সন্দীপ সরকার, কলকাতা:  দু'পয়সা বেশি রোজগারের আশায় বিহারের মুঙ্গের থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। লক্ষ্য ছিল পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো। কিন্তু বুধবার দুপুর ১২টার সেই ভয়াবহ গুদাম ধসের পর মুহূর্তেই বদলে যায় সবকিছু। এখন একই পরিবারের ছ'জনের মধ্যে তিনজন ফিরছেন বাড়ি, আর বাকি তিনজন ফিরছেন নিথর দেহ হয়ে । তারাতলার গুদাম ধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ যত এগোচ্ছে, ততই লম্বা হচ্ছে মৃত্যুমিছিল।  স্বজন হারানোর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতাল ও মর্গ চত্বর। অন্যদিকে, যাঁরা কোনওমতে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন, তাঁরা হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে ফিরছেন বাড়ির পথে। তবে শরীরের ক্ষতের থেকেও গভীর হয়ে রয়ে গিয়েছে সেই দিনের বিভীষিকার স্মৃতি।

Continues below advertisement

একই পরিবারের ৬ জনের মধ্যে মৃত্যু ৩ জনের

বিহারের মুঙ্গের জেলা থেকে একই পরিবারের ছয় সদস্য তারাতলায় গুদাম নির্মাণের কাজে এসেছিলেন। বুধবারের দুর্ঘটনায় প্রথমে মৃত্যু হয় ১৭ বছরের ঘি কুমার এবং ১৯ বছরের মন্নু কুমারের। শনিবার সেই তালিকায় যোগ হয় পরিবারের আরও এক সদস্য শিরচন কুমারের নাম। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া দেহটিকে চেনার উপায় ছিল না। তবে পকেটে থাকা মোবাইল ফোনটিই চিনিয়ে দিল তাঁকে। সম্প্রতি পারিবারিক কোনও অনুষ্ঠানে উপহার পেয়েছিলেন তিনি। সেটি দেখেই শনাক্ত করেন পরিবারের সদস্যরা। একই পরিবারের ছয় জনের মধ্যে তিনজনেরই মৃত্যু হল এই দুর্ঘটনায়।

Continues below advertisement

ধ্বংসস্তূপের নীচ থেকে ফোন করেছিলেন মানিকচাঁদ

মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ফিরে আসা শ্রমিকদের মধ্যে অন্যতম মানিকচাঁদ কুমার। তিনিও মুঙ্গেরের ওই পরিবারেরই মানুষ।  ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়েও তিনি হার মানেননি। কোনওভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। ভিডিও তুলে পাঠিয়েওছিলেন। শনিবার সামনে এসেছে ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা অবস্থায় তাঁর সেই হৃদয়বিদারক ছবি। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর মানিকচাঁদ জানান, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একটি ছোট ফাঁক দেখতে পান। সেখান দিয়েই প্রথমে মাথা, পরে হাত বের করেন। বাইরে থাকা উদ্ধারকারীদের উদ্দেশে সাহায্যের আবেদন করেন। উদ্ধারকারীরা তাঁকে বাইরে বের করে আনেন।

কিন্তু নিজে উদ্ধার হওয়ার পরও তাঁর প্রথম অনুরোধ ছিল নিজের জন্য নয়। তিনি উদ্ধারকারীদের বলেন, "আমার তিন ভাই এখনও ভিতরে চাপা পড়ে আছে, ওদেরও বের করুন।"

হাসপাতাল থেকে ছাড়া আহতরা

শুক্রবার হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান আহত শ্রমিক সাহিদ কুমার। শনিবার হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান মানিকচাঁদ কুমার এবং ঘি কুমারের বাবা রাজেন্দ্র কুমার।  তবে তাঁদের বাড়ি ফেরা আনন্দের নয়। কারণ, যে ছয়জন একসঙ্গে বাড়ি ছেড়ে রোজগারের আশায় কলকাতায় এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে মাত্র তিনজন ফিরছেন জীবিত। বাকি তিন জন ফিরছেন কফিনবন্দি হয়ে। একটি দুর্ঘটনা শুধু তিনটি প্রাণই কেড়ে নেয়নি, মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে দিয়েছে একটি গোটা পরিবারের ভবিষ্যতের স্বপ্ন। 

আরও পড়ুন : শিমলায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা! গাড়ি সটান গভীর খাদে, মৃত্যু সকলের