সুকান্ত মুখোপাধ্য়ায়, শিবাশিস মৌলিক ও কৃষ্ণেনদু অধিকারী, কলকাতা : বৃহস্পতিবার ED-র তল্লাশি চলাকালীনই আইপ্য়াক কর্ণধারের বাড়ি এবং আইপ্য়াকের অফিসে পৌঁছে যান মুখ্য়মন্ত্রী। তিনি বলেন, "এটা কোনও প্রাইভেট অর্গানাইজেশনের অফিস নয়, এটা তৃণমূলের অথরাইজড অফিস।" গত কয়েক বছরে অবশ্য় আইপ্য়াকের সঙ্গে তৃণমূলের সম্পর্ক অনেক ওঠানামার মধ্য়ে দিয়ে গেছে। কখনও তাতে দূরত্ব এসেছে, কখনও আবার কাছাকাছি এসেছে দু'পক্ষ।
বৃহস্পতির সকালে কলকাতার হাড় কাঁপানো শীতকেও, হার মানাল রাজনীতির উত্তাপ। কয়লা-কেলেঙ্কারির তদন্তে আইপ্য়াকের কর্ণধারের বাড়ি এবং অফিসে ED-র তল্লাশি অভিযান তোলপাড় ফেলে দিল রাজ্য় রাজনীতিতে। সংঘাতের পারদ আরও চড়িয়ে, তল্লাশি চলাকালীনই সেখানে পৌঁছে গেলেন স্বয়ং মুখ্য়মন্ত্রী।
তৃণমূলের সঙ্গে আইপ্য়াকের সম্পর্কের শুরুটা সেই ২০১৯ সালে। সেবার লোকসভা নির্বাচনে এরাজ্য়ে তৃণমূলের আসন কমে যাওয়ার পর আইপ্য়াকের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে তৃণমূল। সংস্থার তদানীন্তন প্রধান প্রশান্ত কিশোরকে নিয়ে নবান্নে গেছিলেন অভিষেক বন্দ্য়োপাধ্য়ায়। তারপর দলের বৈঠক থেকে গোয়া সফর, বিভিন্ন সময়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গী হিসেবে দেখা যেত প্রশান্ত কিশোরকে। এরপর ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ঘুরে দাঁড়ায় তৃণমূল। সেবছর ২১ জুলাইয়ের বক্তব্য়ে মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ের মুখেই শোনা যায় আইপ্য়াকের কথা। তিনি আইপ্য়াককে ধন্য়বাদ জানান। কিন্তু, এর একবছর যেতে না যেতেই, আবার ছবিটা পাল্টাতে শুরু করে। রাজ্য়ের পুরসভাগুলোতে ভোটের আগে সামনে আসে তৃণমূলের জোড়া প্রার্থী তালিকা। একদিকে সাংবাদিক বৈঠকে প্রার্থীতালিকা ঘোষণা করেন তৎকালীন মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্য়ায়রা। অন্য়দিকে, তৃণমূলের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে আরেকটি প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হয়। যা নিয়ে মুখ খোলেন ফিরহাদ হাকিমের মতো তৃণমূলের প্রবীণ নেতারা। তিনি কারও নাম না করলেও, অনেকে অনুমান করেছিলেন, ফিরহাদ হাকিমের নিশানা ছিল আইপ্য়াকের দিকেই। ফিরহাদ হাকিম বলেছিলেন, "বিভ্রান্তি করার জন্য অনেকে লিস্ট তৈরি করেছেন। এটা প্রচার করা অন্যায়। পাসওয়ার্ড নম্বর থাকলে দেওয়াটা অন্যায়। অপব্যবহার হয়েছে। এটা অন্যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্মতিক্রমেই এই লিস্টটায় সুব্রত বক্সী সই করেছেন।"
এরপর সরাসরি আইপ্য়াককে নিশানা করতে শুরু করেন তৃণমূলের অন্য় প্রবীণ নেতারাও। তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "আজ আইপ্যাকের লোক কোথায়? আইপ্যাকের লোক কোথায়? যারা সব নাম গুঁজে গুঁজে দিয়ে ক্যান্ডিডেট করেছিল, তাদের জেতানোর জন্য নামুক, আইপ্যাক কোথায়? বাজারে তো আমাকেই হাঁটতে হচ্ছে, খাটতে হচ্ছে।"
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দলীয় বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠকে মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায় পরিষ্কার বলে দেন, কোনও সমীক্ষক সংস্থা থেকে ফোন করলে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবেন না। প্রয়োজনে ফোন ধরবেন না। এরপরই কয়েক ধাপ এগিয়ে আইপ্য়াকের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্য়কর অভিযোগ তোলেন তৃণমূল বিধায়ক মদন মিত্র। তিনি বলেন, "আমাদের পার্টিতে এসব ছিল না। আনারি টাকা-পয়সা লেনদেন। এই একটা এজেন্সি আমাদের পার্টিতে ঢুকল।"
কিন্তু, কিছুদিন যেতে না যেতেই ফের পরিস্থিতি বদলায়। গতবছর ফেব্রুয়ারিতে নেতাজি ইন্ডোর থেকে, আইপ্য়াকের সঙ্গে সহযোগিতার বার্তা দেন মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ই। তিনি বলেন, বিজেপির নতুন কাজ অপারেশন, ওর যদি ৫০টি এজেন্সি থাকে, আমাদের একটা তো থাকবে কম করে, যারা ... দেখবে। ফিল্ড সার্ভে করবে। আপনার সঙ্গে মিলতে না পারে। কিন্তু তাদের যাওয়ার দরকার আছে।... এদের নামে উল্টোপাল্টা বলা বন্ধ করুন।"
এবার সেই আইপ্য়াকের অফিসে ED তল্লাশি চালাতে যেতেই, সেখানে পৌঁছে গেলেন মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায়। I-PAC-এর অফিস থেকে বেরিয়ে তিনি বলেন, "প্রতীকের ঘরে গিয়ে করেছেন, I-PAC অফিসেও করেছেন। এটা কোনও প্রাইভেট অর্গানাইজেশনের অফিস নয়, এটা তৃণমূলের অথরাইডজ অফিস।" এই তদন্ত নিয়ে ED এবং মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ের সংঘাতের জল কতদূর গড়ায়, সেটাই দেখার।