কলকাতা : এবিপি আনন্দর মুখোমুখি রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। এবিপি আনন্দর এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট সুমন দে'র সঙ্গে তাঁর কথোপকথনে উঠে এল রাজ্য রাজনীতির বিভিন্ন প্রসঙ্গ। জানালেন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নানা অজানা কথা। বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্কের কথাও আলোচনায় উঠে এল।
সুমন দে : পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তোমার সুসম্পর্ক তুমি কোনও দিন গোপন করনি। মাঝে একটা সময় বিধানসভায় শোনা যেত, শমীক ভট্টাচার্য...পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে এত ভাল সম্পর্ক যে তৃণমূল জয়েন করে যাবে। অধীরদা-র সঙ্গেও তোমার ভাল সম্পর্ক। বিরোধী সমস্ত দলের কাটিং অ্যাক্রস পার্টি লাইন তুমি এই সম্পর্ক এত বছর বজায় রাখলে কী করে, আর বজায় রেখে তোমার দলের শীর্ষে পৌঁছালে কী করে ? এই শিক্ষাটাও নবীন প্রজন্মকে দেওয়া উচিত। যে, ঝগড়া-গালাগালির থেকেও বিকল্প একটা রাস্তা আছে।
শমীক ভট্টাচার্য : আমি যবে থেকে রাজনীতি করেছি, তখন প্রচুর সেমিনার হত। সেটা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। তুমি দেখবে, '৮০-র দশকের একটু শেষের দিক থেকে উঠে এসেছিল...সেটা হচ্ছে বিভিন্ন খোলা জায়গায় বিতর্ক, বিভিন্ন ক্লাব। আজ যেটা তোমরা টক শো করছ। সেই টক শো-র আদলেও কিন্তু বহু দিন ধরে চলেছিল। অনেক বিতর্ক। '৮০-র দশকের প্রথম। তখন আমি সেখানে যেতাম। বিভিন্ন নেতার সঙ্গে পরিচয় হত। ছোট বয়স থেকে যেতাম। যেমন- রবীন দেবের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা সর্বজনবিদিত। সুজন চক্রবর্তী...আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এখনও পর্যন্ত কোনও পুরনো রাজনৈতিক ইতিহাস জানতে গেলে... আমাদেরও কিছু ইতিহাস জানতে গেলে আমি রবীনদা-কে ফোন করি। রবীনদা হচ্ছেন এনসাইক্লোপিডিয়া। আমার জীবনে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সাংবাদিক দেবাশিস ভট্টাচার্যের চলে যাওয়া। দেবাশিসদা নিজেই একজন মিস্টার গুগল। একদম সাল-তারিখ সমেত বলে দেবেন। সেটা অশোক দেবও একসময় পারতেন। অশোক দেবের সঙ্গে আমার অতটা ঘনিষ্ঠতা নেই। তবে, রবীনদা-র সঙ্গে আছে। রবীনদা-র কাছে কোনও বই চাইলে, রবীনদা সেই বই দিয়ে দেন। রবীন দা-র সঙ্গে সেই ঘনিষ্টতা আছে। তৃণমূল কংগ্রেসের বহু নেতার সঙ্গে আমার ভাল সম্পর্ক আছে। যেমন- প্রয়োজনে ট্রান্সফারের ব্যাপারে ফোন করি। আমায় একজন বলছেন, তুমি কেন ফোন করেছ ? মদন মিত্রর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ৩০ বছরের বেশি। বিজেপির একজন পঞ্চায়েত সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়েছেন নদিয়ায়। নদিয়া হাসপাতালে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যখন নিয়ে গেছে, তখন বলেছে আমাদের কিছু করার নেই। একে পিজি-তে স্থানান্তরিত করুন। পিজি-তে এসে কী করে...তারপরে এত পুলিশের ঝামেলা, গুলি করেছে সিপিএম, কী করা যাবে ! তখন সবার কাছে মোবাইলও নেই। সেল ফোন নেই। মদনদা-র কাছে ছিল। ফোন করেছি। বলছি, তুমি কোথায় ? আমাকে জিজ্ঞাসা করছে, তুমি কোথায় ? বললাম, আমি কোথায় তুমি ছেড়ে দাও। বিশাল একটা দরকার। ভর্তি করে দিতেই হবে। তখন বলল, আমি তোমার জন্য থাকব, তুমি আসবে ? তোমায় আসতে হবে রোগীকে নিয়ে। শুধু ঘরে বসে নেতাগিরি করলে হয় না। আমি বললাম, আমার তো গাড়ি নেই। আমি সল্টলেকে থাকি। সল্টলেক থেকে পিজি যাওয়া তো দুঃসাধ্য ব্যাপার। ওদের বললাম পৌঁছাতে। আমি বললাম, কতক্ষণ লাগবে ? বলল, তাও দেড়টা-২টো বেজে যাবে। আমি বললাম, ঠিক আছে। আমি দেখব। অত রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, কিছুই পাচ্ছি না। তারপর একজন দেখলাম, মোটর সাইকেল নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর মোটর সাইকেলে উঠলাম। এরপর পিএনবি মোড়ে গিয়ে ট্যাক্সিতে উঠলাম। ট্যাক্সিতে এসএসকেএমে পৌঁছালাম। আমার এখনও মনে আছে, ১টা ৪৫-এ নিয়ে আসা হল তাঁকে। মদনদা দাঁড়িয়ে আছেন এবং মদনদা-র জন্য তিনি প্রাণে বাঁচলেন। এটাকে আমি অস্বীকার করব কী করে ? আমি জীবনে এক হাজারের বেশি রোগী মদনদা-কে দিয়ে ভর্তি করিয়েছি। তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে। সে কী বলল, সে কী করল আমার কিছু নয়। যেমন- শিশির অধিকারী আমাকে স্নেহ করেন। শুভেন্দুর সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেক পরে। দিব্যেন্দু অধিকারীর সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। এটার সঙ্গে কোনও...রাজনীতি যে যার মতে চলবে। কিন্তু, আজ যেটা হচ্ছে সেটা কদর্য আক্রমণ। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বেরও একটা দায়িত্ব আছে, দায়বদ্ধতা আছে, কতর্ব্য আছে। যে তাঁর রাজনৈতিক বোধটাকে একটা পরিশিলীত গণ্ডির মধ্যে রেখে দেওয়া। সেটা থেকে যেন শিক্ষা দিতে পারেন। যদি তিনি সেই উচ্চতা পান তাঁকে মানুষ অনুকরণ করবে। এটাই তো স্বাভাবিক। আজ একজন বক্তা তৈরি করতে পারো, বাগ্মী তৈরি করতে পারবে না। জ্যোতি বসু তো সেভাবে কোনও দিন বক্তৃতা করেননি। কথা বলার মতো বলতেন। জ্যোতি বসুর কথা কী মানুষ শুনত না ? জ্যোতি বসু কারো নাম নিতেন না। রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী...জ্যোতি বসু বক্তৃতা করছেন। বলছেন, ওই ছেলেটা...ওই যে আগে প্লেন চালাচ্ছিলেন। এখন দেশ চালাচ্ছেন। ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে। নাকি বলছে, দেশের শ্রম-নীতি পাল্টে দেবেন। তাহলে আমরা লাল পতাকা নিয়ে যারা আছি, তাঁরা কী করব? ওঁর এটা একটা স্টাইল ছিল। সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের পার্লামেন্টে বক্তৃতা শুনেছি। সুষমা স্বরাজের শুনেছি। এবার কী হচ্ছে, সস্তার জনপ্রিয়তার জন্য বলে কেটে দেব, মেরে দেব। যেমন- দিলীপ ঘোষ, শুভেন্দু অধিকারীর ক্ষেত্রে বলেছিলাম। যে, আপনারা এরা দু'-একটা কথা বলছেন সেটা নিয়ে সমালোচনা করছেন। এই মানুষগুলোর কাছে কত মা এসে কাঁদছেন। ছেলে মারা গেছে, পুলিশ ডায়েরিটা নিচ্ছে না, এফএইআর নিচ্ছে না। সে-ও রক্তমাংসের মানুষ। তাঁর যন্ত্রণাটা বুঝুন।
