সিঙ্গুর: সিঙ্গুরে টাটাকে ফেরানোর প্রতিশ্রুতি শোনা গিয়েছে রাজ্য নেতৃত্বের মুখে। কিন্তু সিঙ্গুরে হাইভোল্টেজ সভা থেকে একাধিক ইস্যুতে মুখ খুললেও, একবারও টাটা-র কথা মুখে আনলেন না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গোটা বক্তৃতায় শিল্প অধরাই রইল কার্যত। শুধু বার্তা দিলেন, আইনশৃঙ্খলায় পরিবর্তন এলেই বিনিয়োগ আসবে। সেই নিয়ে হতাশা উগরে দিয়েছেন স্থানীয় মানুষজন। (Modi in Singur)
রবিবার সিঙ্গুরে মোদির সভা ঘিরে রাজ্য রাজনীতি সরগরম ছিল গত কয়েক দিন ধরেই। যে সিঙ্গুর আন্দোলন থেকে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের পত্তন, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সেই সিঙ্গুর অস্ত্রেই বিজেপি তৃণমূলকে ঘায়েল করতে চাইছে বলে জোর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু রবিবার টাটার মাঠে সভা করেও, একটি বারও টাটার নাম মুখে আনলেন না মোদি। (Narendra Modi News)
এদিন দুর্নীতি, অনুপ্রবেশ-সহ একাধিক ইস্যুতে রাজ্যের তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ করলেও, শিল্পের প্রসঙ্গ কার্যত এড়িয়েই যান মোদি। পশ্চিমবঙ্গে শিল্প ফেরানো নিয়ে কোনও প্রতিশ্রুতিই দেননি তিনি। শুধু বলেন, "রাজ্যে আইনশৃঙ্খলায় পরিবর্তন ঘটলে তবেই বিনিয়োগ আসবে," যা নির্বাচনী মোয়া বলেই মনে করছেন অনেকে।
তাই মোদির সভা শেষ হতেই সংবাদমাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দেন স্থানীয়রা। এবিপি আনন্দের ক্যামেরায় এক মহিলা বলেন, "আমরা প্রত্যাশা নিয়ে এসেছিলাম যে, এত দিন টাটা বন্ধ ছিল। মমতাদি কিছু করেননি। ভেবেছিলাম, মোদিজী এসে কিছু করবেন। কিন্তু উনি তো কারখানার ব্যাপারে কিছুই আলোচনা করলেন না, কিছুই বললেন না। অনেক গরিব-দুঃখী আছেন, না খেয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। আমরা আশা করেছিলাম যে, উনি নিজেমুখে বলবেন যে এখানে কারখানা হবে।"
অন্য আর একজন বলেন, "আমরা চাই হোক কিছু একটা। এখানে কত শিক্ষিত মানুষ চাকরির আশায় বসে আছেন অপেক্ষা করে। এখনও পর্যন্ত কিছু শুনলাম না সেরকম। দেখা যাক কী হয়।" মোদির সভা থেকে বেরিয়ে এক ব্যক্তি বলেন, "সিঙ্গুরের লোক আসা করেছিল, উনি এসে চাষ নিয়ে কথা বলবেন, সারের দাম কমানোর কথা বলবেন, চাষীদের বন্ধু হিসেবে কথা বলবেন। সেটা না করে ওঁর বন্ধুর ব্যবসা কী করে বাড়বে, কোথায় বন্দর হবে, আর কোন বন্ধুকে কী পাইয়ে দেওয়া যাবে, পার্টি ফান্ডে টাকা ঢুকবে...সেই চিন্তাভাবনাই চলছে ওঁদের।"
SIR নিয়ে বিতর্কের আবহে অনুপ্রবেশের প্রশ্নে ঢের আগেই নির্বাচনী সুর বেঁধে দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহরা। কিন্তু বিগত কিছু দিন ধরে সিঙ্গুর এবং টাটা-কে নিয়ে সুর বাঁধতে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি, যার একেবারে অগ্রভাগে ছিলেন রাজ্যে দলের প্রাক্তন সভাপতি তথা অধুনা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও সাংসদ সুকান্ত মজুমদার। তাঁকে বলতে শোনা যায়, "এখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আসছেন। ভবিষ্যতে টাটাও আসবে। আমরা জানি কী করতে হয়। শুধু রাজ্যে পালাবদল ঘটিয়ে শাসনক্ষমতায় আনতে হবে বিজেপিকে।" এমনকি তাঁকে আরও বলতে শোনা যায়, "সেই সময়কার আন্দোলনের মুখেরা বলছেন, ভুল করেছিলেন তাঁরা। সিঙ্গুরের কারখানা নরেন্দ্র মোদির গুজরাতে চলে গিয়েছে। আমি কথা দিচ্ছি, "২৬-এ বাংলায় মোদির সরকার গঠন করুন। টাটাকে আমার ফিরিয়ে আনবই, আনবই, এই সিঙ্গুরের মাটিতেই আনব। টাটা ফিরবে, শিল্প হবে।"
এর মঞ্চে বক্তৃতা করতে উঠে শুভেন্দু অধিকারী জানান, যে 'ব্যাড M'-কে ছেড়ে গুজরাতে 'গুড M'-এর কাছে গিয়েছিলেন রতন টাটা, আজ সেই 'গুড M' সিঙ্গুরে। কিন্তু এর পর মোদি দীর্ঘ ক্ষণ বক্তৃতা করলেও, একটি বারও টাটার নাম মুখে আনেননি। পশ্চিমবঙ্গে শিল্প, কারখানার সম্ভাবনা নিয়েও কোনও প্রতিশ্রুতি দিতে শোনা যায়নি তাঁকে। আর তাতেই হতাশ সিঙ্গুরবাসীদের একাংশ। সকাল থেকে টাটার ন্যানো গাড়ির আদলে কাঠামো গড়ে, শিল্পের দাবিতে স্লোগান লিখে যাঁরা জড়ো হয়েছিলেন সভাস্থলে, কার্যত নিরাশ হয়েই ফিরলেন তাঁরা।
সিঙ্গুরে কৃষকদের কাছ থেকে জমি অধিগ্রহণ থেকে কারখানার নির্মাণ, আন্দোলন থেকে টাটাদের প্রত্যাবর্তন, সেই থেকে হুগলি নদীর বুক দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। না চাষাবাদের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, না ফিরেছে ভারী শিল্পের সম্ভাবনা। বিজেপি-র রাজ্য নেতৃত্ব যেভাবে টাটাকে ফেরানোর কথা বলছিলেন বার বার, তাতে আশায় বুক বাঁধছিলেন অনেকেই। মোদি খোদ এসে বার্তা দিয়ে যাবেন বলে ভেবেছিলেন তাঁরা। কিন্তু আজ তাঁদের অনেকেই নিরাশ। তাই কটাক্ষ করতে ছাড়েনি তৃণমূলও। রাজ্যের মন্ত্রী বেচারাম মান্না বলেন, "এটা একটা জুমলা সভা। মানুষকে মিথ্যে বোঝানোর জন্য সিঙ্গুরকে বেছে নিয়েছেন মোদি। কারণ তাঁর কচিকাঁচা নেতারা, শিক্ষানবীশ নেতারা, যাঁরা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অনুমোদন না নিয়ে সিঙ্গুরে টাটাকে ফেরানোর কথা বলেছিলেন, তাঁদের উচিত শিক্ষা দিয়ে গেলেন উনি। কারণ উনি ভাল ভাবেই জানেন, সিঙ্গুরের জমি ব্যক্তিগত জমি, কৃষকদের জমি। কোনও শিল্প করতে গেলে জমি কিনে করতে হবে, নয়ত অধিগ্রহণ করতে হবে। মোদি জানেন বলেই সুকৌশলে সিঙ্গুরের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেলেন।"