কলকাতা : পদ্মপুরষ্কার গ্রহণের রাষ্ট্রপতিভবনে হুইল চেয়ারে বসা অলকা ইয়াগনিককে দেখে চমকে উঠেছিলেন অনেকেই। এমন ক্ষীণ শরীর। অন্যের সাহায্য নিয়ে চলাফেরা। এককালে বলিউড কাঁপানো কোকিল-কণ্ঠীর এমন অবস্থা দেখে মন খারাপ অনেকেই । সঙ্গে উৎকণ্ঠা। এ কেমন রোগ ! এই রোগে কি সারে ? দীর্ঘদিন এমন রোগে আক্রান্ত থাকলে রোগীর কী পরিস্থিতি হতে পারে। বিভিন্ন মেডিক্যাল ওয়েবসাইট ও চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন এ রোগের ইতিবৃত্ত।
২০২৪ সালে সেনসোনিউরাল হিয়ারিং লস (Sensorineural Hearing Loss - SNHL) এ আক্রান্ত হন গায়িকা। এই সমস্যাকে সাধারণত স্থায়ী হিসেবেই ধরা হয়। অন্তঃকর্ণের (Inner Ear) ককলিয়ার (Cochlea) সূক্ষ্ম হেয়ার সেল বা শ্রবণ স্নায়ু (Auditory Nerve) ক্ষতিগ্রস্ত হলে এমনটা হতে পারে। এই স্নায়ুই কানের শব্দকে মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়। একবার এই হেয়ার সেল বা স্নায়ুর ক্ষতি হলে তা সাধারণত স্বাভাবিকভাবে আর আগের অবস্থায় ফিরে আসার ঘটনা বিরল। এই সমস্যা এক কানে বা দুই কানেই হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে, আবার কারও ক্ষেত্রে হঠাৎ করেই শ্রবণশক্তি কমে যেতে পারে।
চিকিৎসক ডা. চান্দ্রেয়ী বন্দ্যোপাধ্যায় এবিপি লাইভকে জানিয়েছিলেন, ' কানের ভিতরে অনেকগুলি স্নায়ু থাকে। সেখানে যদি কোনও কারণে ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে, তাহলে শ্রবণশক্তি ব্যাহত হতে পারে। কানের ভেতর নার্ভের পাশ দিয়ে যায় ছোট ছোট রক্তবাহিকা। এই রক্তবাহিকাগুলিতে যদি কোনও কারণে প্রদাহ হয়, তাহলে স্নায়ুও পুষ্টি ও অক্সিজেন না পেয় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ও কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এছাড়া কানে Sensorineural কম্পোনেন্টগুলির কোনও একটিও যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলেও এমনটা হতে পারে। ' আবার হাম বা মেনিনজাইটিসের মতো অসুখও শ্রবণ ক্ষমতা নষ্ট করতে পারে।
সেন্সোরিনিউরাল হিয়ারিং লসের প্রাথমিক লক্ষণ
- কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়া
- বারবার অন্যকে কথা পুনরায় বলতে বলা
- টিভি, মোবাইল বা রেডিওর ভলিউম বাড়িয়ে শুনতে হওয়া
- উচ্চ স্বরের শব্দ শুনতে সমস্যা হওয়া
- মনে হওয়া, অন্যরা অস্পষ্টভাবে কথা বলছেন
- কানে সবসময় শোঁ শোঁ, ভোঁ ভোঁ শব্দ শোনা (টিনিটাস)
- দীর্ঘক্ষণ কথা শুনলে ক্লান্তি বা মানসিক চাপ অনুভব করা
চিকিৎসকদের মতে, এই লক্ষণগুলি শুরুতেই শনাক্ত করা গেলে দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে আরও শ্রবণশক্তি হারানোর ঝুঁকি কিছু ক্ষেত্রে কমানো যেতে পারে।
কী কী কারণে এই রোগ হতে পারে?
সেন্সোরিনিউরাল হিয়ারিং লসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে—
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে । দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দের মধ্যে কাজ করা বা জোরে হেডফোন ব্যবহার করার জন্য। পরিবারে শ্রবণশক্তি হ্রাসের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বেশি। ভাইরাল সংক্রমণ বা কানের সংক্রমণ থেকে বাড়তে পারে রোগ। মাথা বা কানে আঘাতও এই সমস্যার কারণ হতে পারে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা অটোইমিউন রোগ থেকেও এমনটা হয়। কিছু অ্যান্টিবায়োটিক বা কেমোথেরাপির ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও এমন পরিণতি হতে পারে। ধূমপান ও হৃদ্রোগজনিত সমস্যা, যা অন্তঃকর্ণে রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে দেয়।
চিকিৎসা কী?
কোনও কোনও চিকিৎসক বলেন, হিয়ারিং এইডের ব্যবহার ( Hearing Aid), কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট (Cochlear Implant) ডিভাইস ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি ক্ষতিগ্রস্ত অংশকে বাইপাস করে সরাসরি শ্রবণ স্নায়ুকে উদ্দীপিত করে। হঠাৎ হওয়া সেন্সোরিনিউরাল হিয়ারিং লসে দ্রুত চিকিৎসা শুরু হলে কিছু ক্ষেত্রে শ্রবণশক্তি আংশিক বা সম্পূর্ণ ফিরে আসতে পারে। এছাড়া স্পিচ থেরাপি ও অডিটরি রিহ্যাবিলিটেশন, রোগীদের নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।
কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়?
দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দের মধ্যে না থাকা, হেডফোন মাঝারি ভলিউমে ব্যবহার করা, কানের সংক্রমণ বা শ্রবণ সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান এড়িয়ে চলা দরকার।
তবে এই রোগ সারবে কি সারবে না, বলা মুশকিল। এমনও হতে পারে, নিজে থেকেও সারল না, চিকিৎসাতেও সাড়া দিল না। বধিরতা নিয়েই বাঁচতে হল আক্রান্তকে। তাই কার শ্রবণ ফিরে আসবে, কার আসবে না বলা মুশকিল।
