রাজা চট্টোপাধ্যায়, শুভেন্দু ভট্টাচার্য, শিলিগুড়ি: পুজোর আগে ভারী বৃষ্টিতে বিপর্যয় নেমে এসেছিল দক্ষিণবঙ্গে। পুজোর পর ভারী বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গ। ভারী বৃষ্টিতে সেখানে জায়গায় জায়গায় ধস নেমেছে। রাস্তাঘাট চলে গিয়েছে জলের নীচে। এই পরিস্থিতিতে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গিয়েছে মিরিকে। ধসে চাপা পড়ে মারা গিয়েছে দুই শিশু। আর কেউ চাপা পড়েছে রয়েছেন কি না, দেখা হচ্ছে। হতাহতের আশঙ্কা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। GTA-র তরফে পর্যটন আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। বেড়াতে গিয়ে দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াংয়ে আটকে রয়েছেন অনেকে। জাতীয় সড়কও বন্ধ রাখা হয়েছে আপাতত। কোচবিহার, মাথাভাঙা-সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল জলমগ্ন হয়ে রয়েছে। বাঁধ ভেঙেছে একাধিক জায়গায়। তিস্তা, মহানন্দা রীতিমতো ফুঁসছে। সবমিলিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি উত্তরবঙ্গে। (North Bengal Landslide)

Continues below advertisement

উত্তরবঙ্গে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিলই। ৭ তারিখ পর্যন্ত বৃষ্টি চলবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর। সেই আবহেই বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে গোটা উত্তরবঙ্গে। বহু রাস্তায় ধস নেমেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ। দার্জিলিং-কালিম্পংয়ের রোহিণী রোডে ধস নামায় সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শিলিগুড়ি-কালিম্পংয়ের রাস্তা বন্ধ। দুধিয়া সেতু ভেঙে পড়ায় শিলিগুড়ির সঙ্গে মিরিকের যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন। পর্যটক থেকে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের ভরসা সব রাস্তাই বন্ধ। দার্জিলিং এবং সিকিম যাওয়ার যে মূল রাস্তা, সেই ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের একাধিক জায়গায় ধস নেমেছে। (North Bengal Situation)

প্রশাসনের তরফে বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়েছে। জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী যাচ্ছে ডুয়ার্সের নাগরাকাটায়। ডুয়ার্সের একাধিক এলাকা জলমগ্ন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নাগরাকাটা। সেখানে প্রায় ২০০ পরিবার এই মুহূর্ত জলবন্দি হয়ে রয়েছে। বাড়িতে জল ঢুকেছে, জল ঢুকেছে থানায়। ভুটান থেকেও জল ঢুকেছে সেখানে। জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী পৌঁছচ্ছে। তিস্তার জলস্তর বিপজ্জনক হারে বাড়ছে। প্রশাসন সূত্রে খবর, সকাল ৯টায় গজলডোবা ব্যারেজ থেকে ৫০০০ কিউসেকের বেশি জল ছাড়া হয়েছে তিস্তা ব্যারেজ থেকে। জলস্তর বাড়ছে জলঢাকা নদীর। এলাকাবাসীরা জলবন্দি হয়ে রয়েছেন এই মুহূর্তে। তাঁদের সরানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। 

Continues below advertisement

কোচবিহারের রাসমেলা মাঠ সংলগ্ন এলাকাও জলমগ্ন হয়ে রয়েছে। কোনটি রাস্তা, কোনটি পুকুর, ফারাক বোঝা যাচ্ছে না। জলমগ্ন হয়ে রয়েছে কুমার গজেন্দ্র নারায়ণ ঠাকুরবাড়িও জলমগ্ন। শহরের বেশির ভাগ রাস্তাই জলের নীচে। চরম দুর্ভোগের শিকার সাধারণ মানুষ। তাঁরা জানিয়েছেন, আগে কখনও এমন পরিস্থিতি হয়নি। গতকাল রাত থেকে টানা বৃষ্টি হয়েছে। জল ঢুকে গিয়েছে বাড়ির ভিতরও। জানা যাচ্ছে, গত ২৪ ঘণ্টায় কোচবিহারে ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। তোর্সা নদী, মাথাভাঙার মানসাই নদীর জলস্তর বেড়ে গিয়েছে বিপজ্জনক ভাবে। আরও বৃষ্টি হলে কী হবে, তা নিয়ে আশঙ্কিত সাধারণ মানুষ। জল কখন সরবে বুঝতে পারছেন না কেউ। পুরসভা জানিয়েছে, রেকর্ড বৃষ্টিতেই এত জল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জল নেমে যাবে বলে আশাবাদী তারা। তবে লোকালয় থেকে এখনও জল নামানোর কোনও প্রচেষ্টা চোখে পড়ছে না পুরসভার তরফে। কিন্তু এই মুহূর্তে সমস্যায় পড়েছেন সাধারণ মানুষ। জলপাইগুড়ির বানারহাটও জলমগ্ন এই মুহূর্তে। রাস্তা না নদী, বোঝা মুশকিল। জলমগ্ন ধূপগুড়িও। ৩১ নং জাতীয় সড়ক এখন পুরো নদী। মাথাভাঙা, দিনহাটার অবস্থাও ভয়ঙ্কর।

স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, "গতকাল রাত থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এখনও থামার নাম নেই। জানি না কী দুর্ভোগ আছে কপালে। দক্ষিণবঙ্গের মতো হবে কি না জানি না। আতঙ্কিত আমরা। জল থৈ থৈ চারিদিক। রাস্তাঘাট জনশূন্য। কোনও ক্রমে বাইরে পরিস্থিতি দেখতে বেরিয়েছি। ঘন ঘন বাজ পড়ছে। ভয় তো হবেই। মা চলে গেলেন এই অবস্থায় ফেলে। আশা করব, আমাদের বাঁচাবেন মা। বাজারঘাট, ওষুধপত্র কেনা বন্ধ হয়ে গিয়েছে।" 

ভারতীয় রেল সূত্রে খবর, ডুয়ার্সের মালবাজার থেকে যে ট্রেন চলাচল করে, সেগুলিকে ঘুরপথে চালানো হচ্ছে। কাঞ্চনকন্যা, মহানন্দা এক্সপ্রেস ঘুরপথে আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার যাচ্ছে। এই সময় পাহাড়ে পর্যটকদের ঢল নামে। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনা করে পর্যটকদের একাধিক ট্রেন বাতিল করার ভাবনা চিন্তা চলছে। কারণ বিভিন্ন জায়গায় রেললাইনই জলের তলায় চলে গিয়েছে। আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। প্রশাসনের তরফে সেচ দফতর এবং পুলিশ সতর্ক রয়েছে। স্থানীয়দের নদীর আশেপাশে যেতে বারণ করা হয়েছে। জলমগ্ন এলাকায় বাড়ি থেকে বেরোতে নিষেধ করতে চলছে মাইকিং। কিন্তু নাগরকাটা, কান্তিতে জল বেড়েই চলেছে।