কলকাতা: মানবসভ্যতার জন্মই প্রকৃতির আঁতুরঘরে। কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতিতে সেই আঁতুরঘরই ক্রমশ বিপন্ন হয়ে পড়ছে। বিপন্নের উপলব্ধি কিন্তু আজকের নয়। এক শতাব্দী আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় ধরা পড়েছিল প্রকৃতি ধ্বংসের সেই উদ্বেগ। তপোবন প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “মানুষকে বেষ্টন করে এই যে জগৎপ্রকৃতি আছে, এ যে অত্যন্ত অন্তরঙ্গভাবে মানুষের সকল চিন্তা, সকল কাজের সঙ্গে জড়িত হয়ে আছে। মানুষের লোকালয় যদি কেবলই একান্ত মানবময় হয়ে ওঠে, এর ফাঁকে ফাঁকে যদি প্রকৃতি কোনওমতে প্রবেশাধিকার না পায় তাহলে আমাদের চিন্তা ও কর্ম কলুষিত ব্যধিগ্রস্ত হয়ে নিজের অতলস্পর্শ আবর্জনার মধ্যে আত্মহত্যা করে মরে।” প্রকৃতির প্রতি অনুরাগে তো বটেই। কিন্তু আসন্ন দিনের উদ্বেগ থেকেও কলম ধরেছেন বারবার।                                              

Continues below advertisement

বিগত কয়েক যুগ ধরেই কিন্তু সতর্ক করেছে প্রকৃতি। গ্লোবান ওয়ার্মিং, হিমবাহের গলন, আন্টার্কটিকায় সতর্কবার্তা, ভূমিকম্প, ভূমিধস, আবহাওয়ার মারাত্মক খামখেয়ালি মনোভাব- সতর্কবার্তা একাধিকভাবে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং যুদ্ধ—সব মিলিয়ে পৃথিবী এক গভীর সঙ্কটের মুখে। এই চিন্তার মাঝেই প্রশ্ন উঠছে ২০৫০ সালের পৃথিবী কেমন হবে? এখনও কি সময় আছে পরিস্থিতি বদলানোর?

আজ ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস (World Environment Day 2026)। প্রতি বছর এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবী কেবল মানুষের নয়, কোটি কোটি প্রাণী, উদ্ভিদ ও বাস্তুতন্ত্রেরও আবাসস্থল। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, দূষণ এবং যুদ্ধ—সব মিলিয়ে পৃথিবী এক বহুমাত্রিক সঙ্কটের মুখোমুখি। রাষ্ট্রপুঞ্জের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) সতর্ক করে বলছে, এখনই বড় পরিবর্তন না আনলে ২০৫০ সালের পৃথিবী আরও উষ্ণ, আরও দূষিত এবং আরও বসবাস অযোগ্য হয়ে উঠবে।

Continues below advertisement

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬-এর মূল প্রতিপাদ্য জলবায়ু পরিবর্তন। এই বছরের প্রচারাভিযানের বার্তা হল #NowForClimate—অর্থাৎ এখনই জলবায়ুর জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। এবারের থিম- "Inspired by Nature. For Climate. For Our Future'। UNEP-এর মতে, প্রকৃতি কোনও বিলাসিতা নয়; জলবায়ু সহনশীলতা এবং মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য প্রকৃতি অপরিহার্য।

কিন্তু সঙ্কট শুধু কার্বন নিঃসরণে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতির ওপর চাপ এতটাই বেড়েছে যে বনভূমি উজাড়, নদী দূষণ, সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস এখন দৈনন্দিন বাস্তবতা। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, পৃথিবী বর্তমানে তিনটি বড় সঙ্কটের মুখোমুখি—জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং দূষণ। এই তিনটি সংকট একে অপরকে আরও তীব্র করে তুলছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাব। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত শুধু মানবিক বিপর্যয়ই তৈরি করছে না, বরং জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। যুদ্ধের কারণে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, বাড়ছে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের গতি কমে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত বিশ্বের অর্থনীতি ও জলবায়ু উদ্যোগকে পিছিয়ে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এমনটাই থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের বহু অঞ্চল তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা এবং খাদ্য সঙ্কটের মুখে পড়বে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলবর্তী জনপদকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। কৃষি উৎপাদন কমবে, পানীয় জলের সংকট বাড়বে এবং কোটি কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে। ইতিমধ্যেই এল নিনোর মতো জলবায়ুগত ঘটনাগুলি আরও তীব্র আবহাওয়া পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশিষ্ট পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত বলেন, 'বিশ্ব পরিবেশ দিবস কিন্তু শুধু উদযাপনের জন্য নয়। ঠিক যেমন শুধু মাদার্স ডে- ফাদার্স ডে পালনের মধ্যে দিয়ে মা-বাবাকে উদযাপন করা যায় না, তেমন একদিন নয়, বরং প্রতিদিন অভ্যাস করতে হবে পরিবেশকে ভাল রাখতে।'                                                   

কলকাতার পরিবেশ কেমন? আগামী দিনের জন্য কতটা চিন্তার? 

বিশিষ্ট পরিবেশবিদের কথায়, 'কলকাতার যে ভৌগলিক অবস্থান, তা পৃথিবীর হাতে গোনা কয়েকটি জায়গায় আছে। খনার বচনে ছিল যে পুবের ঢালে জমি, আর পশ্চিমে গঙ্গা, এই যে অবস্থান তা প্রাকৃতিকভাবেই পরিবেশ রক্ষা করত। কিন্তু সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট আইন না মেনেই বর্জ্য পদার্থ ডাম্পিংয়ের কাজ চলছে। সেখান থেকে মিথেন গ্যাস তৈরি হচ্ছে। সেই গ্যাস ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। আগামী দিন ভয়ঙ্কর হতে চলেছে। নিজেদের ক্ষতি নিজেরাই ডেকে আনছি।' 

রাষ্ট্রপুঞ্জের পরিবেশ কর্মসূচির (UNEP) তথ্য অনুযায়ী, আমরা বর্তমানে আমাদের জীবনযাত্রার মান এবং চাহিদা মেটাতে ১.৬টি পৃথিবীর সমপরিমাণ সম্পদ ব্যবহার করছি, যার সঙ্গে আমাদের বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম আর তাল মিলিয়ে উঠতে পারছে না। পৃথিবীর আনুমানিক ৮০ লক্ষ উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির মধ্যে প্রায় ১০ লক্ষ প্রজাতি আজ বিলুপ্তির চরম হুমকিতে রয়েছে। মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে পৃথিবীর ৭৫ শতাংশ ভূমি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, যার মধ্যে ৮৫ শতাংশ জলাভূমিও অন্তর্ভুক্ত। শুধু স্থলের পরিবেশই নয়, মানুষের আগ্রাসন থেকে রক্ষা পায়নি সমুদ্রও; পৃথিবীর ৬৬ শতাংশ সমুদ্র অঞ্চল মানুষের নানা কর্মকাণ্ড এবং দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি বিশ্বের সামুদ্রিক মাছের মজুদের প্রায় ৯০ শতাংশই সম্পূর্ণভাবে বা অতিরিক্তভাবে আহরণ করা হয়েছে অথবা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গেছে। 

পরিবেশের এই সঙ্কটের আগুনে আরও মারাত্মকভাবে ঘি ঢালছে আধুনিক Geo-political সংঘাত ও যুদ্ধ। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান এবং ইজরায়েল-আমেরিকার যুদ্ধে প্রথম ১৪ দিনেই প্রায় ৫০ লক্ষ (৫.০৫ মিলিয়ন) টন গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়েছে। যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা কেবল হাজার হাজার মানুষের প্রাণই কেড়ে নিচ্ছে না, বরং পশ্চিম এশিয়াকে একটি বিশাল Environmental Sacrifice Zone- এ পরিণত করছে।  এই যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে বিমান ও সামরিক যানগুলি থেকে আনুমানিক ৫,২৯,০০০ টন কার্বন নির্গমন হয়েছে। তেহরানের আশেপাশের ৪টি প্রধান জ্বালানি ডিপোতে বোমাবর্ষণের পর আকাশে যে ঘন কালো মেঘ ও কালো বৃষ্টির সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে প্রায় ২৫ থেকে ৫৯ লক্ষ ব্যারেল তেল পুড়ে ছাই হয়ে ১.৮৮ মিলিয়ন টন কার্বন নির্গত করেছে। এই যুদ্ধে প্রায় ২০,০০০ বেসামরিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ার কারণে আনুমানিক ২৪ লক্ষ টন কার্বন ডাই অক্সাইড সমতুল্য গ্যাস নির্গত হয়েছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত সামরিক ড্রোন এবং ব্যবহৃত গোলাবারুদ থেকে ১,৭২,০০০ টন কার্বন নির্গমন ঘটেছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, ২০২৮ সালের মধ্যেই আরও বেড়ে যাবে গড় তাপমাত্রা। 

২০৫০ সালে পৃথিবী কেমন রূপ ধারণ করবে, তার একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জের গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট আউটলুক (GEO-7) রিপোর্টে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বড় ধরনের কোনও পরিবর্তন না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বার্ষিক ৭৫ বিলিয়ন টনে পৌঁছবে, যা বর্তমানের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। এর ফলে জলবায়ুতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হবে। 

তবে এখনও সময় ফুরিয়ে যায়নি। বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল বার্তাই হল—পৃথিবী সংকেত পাঠাচ্ছে, এখন মানুষের উত্তর দেওয়ার পালা। গাছ লাগানো, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো,  জল ও প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণের মাধ্যমে পরিবর্তন সম্ভব। ছোট ছোট পদক্ষেপও বড় পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে দিতে পারে।

এই বিশ্ব পরিবেশ দিবসে প্রশ্ন একটাই—আমরা কি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে চাই, নাকি সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে আরও বড় বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাব?                                                            

 

তথ্যসূত্র

The Gurdian - 5m tonnes of CO2 emitted in just 14 days of US war on Iran, analysis finds- 

UN Environment Programme- Without big changes, this is what the environment will look like in 2050

UN Environment Programme- Facts about the nature and crisis