ভাস্কর মুখোপাধ্যায়, কমলকৃষ্ণ দে, সৌরভ বন্দ্যোপাধ্যায়,কলকাতা: নেপাল-বিপর্যয়ের পর এখনও খোঁজ নেই বহু মানুষের। যেমন কাজের সূত্রে নেপালে থাকতেন পূর্ব বর্ধমানের বাসিন্দা সন্দীপকুমার গড়াই। কিন্তু বুধবারের বিপর্যয়ের পর থেকে আর খোঁজ মিলছে না তাঁর। চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে তাঁর পরিবারের। এদিকে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে এসেছেন যাঁরা, তাদের অভিজ্ঞতাও ভয়াবহ।
আরও পড়ুন, মমতার বিরুদ্ধে FIR, 'সময় না দিলে' কী পদক্ষেপ, জানিয়ে দিল পুলিশ
পুণ্যলাভে গেছিলেন কেউ , ইচ্ছে ছিল কৈলাস-মানস সরোবর চাক্ষুষ করা, কারও আবার কর্মক্ষেত্রই ছিল 'হিমালয়ের দেশ' নেপাল।বরাতজোরে কেউ কেউ ফিরছেন। কিন্তু, নেপাল-বিপর্যয়ের পর এখনও খোঁজ নেই বহু মানুষের।সময় যত এগোচ্ছে, ততই উৎকণ্ঠা বাড়ছে তাদের পরিবার-পরিজনের।২০১৯ সাল থেকে কর্মসূত্রে নেপালে রয়েছেন পূর্ব বর্ধমানের শিমডালের বাসিন্দা, সন্দীপকুমার গড়াই। নেপালের রসুইয়ের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে 'স্টোর ম্যানেজার' পদে কর্মরত তিনি।গত বুধবার অর্থাৎ বিপর্যয়ের দিন সকাল ৮টা নাগাদ,পরিবারের সঙ্গে শেষবার ফোনে কথা হয় তাঁর।তারপর আর যোগাযোগ করা যায়নি। নিখোঁজ সন্দীপ গড়াইয়ের শ্যালক রিন্টু সেন বলেন, নেপাল যাচ্ছি জামাইবাবুর খোঁজে, কিন্তু ফিরিয়ে না আনতে পারলে পরিবারটা শেষ হয়ে যাবে। জানিনা কোথায় যাব, কীভাবে কী করব। তাও যেতে হচ্ছে শুধু জামাইবাবুকে খুঁজতে। গত ২১ অগাস্ট কৈলাস দর্শনের জন্য রওনা হয়েছিলেন বীরভূমের আহমদপুরের বাসিন্দা টোটন লাহা।(৩৪)। ৫২ জনের একটি তীর্থযাত্রীদের দলে ছিলেন তিনি। কাঠমাণ্ডু-সহ নেপালের বিভিন্ন এলাকা ঘোরার পর, বুধবার অর্থাৎ বিপর্যয়ের দিন সকালে, কৈলাসের উদ্দেশে রওনা দেয় তাদের দল। কিন্তু, গন্তব্যের পথে আচমকা ধেয়ে আসে বিপদ। নেপালের বিদুরে হড়পা বানের কবলে পড়ে তাঁদের বাস। বরাতজোরে ঘরে ফিরেছেন। তবে, আতঙ্ক যেন এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে।নেপাল ফেরত পর্যটক টোটন লাহা বলেন,চোখের সামনে সেই হড়পা বান দেখতে পাচ্ছিলাম। স্থানীয় মানুষজনের আর্তনাদ শুনে ভয় আরও বেড়ে যায়। কী হবে, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।'টোটন লাহাদের সঙ্গেই মানস সরোবরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। বীরভূমের সিউড়ির বাসিন্দা পেশায় শিক্ষক সন্দীপ দেব।মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন তিনিও।নেপাল ফেরত পর্যটক সন্দীপ দেব বলেন, একটি ব্রিজ পার হওয়ার আগে দু’বার রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে প্রাতরাশ করেন তিনি।তাঁরা কিছুটা দেরি করে ব্রিজের দিকে এগিয়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনার কবল থেকে বেঁচে যান। একই পথে একদিন আগে কলকাতার একটি ভ্রমণ সংস্থা কলকাতার বাসিন্দাদের নিয়ে গিয়ে ছিল। তাদের একজন বাদে আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।'
নেপাল-বিপর্যয় থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন উত্তরপাড়ার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা অঞ্জনা সান্যাল (৬৯)। বুধবার ১৭ জনের একটি দলের সঙ্গে,কাঠমাণ্ডু থেকে চিনের ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন তিনি।ফিরে এসেছেন। কিন্তু সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য যেন কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। নেপাল ফেরত পর্যটক অঞ্জনা সান্যাল বলেন,'আমরা যখন বেরিয়েছিলাম তখন আকাশ একেবারে পরিষ্কার ছিল। হঠাৎ কিছুটা দূরে ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মতো দেখতে পাই। তারপর দেখি নদীর জল মেঘের মতো নেমে আসছে। বুঝতে অসুবিধা হয়নি বড় বিপদ হতে চলেছে। বাসচালক খুব তৎপরতার সঙ্গে বাস ঘুরিয়ে না নিলে আমরা হয়তো জ্যামে আটকে যেতাম। তখন আর ফেরার সুযোগ থাকত না।' সময় পেরোচ্ছে, লাফিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ, আশা-আশঙ্কার দোলাচলে দিন কাটাচ্ছে পরিবারগুলো।
