজ নট আনটাচেবল, কে বলেছিল , আমি বলেছিলাম ? ... আমি সেই সরকারের মন্ত্রী হলাম। এবং অনেক ভাল কাজও করলাম। তারপরে হঠাৎ করে বিজেপি ..
সুমন দে: কিন্তু মুকুলদা, অবস্থান পাল্টায় না, আজকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজকে বিজেপিকে সাম্প্রয়াদিক ভাবতেন না। পরে ভাবলেন। মুকুল রায়ও তো তৃণমূল কংগ্রেসে ছিলেন। এখন এই মুহূর্তে বিজেপি নেতা হিসেবে বসে আছেন । মানুষ এবং দল তো অবস্থান পাল্টায়, অন্তত আমরা যা দেখি।
মুকুল রায় : ১০০ শতাংশ কিন্তু....তৃণমূল যেদিন রেজিস্ট্রেশন পেয়েছে, সেদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস করছেন !