দার্জিলিং: বাঙালির 'দী-পু-দা'-র মধ্যে অন্যতম দার্জিলিং! দুটো দিনের ছুটি পেলেই, বাঙালির মন ছুটে যেতে চায় এই চোখজুড়নো শৈলশহরে। কিন্তু এই শহর যতটা সুন্দর, ততটাই জটিলতা রয়েছে এখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে। দার্জিলিং (Darjeeling)। বাঙালির প্রিয় ডেস্টিনেশন। তবে কনকনে ঠান্ডা বাতাসে জবুথবু পাহাড়ে উষ্ণতা বলতে এখন এই ভোটটুকুই। দীর্ঘদিন পর যেন আবার নড়েচড়ে বসেছে পাহাড়।
পাহাড়ে বিজেপির লড়াই
কালিম্পং জেলার একটি আসন, সেইসঙ্গে দার্জিলিঙের ২টি আসন। সব মিলিয়ে পাহাড়ের তিনটি আসনের দিকে এখন নজর সকলের। কারণ, যাঁরাই ভোটের ময়দানে রয়েছেন, তাঁরাই এখন শান্তি আর উন্নয়নের পক্ষে সওয়াল করে ভোট চাইছেন দুয়ারে দুয়ারে। এখানে মুখোমুখি লড়াইয়ে তৃণমূল সমর্থিত ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা এবং বিজেপি। এই নির্বাচনেও গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সমর্থন রয়েছে গেরুয়া শিবিরের দিকে।দার্জিলিং-এ নিজের জায়গা কীভাবে তৈরি করে নিচ্ছে বিজেপি? কার্শিয়ং-এর বিজেপি প্রার্থী সোনম লামা বলছেন, 'বিকশিত ভারতের মিশনে যা যা কাজ হচ্ছে, মানুষ বুঝতে পারছেন, উত্তরবঙ্গে উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে, দার্জিলিং পিছিয়ে পড়ছে। তাই দার্জিলিংয়ের মানুষ ও এবার চাইছেন, যেভাবে বিহার, উত্তরপ্রদেশ বদলাচ্ছে, সেই গতিতেই উন্নয়ন আসুক দার্জিলিংয়েও।'
ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার বক্তব্য
ঘিসিংয়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ঘিরে পাহাড়ে প্রথম শুরু হয়েছিল জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতি। আশির দশকের সেই আন্দোলনের ধাক্কায় প্রথমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে পর্যটন। পাহাড়ে হারিয়ে যায় শিক্ষার গরিমা। মুখ থুবড়ে পড়ে দেশজোড়া বিখ্য়াত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি। ঘিসিং স্বশাসিত পরিষদ গড়তে সক্ষম হলেও সেই পরিষদ মানুষের প্রত্য়াশা পূরণে ব্য়র্থ হওয়ায় আবার দানা বাধে আলাদা রাজ্য়ের দাবি। এবার নেতৃত্বে বিমল গুরুং। আবার সেই বিধ্বংসী আন্দোলন। সমৃদ্ধ পাহাড়কে এক কথায় নিঃস্ব করে ছে়ডে় দেয়। সেই গুরুংয়ের গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা ভেঙেই এখন তৈরি হয়েছে ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা। পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নের কথা বলে ভোট যুদ্ধে নেমেছে তারা। অনীত থাপার নেতৃত্বে গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার বক্তব্য একটাই, বিধ্বংসী আন্দোলন নয়, শান্তি বজায় রেখেই উন্নয়নের পথে হাঁটতে হবে। দার্জিলিং, কার্শিয়াং এবং কালিম্পং.. এই ৩ জায়গায় প্রার্থী দিয়েছে গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা, যাঁদের সমর্থন করেছে তৃণমূল কংগ্রেস।
বিমল গুরুংও পর্ষদ গঠন করেছিলেন। কিন্তু রাজ্যের সঙ্গে সংঘাতের জেরে আক্ষরিক অর্থেই কোণঠাসা হয়ে পড়েন গুরুং। সেই সময়ে তাঁরই বিশ্বস্ত সঙ্গী বিনয় তামাং ও অনীত থাপা, শিবির বদলে হাত মেলান রাজ্যের শাসক দলের সঙ্গে। সমীরণ পাল্টে যায় GTA-র। ক্ষমতা দখল করে নেয়, বিনয়-অনীত গোষ্ঠী। তাঁরাই তৈরি করেছেন, ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা। তাঁরা এখন GTA-র ক্ষমতা। বিনয় তামাং চেয়ারম্যান, আর অনীত থাপা ভাইস চেয়ারম্যান। তাঁদের দলকেই পাহাড়ের তিনটি আসনে সরাসরি সমর্থন দিয়েছে তৃণমূল। ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার নেতা অনীত থাপা বলছেন, 'আমাদের দাবিদাওয়াগুলো একই রয়েছে। কিন্তু যে পদ্ধতিতে সেই দাবিগুলোর কথা বলা হত, সেই পদ্ধতিটা সঠিক নয়। নিজেরাই যদি পাহাড়ে অশান্তি করি, তাহলে ছোটরা স্কুলে যেতে পারবে না, চা বাগানগুলো চলবে না। নিজেদের ক্ষতি করে কখনও গোর্খাল্যান্ড পাওয়া যাবে না। আমরা শুরু শান্তি আর উন্নয়ন চাই।'
পাহাড়ে কোথায় দাঁড়িয়ে তৃণমূল?
পাহাড়ের ৩টি আসন, একটি কালিম্পং জেলার আর দু'টি দার্জিলিং জেলার। সেই সঙ্গে দার্জিলিং জেলার অন্তর্গত সমতলের ৩টি আসন...ফাঁসিদেওয়া, মাটিগাড়া নকশালবাড়ি এবং শিলিগুড়ি। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে দুই জেলা মিলিয়ে মোট ৬টি আসনের মধ্যে ৫টিতেই জয়ী হয়েছিল BJP। সেবার কালিম্পং আসনে জিতেছিলেন নির্দল প্রার্থী রুদেন লেপচা। দার্জিলিংয়ের ৫টি আসনেই একচেটিয়া জয়ের ধ্বজা উড়িয়েছে গেরুয়া শিবির। তাদের সেই একছত্র দাপট অব্যাহত ছিল ২০২৪-এর লোকসভা ভোটেও। ৬টি কেন্দ্রেই তৃণমূলকে পিছনে ফেলে দিয়েছিল বিজেপি। এই কোণঠাসা পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়েই এখানে লড়াই করতে হচ্ছে তৃণমূলকে। শিলিগুড়ির তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী গৌতম দেব বলছেন, '২টি রাজনৈতিক দল যদি নীতিগতভাবে লড়াইটা করে, তাহলেই ভাল। কিন্তু নীতিগত অবস্থানের বাইরে গিয়ে তাঁরা অনৈতিক কাজকর্ম করছেন। বিশেষ করে বিজেপির মধ্যে এই বিষয়টা প্রবল। আশা করব, কর্মসূচি বজায় রেখে, স্বচ্ছভাবে একটা নির্বাচন হওয়া উচিত।'
গত বিধানসভা ভোটে ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি কেন্দ্রে পরাজিত হয়ে এবার আসন বদলে শিলিগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছেন গৌতম। এই কেন্দ্রে '২১-এর নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী ওমপ্রকাশ মিশ্রকে হারিয়ে বিধায়ক হন বিজেপির শঙ্কর ঘোষ। এবার নিজের জেতা কেন্দ্রেই প্রার্থী হয়েছে শঙ্কর। শিলিগুড়ির বিজেপি প্রার্থী শঙ্কর ঘোষ বলছেন, 'বিজেপিই জিতবে। এর মধ্যে কোনও ভুল নেই। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মেজাজ আর শিলিগুড়ির মানুষের মেজাজ একসঙ্গে মিলে এবার পশ্চিমবঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন সরকার তৈরি হবে। তৃণমূল কংগ্রেস কেন্দ্রকে প্রতিন্ধন্দ্বী হিসেবে মনে করে, এর ফলে বাধাপ্রাপ্ত হয় উন্নয়ন। ৫টা বছর আমাদের দিন, ৫ বছর পরে আবার হিসেব মিলিয়ে নেবেন।'
পাহাড়ে ফিরবে লাল?
দার্জিলিং জেলায় একসময় রাজনীতির ময়দানে দোর্দণ্ড প্রতাপ শক্তি ছিল বামেরা। নির্দিষ্ট করে বলতে সিপিএম পাহাড়ের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন রতনলাল ব্রাহ্মণ। আশির দশকে সুবাস ঘিসিং-এর বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন প্রতিহত করতে গিয়ে পাহাড় থেকে কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় সিপিএম। এই জেলায় তাদের লড়াইটা এখন সমতলেই সীমাবদ্ধ। সিপিএম নেতা ও প্রাক্তন মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্য বলছেন, 'বিজেপি আগেরবার যত আসন পেয়েছিল, সেটাও পেরোতে পারবে না। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিজেপিকে সরকারে চায় না। কিন্তু তৃণমূল সরকার এমন সব কাজ করছে যে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তৃণমূলের ওপর বিতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ছে। এই সুযোগটাই নিচ্ছে বিজেপি সরকার।'
দীর্ঘবছর রক্তাক্ত আন্দোলনে বিধ্বস্ত পাহাড়ে এখন সব দলেই শান্তি আর উন্নয়নের কথা বলছেন। তাদের দাবি, পাহাড়ে এখন শান্তি ফিরেছে এবং এই শান্তির পরিবেশ ধরে রাখতে পারলে উন্নয়নের দরজা খুলে দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু এই শান্তির পরিবেশ নিয়ে প্রবল সন্দিহান গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা। দলের অন্যতম নেতা এবং পার্বত্য পরিষদের প্রাক্তন সদস্য যোগেন্দ্র রাই মনে করেন, আপাতদৃষ্টিতে যেটাকে শান্তি বলে মনে হচ্ছে, সেটা আসলে ঝড়ের পূর্বাভাস। কারণ, পাহাড়ের দাবিটা এখনও অধরা। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার নেতা যোগেন্দ্র রাই বলছেন, 'বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, শ্মশানের মতো শান্ত হয়ে রয়েছে পাহাড়। পাহাড়ের দাবি কিন্তু পূর্ণ হয়নি। ব্রিটিশ শাসনের সময়কাল থেকে আমরা দাবি জানাচ্ছি, একটা পৃথক রাজ্যের। কিন্তু সেটা এখনও পূর্ণ হয়নি। আগামীদিনে এর জন্য যদি আন্দোলন করতে হয়, করব।'
সমতল কিন্তু মনে প্রাণে চায়, পাহাড়ে শান্তি থাকুক। পাহাড়ে শান্তি মানে পর্যটন টিকে থাকা। দার্জিলিং পাহাড়ের গা বেয়ে যাত্রীবোঝাই যে টয়ট্রেনটা দুলকি চালে পাহাড় থেকে নেমে আসছে সমতলে, সেই ট্রেনটা যাতে স্তব্ধ না হয়, এটাই প্রার্থনা সমতলের। পাহাড়ের পর্যটনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত শিলিগুড়ির অর্থনীতি। রাজনৈতিক সমীকরণের বদলটা স্বাভাবিক, কিন্তু পাহাড়ের অশান্তি অস্বাভাবিক অস্থিরতা তৈরি করে সমতলেও। কী হবে ৪ঠা মে? নতুন করে পাহাড়ে কোনও অশান্তি তৈরি হবে না তো? উত্তরের অপেক্ষাতেই এখন দিন গুনছে সবাই।
