কলকাতা: নয় নয় করে ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরলেন। সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগঘন হয়ে পড়লেন সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন। শনিবার রবীন্দ্রসদনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করতে গিয়ে খানিকটা আক্ষেপের সুরেই বললেন, "কলকাতায় ফিরে এসেছি আমি। এই বাক্যটি উচ্চারণ করতে ১৯ বছর লেগেছে।" বাম আমলে কলকাতা ছাড়া হতে হয়েছিল তসলিমাকে। সেই নিয়েও মন্তব্য করেছেন তসলিমা। সমানাধিকারের প্রশ্নে বিঁধেছেন বামেদেরও। (Taslima Nasrin)

Continues below advertisement

শনিবার রবীন্দ্র সদনে তসলিমাকে সম্বর্ধনা দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে বক্তৃতা করতে উঠে তসলিমা বলেন, "আমরা যাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করছি, আমরা চাই মুসলিম সমাজও অন্ধ আনুগত্যের শৃঙ্খল ভেঙে যুক্তি, সমতা, মানবাধিকার এবং আধুনিকতার পথে এগিয়ে যাক। আমরা সমালোচনা করি ধ্বংস করার জন্য নয়, পরিবর্তনের জন্য। যে বিধান নারীকে পুরুষের যৌনদাসী হিসেবে গণ্য করে, অমুসলিমকে ঘৃণা করে, ইসলামের সমালোচককে হত্যা করে, সেই বিধানকে প্রশ্ন করতেই হবে। আরও বেদনাদায়ক হল, মুসলিম সমাজকে অন্ধকারে রাখতে শুধু উগ্রপন্থীরাই সক্রিয় নন, তথাকথিত প্রগতিশীল এবং বামপন্থীদের একটি অংশ এই অচলাবস্থাকে রক্ষা করে। নিজেরা বাক স্বাধীনতা এবং নারী-পুরুষের সমানাধিকার ভোগ করেও, ইসলামের সমালোচক এবং সংস্কারকদের মুসলিম বিদ্বেষী আখ্যা দেন। আমি অহরহ তাঁদের আক্রমণের শিকার হই। তাঁদের অভিযোগ, আমি কেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টাম মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে একই ভাবে যুদ্ধ করছি না? তাঁরা কি একই যুক্তিতে রাজা রামমোহন রায়কে বাতিল করেন এই বলে যে তিনি সতীদাহের বিরুদ্ধে লড়েছেন কিন্তু পৃথিবীর সব ধর্মের, সব কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একই সঙ্গে লড়েননি? ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে কি কেউ দোষ দিয়েছিলেন যে তিনি হিন্দু বিধবাদের অধিকারের জন্য লড়লেন, অন্য ধর্মের সংস্কার করতে গেলেন না কেন? সমাজ সংস্কারকরা সমাজের সবচেয়ে পরিচিত অন্যায় থেকে লড়াই শুরু করেন। আমার ক্ষেত্রে সেই নিয়মের ব্যতিক্রম হবে কেন?" (Kolkata News)

আরও পড়ুন: ‘কৃতজ্ঞতা আনুগত্যের চুক্তি নয়’, শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন তসলিমা নাসরিন

Continues below advertisement

তসলিমা আরও বলেন, "ইসলামি জিহাদি-জঙ্গিরা সমালোচকের মুখ বন্ধ করতে হুমকি ও হত্যা ব্যবহার করে। মৌলবাদের কাছে নত রাষ্ট্র ব্যবহার করে আইন, কারাগার এবং নির্বাসন। আর তথাকথিত প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ, বামপন্থীরা ব্যবহার করেন অপবাদ, উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ এবং সামাজিক বর্জন। পদ্ধতি আলাদা কিন্তু ফল একই। ইসলামের সমালোচনা বন্ধ হয়, মুসলিম নারীর বঞ্চনা অক্ষত থাকে, মুসলিম সমাজের বিবর্তন থেমে থাকে। যাঁরা নিজেদের জন্য আধুনিকতা চান, কিন্তু মুসলিম সমাজের জন্য চান মধ্য়যুগীয় বিধান, তাঁরা মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শত্রু। যাঁরা নিজেদের মেয়ের স্বাধীনতাকে অধিকার বলেন, কিন্তু মুসলিম মেয়ের পরাধীনতাকে সংস্কৃতি বলেন, তাঁরা মোটেও প্রগতিশীল নন। মুসলিম বিশ্বের বহু সমাজে এখনও সপ্তম শতাব্দীর সামাজিক বাস্তবতায় তৈরি নারীবিরোধী, বৈষম্যমূলক বিধানকে চিরন্তন আইন হিসেবে মানা হয়। ক্যালেন্ডার এগোলেই সমাজ আধুনিক হয় না। হাতে আধুনিক প্রযুক্তি এলেই, শহরে উঁচু ভবন উঠলেই সমাজ আধুনিক হয় না। আধুনিক হতে হলে আইন, শিক্ষা, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রচিন্তাকেও আধুনিক হতে হয়। কোনও প্রাচীন বিধানকে আজকের মানবাধিকার, স্বাধীনতা এবং সমতার মানদণ্ডে অন্যায় মনে হলে তা বদলাতে হবে। আমি মানুষের ধর্ম মানার, ধর্ম গ্রহণ করার, ধর্ম প্রচারের অধিকার মানি। একই সঙ্গে ধর্ম ত্যাগ করার, ধর্ম না মানার এবং ধর্মের সমালোচনার অধিকারও মানি। বিশ্বাসের স্বাধীনতা বিশ্বাসকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে তোলে না। বিশ্বাসের স্বাধীনতা থাকলে অবিশ্বাসের স্বাধীনতাও থাকতে হবে। সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষতা শুধুমাত্র সব ধর্মের উৎসবে যোগ দেওয়া নয়, ধর্মনিরপেক্ষতা হল, রাষ্ট্র, আইন, রাজনীতি এবং শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ধর্মীয় কর্তৃত্বকে পৃথক রাখা। রাষ্ট্রের কাজ কোনও ধর্মকে রক্ষা করা নয়, বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসী সব নাগরিকের সমানাধিকার রক্ষা করা। রাষ্ট্রের কোনও ধর্ম থাকবে না। রাষ্ট্রের থাকবে ন্য়ায়। আইনের কোনও ধর্ম থাকবে না, আইনের থাকবে সমতা।"

আরও পড়ুন: ‘যাঁরা মানুষকে পিঁপড়ের সঙ্গে তুলনা করেন…’ মুখ খুললেন সুপ্রিম কোর্টেরই বিচারপতি, বললেন, ‘এমন সব লোকজন…’

মেয়েদের সমানাধিকারের প্রশ্নে তসলিমা বলেন, "এক জন নারীর অধিকার তাঁর জন্ম বা ধর্মীয় পরিচয়ের উপর নির্ভর করতে পারে না। জীবন তাঁর নিজের, শরীর তাঁর নিজের, সিদ্ধান্তও তাঁর নিজের। কোনও ধর্মীয় আইন নারীকে পুরুষের সমান অধিকার না দিলে, সেই আইন বাতিল করতে হবে। ধর্মের মর্যাদার চেয়ে মানুষের মর্যাদা বড়। একই দেশে নাগরিকের অধিকার ধর্মভেদে আলাদা হতে পারে না। ভারত ও বাংলাদেশ, দুই দেশেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি দরকার। তবে তা সংখ্যাগুরু ধর্মের বিধান নয়,  সংবিধান, মানবাধিকার এবং নারী-পুরুষের পূর্ণ সমতার ভিত্তিতে রচিত হবে নাগরিক আইন। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি মানবিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, বাক স্বাধীনতা এবং নারী-পুরুষের সমানাধিকারের কথা বলে এসেছি। বিপদ এসেছে, নির্বাসন এসেছে, একাকিত্ব এসেছে কিন্তু আমার বিশ্বাস বদলায়নি। বাংলাদেশে আজ মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ভয়াবহ। রাজীব হায়দর, অভিজিৎ রায়, ওয়াসিকর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাস, নিলয় নীল ফয়সল-সহ অনেক সাহসি মুক্তচিন্তকদের জিহাদিরা নৃশংস ভাবে হত্যা করেছে। অপরাধ তাঁরা প্রশ্ন করেছিলেন। ইসলামের বৈষম্যমূলক বিধানের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁদের হত্যা করে সমাজকে বার্তা দেওয়া হয়েছে, প্রশ্ন করলে মৃত্যু, নীরব থাকলে জীবন। আমি সেই শর্ত মানি না। নীরবতার বিনিময়ে যে জীবন কিনতে হয়, সেটি স্বাধীন জীবন নয়। কিন্তু প্রশ্নকে হত্যা করা যায় না। প্রশ্নকারীকে হত্যা করলে আরও বহু মানুষের কণ্ঠে প্রশ্ন ফিরে আসে। যে সমাজ সমালোচককে হত্যা করে, কারাগারে পাঠায় বা নির্বাসিত করে, সেই সমাজ সমালোচককে নয়, নিজের ভবিষ্যৎকে হত্যা করে, বন্দি করে বা নির্বাসিত করে।"