আর আটচল্লিশ ঘণ্টাও বাকি নেই। ব্রিগেডে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের শপথগ্রহণের দিকে যখন গোটা দেশের মানুষ তাকিয়ে, তখন সেই মুহূর্তে আর একটা ঘটনা, একটা ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড, বিস্ফোরণের মতো কাঁপিয়ে দিয়েছে রাজ্য-রাজনীতিকে। শুভেন্দু অধিকারীর সহকারী চন্দ্রনাথ রথের হত্যাকাণ্ড ঘিরে উঠে আসছে একটার পর একটা প্রশ্ন । তদন্তে উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। 

Continues below advertisement

ঝাঁঝরা দেহ, হৃদপিণ্ড ভেদ করে বেরিয়ে যায় গুলি

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, আততায়ীদের গুলিতে কার্যত ঝাঁঝরা হয়ে যায় চন্দ্রনাথ রথের শরীর। একাধিক গুলি তাঁর বুকে লাগে। তদন্তকারীদের দাবি, গুলির আঘাতে হৃদপিণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েকটি বুলেট শরীর ভেদ করে বেরিয়েও যায়। ঘটনার ভয়াবহতা নিয়ে বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য প্রশ্ন তুলেছেন, একজন প্রাক্তন সেনাকর্মী এবং আপাতভাবে অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে কেন এভাবে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে খুন করা হল। তাঁর বক্তব্য, এই হামলার নেপথ্যে সুপরিকল্পিত উদ্দেশ্য ছিল।

Continues below advertisement

'শুভেন্দুদা বলেছিল ......'

চন্দ্রনাথ রথের মৃত্যুর পর পূর্ব মেদিনীপুরের কুলুপ গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। গ্রামের মানুষ এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না যে এত কাছের একজন মানুষ এভাবে খুন হতে পারেন। জীবন যে কত অনিশ্চিত তা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেল চন্দ্রনাথের মর্মান্তিক পরিণতি। এক প্রতিবেশীর কথায়, 'শুভেন্দুদা বলেছিল, আমার ছোট ছেলে। এর কিছু হলে আমি কি আর থাকব? ওর গায়ে কেউ হাত দিতে পারবে না।' 

শুভেন্দুর আপ্তসহায়ক  ছিলেন চন্দ্রনাথ

চন্দ্রনাথ রথ শুধু আপ্তসহায়কই ছিলেন না, তিনি দীর্ঘদিন ধরে শুভেন্দু অধিকারীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বৃত্তে কাজ করতেন। বিজেপির বিপুল জয়ের মাত্র দু’দিনের মধ্যেই তাঁর এই মৃত্যু রাজনৈতিক মহলেও তীব্র আলোড়ন ফেলেছে। মধ্যমগ্রামের যে আবাসনে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে থাকতেন চন্দ্রনাথ, সেখানে এখন শোকের আবহ। স্থানীয়দের অনেকেই জানতেন না যে তিনি শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসাবে কাজ করতেন। প্রতিবেশীদের কথায়, অত্যন্ত শান্ত এবং মিশুকে মানুষ ছিলেন চন্দ্রনাথ। স্থানীয় বাসিন্দা অমিত সাউ জানিয়েছেন, প্রায় আড়াই বছর ধরে ওই আবাসনে থাকতেন চন্দ্রনাথ। এলাকার হাতে গোনা কয়েকজনই জানতেন যে তিনি বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার দফতরে কাজ করেন এবং শুভেন্দুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী।

কান্নায় ভেঙে পড়েছেন আত্মীয়রা

চন্দ্রনাথ রথের মৃত্যুর খবর পৌঁছতেই পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুর থেকে তাঁর আত্মীয়রা ছুটে আসেন। পরিবারের সদস্যদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। এক আত্মীয় কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “মাথার ছাতা চলে গেছে। দু’টো হাত চলে গেছে। দাদা-ই ছিল ওখানের সব ভরসা।” বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়দের অনেকেই এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না যে চন্দ্রনাথ আর নেই। হঠাৎ এমন মর্মান্তিক মৃত্যু গোটা পরিবারকে কার্যত ভেঙে দিয়েছে।

চণ্ডীপুরের গ্রাম থেকে ভারতীয় বায়ুসেনা

পূর্ব মেদিনীপুর জেলার চণ্ডীপুরের কুলুপ গ্রামে জন্ম চন্দ্রনাথ রথের। পড়াশোনায় মেধাবী চন্দ্রনাথ রহড়ার বিবেকানন্দ সেন্টেনারি কলেজ-এ অঙ্কে অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম বর্ষ পার করার পরই তিনি যোগ দেন ভারতীয় বায়ুসেনায়। প্রায় ১৫ বছর বায়ুসেনায় কর্মরত ছিলেন তিনি। ২০১৮ সালে স্বেচ্ছাবসর নেওয়ার পর কর্পোরেট সংস্থায় কাজ শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে প্রবেশ করেন। ২০২১ সালে তাঁকে নিজের আপ্তসহায়ক হিসাবে নিয়োগ করেন শুভেন্দু অধিকারী। পাশাপাশি বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসাবেও কাজ করতেন তিনি।

“নিন্দা করার ভাষা নেই”, বলছেন শুভেন্দু

চন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর কথায়, “যেভাবে ৫টি বুলেট তাঁর শরীরে বিদ্ধ করা হয়েছে এবং মৃত্যু সুনিশ্চিত করা হয়েছে, তার নিন্দা এবং দুঃখ প্রকাশ করার ভাষা আমার অভিধানে নেই।” শুভেন্দুর ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, চন্দ্রনাথ শুধু রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন না, পরিবারের সদস্যের মতোই ছিলেন তাঁর কাছে।

মায়ের হাতের রান্না খেয়েই শেষ যাত্রা

চণ্ডীপুরের বাড়িতে এখন শুধুই কান্না আর শোক। পরিবারের তরফে জানা গিয়েছে, ঘটনার আগের দিনই চন্দ্রনাথের মা তাঁর জন্য রান্না করেছিলেন। সেই খাবার খেয়েই তিনি বেরিয়েছিলেন। তারপরই আসে মৃত্যুর খবর।  স্থানীয় বিজেপি নেতা সূর্যকান্ত বাগ বলেন, চন্দ্রনাথ সবসময় শুভেন্দু অধিকারীর ছায়াসঙ্গীর মতো থাকতেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে ব্যক্তিগত কাজ—সব ক্ষেত্রেই শুভেন্দুর পাশে দেখা যেত তাঁকে। 

আরও পড়ুন, 'আমার পাশ দিয়েই ওই খুনি ক্রস করেছিল, তারপর...' শিউরে ওঠা ঘটনা জানালেন প্রত্যক্ষদর্শী