আজ, ৬ জুলাই, জাতীয়তাবাদ ও নিঃস্বার্থ সেবার আদর্শে বিশ্বাসী অগণিত মানুষের কাছে একটি বিশেষ দিন। আজ আমরা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী পালন করছি, যিনি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ভারতমাতার সেবায়। অপরিসীম সাহস এবং অবিচল অঙ্গীকার নিয়ে দেশসেবার চিরকালীন দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন তিনি। আধুনিক ভারতের খুব কম নেতার মধ্যেই মেধা, জনসেবা এবং নৈতিক দৃঢ়তার এমন গভীর ও স্বাভাবিক সমন্বয় দেখা গিয়েছে, যেমনটি দেখা গিয়েছিল ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মধ্যে।
তাঁর জন্ম এমন এক পরিবারে ও পরিবেশে, যেখানে তিনি নিরাপদ ও আরামদায়ক জীবনযাপন করতে পারতেন। তাঁর বাবা স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ ও বিদগ্ধ ব্যক্তি। তরুণ শ্যামাপ্রসাদ বেছে নিতেই পারতেন সুযোগ-সুবিধায় ভরা এক নিশ্চিন্ত জীবন। কিন্তু তাঁর বিবেক তাঁকে ত্যাগ ও দেশসেবার পথে চালিত করেছিল। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, দেশের চরম অস্থিরতার সময়ে নীরব দর্শক হয়ে থাকাটা অন্যায় — তা সে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই হোক, সাম্প্রদায়িকতার মোকাবিলা হোক বা মানুষের সঙ্কটে পাশে দাঁড়ানো—সব ক্ষেত্রেই তিনি সক্রিয় ভূমিকা নিতে চেয়েছিলেন। এই যাত্রাপথে তাঁকে বিভিন্ন সময়ে গভীর ব্যক্তিগত শোকও সহ্য করতে হয়েছিল। তিনি হারিয়েছিলেন তাঁর শিশুসন্তানকে। ছিল স্ত্রী বিয়োগের যন্ত্রণাও। কিন্তু একাধিক শোক তাঁর সংকল্পকে যেন আরও দৃঢ় করেছিল। ভারতমাতার সেবায় তিনি ছিলেন অবিচল।
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবনের একটি আদর্শ নিয়ে যদি কথা বলতে হয়, তাহলে তা হল তাঁর অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন । দেশভাগের উত্তাল সময়ে পশ্চিমবঙ্গ যাতে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে থেকে যায়, তা নিশ্চিত করতে তিনি দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। কয়েক বছর পরে সেই একই বিশ্বাস তাঁকে জম্মু ও কাশ্মীরে নিয়ে যায়। কারাবাসের যন্ত্রণাও তাঁকে দমাতে পারেনি এবং নিঃসঙ্গতা তাঁকে দুর্বল করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত বন্দিদশাতেই আচমকা তাঁর মৃত্যু হয়। তখন তিনি ছিলেন সেই অগণিত মানুষের থেকে বহু দূরে, যাঁদের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একজন ব্যক্তির চূড়ান্ত আত্মত্যাগ রাজনীতির সীমা অতিক্রম করে সারা দেশের মানুষের স্মৃতির অংশ হয়ে যায়। ড. মুখোপাধ্যায়ের শেষ যাত্রা এমনই একটি মুহূর্ত। আচার্য বিনোবা ভাবের কথায়, ড. মুখোপাধ্যায় যে আদর্শে বিশ্বাস করতেন, সেই আদর্শের জন্যই নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর দেহত্যাগের বহু বছর পরে, ২০১৯ সালে ৩৭০ এবং ৩৫(এ) অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার হয়। এটিই ছিল শ্যামাপ্রসাদের আত্মবলিদানের প্রতি সবচেয়ে যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য।
ড.মুখোপাধ্যায় দেশকে ও ভারতীয় মূল্যবোধকে সর্বাগ্রে রেখেছিলেন। সেই লক্ষ্যেই তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন এবং এমন কিছু ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, যা সেই সময়ের প্রচলিত চিন্তাভাবনার থেকে একেবারেই আলাদা ছিল। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হয়েছিলেন। সেই দায়িত্বে থেকে তিনি এমন কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছিলেন, যা ছিল একই সঙ্গে ছিল দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এবং ভবিষ্যৎমুখী। শিক্ষাবিদদের একটি সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে ড. মুখোপাধ্যায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে বলেছিলেন, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে সম্ভাব্য কেরানি এবং কম বেতনের কর্মী তৈরির কারখানা হিসেবে দেখাটা ভুল। তাঁরা যেন প্রশাসন - পুরসভা, রাজ্য বা কেন্দ্রীয় আইনসভায় নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য ও শিল্পক্ষেত্রেও নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে”
তাঁর নেতৃত্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তার মধ্যে ছিল গ্রন্থাগারের পরিকাঠামোর উন্নতি, বিজ্ঞান গবেষণায় উৎসাহদান, প্রত্নবস্তুর সম্পর্কে গবেষণা,কৃষিবিদ্যার পাঠক্রম চালু করা ইত্যাদি। এছাড়াও তিনি খেলাধুলা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ছাত্রকল্যাণের মতো ক্ষেত্রগুলির প্রতি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই ২৪ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দিবস পালন শুরু হয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি গান রচনা করতে অনুরোধ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ।
তাঁর জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের মধ্যেও এই একই মানসিকতার প্রকাশ লক্ষ্যণীয়। তিনি এমন এক সময়ে জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন, যখন কংগ্রেসের দাপট সর্বত্র। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি মনে করেছিলেন, ভারতের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থেকে দেশের অগ্রগতির পক্ষে কথা বলার জন্য একটি বিকল্প কণ্ঠের প্রয়োজন। সেই জন্যই সম্ভবত তিনি দলের প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন - মাটির প্রদীপ। একটি প্রদীপকে ছোট বলে মনে হতে পারে, কিন্তু সে অনেক দূর পর্যন্ত আলো পৌঁছে দিতে পারে, অন্ধকার দূর করতে পারে। জনসংঘ বরাবর সেই আদর্শের পূজারীই ছিল।
ভারতের প্রথম শিল্প ও সরবরাহমন্ত্রী হিসেবে ড.শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কার্যকাল চির উজ্জ্বল। তিনি সামগ্রিক উন্নয়নে বিশ্বাসী ছিলেন। সেই সঙ্গে মানবিক ভাবাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। দেশ তখন সদ্য স্বাধীন। সে-সময় তিনি শিল্পের মাধ্যমে দেশের মর্যাদা, সুযোগ এবং আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিলেন। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন, সিন্দ্রি সার কারখানা সেই ভাবনারই প্রকাশ। তাঁর একদিকে আধুনিক শিল্প গড়েছিলেন, তবে বড় শিল্পের দিকে নজর দিতে গিয়ে ভারতের চিরাচরিত শিল্পগুলিকে তিনি অবহেলা করেননি। তাঁতশিল্প, কুটিরশিল্প, কারিগর এবং বস্ত্রশ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষাতেও তিনি সমানভাবে সক্রিয় ছিলেন।
এখানে আমি আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে চাই। আত্মনির্ভর ভারত গড়ার স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়েই ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সিন্দ্রি কারখানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশক যাঁরা দেশ পরিচালনা করেছেন, তাঁদের আমলে এই কারখানা অবহেলিত ছিল। আমাদের সরকার সিন্দ্রি কারখানার পুনরুজ্জীবনে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। এতে আমি নিজেকে সম্মানিত মনে করি। সেই কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকতে পারা আমার জীবনের অন্যতম বিশেষ মুহূর্ত ছিল।
ভারতের সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে বরাবরই আলোচনা এবং মত বিনিময়ের গুরুত্ব রয়েছে। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও এই গণতান্ত্রিক মানসিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন। স্বাধীনতার পর দেশ গড়ার কাজকে তিনি রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে রেখেছিলেন। সেই বিশ্বাস থেকেই পণ্ডিত নেহরুর মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। আন্তরিকতা ও গঠনমূলক মনোভাব নিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু পরে যখন তাঁর মনে হয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে অন্য পথে চলা প্রয়োজন, তখন তিনি সম্মানের সঙ্গে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর দেশের স্বার্থে যে রাজনৈতিক কাজ করা প্রয়োজন বলে তিনি বিশ্বাস করতেন, তাতেই নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করেন।
৭৫ বছর আগে পণ্ডিত নেহরু প্রথম সংবিধান সংশোধনী এনেছিলেন। সেই সংশোধনী ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর সরাসরি আঘাত। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। কংগ্রেস ভবিষ্যতে কী ধরনের পদক্ষেপ করতে পারে, সে সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট ধারণা ছিল। সেটাই প্রমাণিত হয় কংগ্রেসের পরবর্তী পদক্ষেপগুলিতে। ড. মুখোপাধ্যায়ের আশঙ্কাই সত্য প্রমাণ হয়। যাঁরা আজ থেকে ৭৫ বছর আগে প্রথম সংবিধান সংশোধনী এনেছিলেন, তাঁরাই ১৯৭৫ সালে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। এর পর, ৫০ বছর আগে আনা হয় ৪২তম সংবিধান সংশোধনী আইন। এই সংশোধনীও উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মূল ভিত্তিতে সরাসরি আঘাত।
১৯৪৩ সালে বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সেবায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেছিলেন। মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করতে তিনি একাধিক খাদ্যশালা ও ত্রাণকেন্দ্র খোলার ব্যবস্থা করেছিলেন। একদিকে দেশের মানুষের দুর্দশা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল, অন্যদিকে ঔপনিবেশিক শাসকদের অসংবেদনশীল আচরণে তাঁর বিতৃষ্ণা তীব্র হয়েছিল। সে-সময় তিনি ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামে একটি বইও লিখেছিলেন, যেখানে তিনি তাঁর ক্ষোভ ও যন্ত্রণা প্রকাশ করেছিলেন। ১৯৪২ সালে মেদিনীপুরে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পর স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে তাঁর প্রচেষ্টা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।
কলকাতার একটি কলেজে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ড. মুখোপাধ্যায় তরুণদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “আপনারা যে কাজই হাতে নিন না কেন, তা গুরুত্ব সহকারে, ভাল করে করুন; কখনও কোনও কাজ অর্ধসমাপ্ত বা অসম্পূর্ণ অবস্থায় ফেলে রাখবেন না, যতক্ষণ না আপনি আপনার সেরাটুকু দিচ্ছেন, ততক্ষণ সন্তুষ্ট হবেন না।”
ভারত এখন ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে। এই সময়ে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে শ্রদ্ধা জানানোর সবচেয়ে ভাল উপায় হল, প্রতিদিন তাঁর স্বপ্নের ভারত গড়ে তোলার চেষ্টা করা। তিনি এমন এক ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা হবে শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ, আত্মবিশ্বাসী এবং সহানুভূতিশীল। আজকের যুবসমাজই সেই দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং তাঁর স্বপ্নের ভারত গড়ে তুলবে।
