কলকাতা: লিফটম্যান কোথায় ছিলেন? বেসমেন্টে লিফটের বাইরে গেটের চাবি কার কাছে ছিল? এক ঘন্টাতেও কেন তাঁকে খুঁজে পাওয়া গেল না? আর জি কর-কাণ্ডে এরকম অনেক প্রশ্নই উঠছে। গাফিলতি ছিল, মেনে নিচ্ছে কর্তৃপক্ষও।
মৃতের বাবা অমল বন্দ্য়োপাধ্য়ায় হাসপাতাল চত্বরে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, 'ওরা বলছে PWD-র কাছে চাবি। দাঁড়ান তো আপনি। আমাকে ধমকাচ্ছে এরা। নিরাপত্তারক্ষী, কর্মী... সবাই।' এক রোগীর আত্মীয় ক্ষুদ্ধ হয়ে বলছেন, 'লিফটের মধ্যে কোনও লোকই থাকে না। বললে গ্রাহ্যও করে না। সব কানে হেডফোন।'... এই কথা, এই ক্ষোভ কি অস্বীকার করা যায়? এর থেকে সত্যি কি আর কিছু হয়? একটা প্রাণ ঝরে গেল অকালে.. এই সত্যিকে অস্বীকার করবে কে?
মানুষ হাসপাতালে যায় জীবন বাঁচাতে। কিন্তু, সেখানেই যে মৃত্য়ু ওঁত পেতে রয়েছে, তা কে জানত! জানতেন না দমদমের অরূপ বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ও। লিফটে আটকে তাঁর মর্মান্তিক মৃত্য়ু একগুচ্ছ প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিকাঠামোকে। এই হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারে মোট ৩ টে লিফট। কেউ কেউ বলছেন, যে ২ নম্বর লিফটে আটকে গিয়ে অরূপ বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ের মৃত্যু হয়েছে, তাতে আগে থেকেই সমস্যা ছিল।
আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের এক রোগীর আত্মীয় গতকাল অর্থাৎ বৃহস্পতিবার উঠেছিলেন ওই অভিশপ্ত ২ নম্বর লিফটেই। সমস্যা যে রয়েছেন বুঝেছিলেন তিনিও। এবিপি আনন্দকে তিনি বললেন, 'দরজা লাগছিল না ভাল করে। দরজা ধীরে ধীরে খুলছিল। এই সমস্য়া ছিল। স্লো ছিল লিফটটা। দরজা ধীরে খুলত। ধীরে আটকাতো। এই সমস্য়া ছিল।' অভিযোগ, লিফটে থাকেন না কোনও অপারেটর। আরেক রোগীর আত্মীয় বলছেন, 'একদম বাজে। চারতলা নিয়ে যাচ্ছি, লিফটে তো কেউ থাকার দরকার। কেউ নেই। এখানে অনেকবার ডাকাডাকি হয়েছে। শুধু লিফট নয়, সব পরিষেবাই খারাপ।'
এখানেই প্রশ্ন উঠছে, লিফটে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও সেটি খুলে রাখা হয়েছিল কেন? লিফটে যে আগে থেকেই সমস্যা ছিল, সেটা কি কর্তৃপক্ষের কেউ জানত না? যে লিফটে অসুস্থ, বয়স্করা ওঠানামা করেন, সেখানে লিফটম্যান ছিলেন না কেন? লিফটে কি প্যানিক বাটন ছিল না? অরূপ বন্দ্য়োপাধ্য়ায়দের নিয়ে, লিফট যখন ঘণ্টাখানেক বেসমেন্টে আটকে, হাসপাতালের কর্মী, পুলিশ কেউ বেসমেন্টে নেমে উদ্ধারের চেষ্টা করেননি। বেসমেন্টে নামার সিঁড়ির গেটেও ভোরবেলা তালা লাগানো ছিল।
মৃতের পরিবারের দাবি, লিফট যখন দীর্ঘক্ষণ বেসমেন্টে আটকে থাকে, তখন হাজার কাকুতি-মিনতি করেও কারও সাহায্য পাওয়া যায়নি। খুঁজে পাওয়া যায়নি লিফটের বাইরে লোহার গেটের চাবি। মৃতের বাবা অমল বন্দ্য়োপাধ্য়ায় বলছেন, 'পুলিশকে বললাম দমকলে ফোন করুন। ওরা এসে ভেঙে দিতে পারে। আগে ডাকলে এই হত! ওরা কিচ্ছু করল না। পরে ২ ঘণ্টা বাদে, একটা হাতুড়ি নিয়ে এসে আমার ছেলে, আমার নাতিটাকে এরকম করে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। ভিতরে আমাদের ঢুকতে দেয়নি তো। গিয়ে দেখুন তালা-চাবি দেওয়া। এটা যদি ভেঙে দিত, তাহলে কোনও অসুবিধা হত না। কিচ্ছু তো বলেনি, ওখানকার কী সমস্য়া। ওরা নিজেরা ভাল জানে, ওরা খুলতে পারে। কিচ্ছু করল না।'
এখানেও প্রশ্ন উঠছে, লিফটে আটকে থাকা ব্য়ক্তিদের সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার করা গেল না কেন? লিফট আটকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই তালা খোলার ব্য়বস্থা করা হল না কেন? তখনই তালা ভেঙে কেউ বেসমেন্টে নামলেন না কেন? কেন দ্রুত দমকল ডাকা হল না? এরকম অসংখ্য প্রশ্ন যখন উঠছে, তখন গাফিলতির কথা মেনে নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আর জি কর মেডিক্য়াল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিক্যাল সুপার সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্য়ায় বলছেন, 'রক্ষণাবেক্ষণ এখানে হত, PWD ইলেকট্রিকাল থেকে এটার রক্ষণাবেক্ষণ হয়। বিশদে রক্ষণাবেক্ষণ। তার রিপোর্ট প্রতিমাসে আপডেট হয়। আমাদের তদন্ত করে জানাবেন যে, কী প্রযুক্তিগত ত্রুটি ছিল।'
ছেলেকে সুস্থ করে তুলতে হাসপাতালে এসেছিলেন। ছেলে নিশ্চয়ই একদিন সুস্থ হবে। কিন্তু, বাবাকে সে আর দেখতে পাবে না। এই অপূরণীয় ক্ষতির দায় কি আর জি কর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে?
