কলকাতা : এবিপি আনন্দের মহাযুদ্ধ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন এই নির্বাচনে বামেদের কনিষ্ঠতম প্রার্থী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আফরিন বেগম। বালিগঞ্জ থেকে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে লড়াই করছেন তিনি। এই অনুষ্ঠানে নিজের বক্তব্য রাখার সময় উপস্থিত সকলকে অভিবাদন জানান তিনি। তারপর নিজের বক্তব্য শুরু করেন বালিগঞ্জের বাম প্রার্থী।
আফরিন বললেন:
"নমস্কার, আমি আফরিন বেগম। আমি কলকাতাতেই জন্মেছি। কলকাতাতেই বড় হয়েছি। কিন্তু কারও কাছে বোধ হয় আমি রোহিঙ্গা। আর সেটা নিয়েই তো আজ বিভিন্ন প্রশ্ন, আলাপ-আলোচনা। আজ যে বিষয় নিয়ে আমরা কথা বলছি, সেই বিষয়ের মধ্যে এসআইআর রয়েছে, নির্বাচন রয়েছে, বদলি রয়েছে। তারমধ্যে গত ২৩ মার্চ একটা সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল। আর সেটা প্রকাশ হয়েছে একদম রাতে। আমরা সবাই বসেছিলাম।
'আন্ডার অ্যাডজুডিগেশন', এই যে বিষয়টা আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে, এটা কী সত্যিই আমরা জানতাম না। আসলে গণতন্ত্র 'আন্ডার অ্যাডজুডিগেশনে' চলে গিয়েছে। আমাদের গণতন্ত্রটাই বিচারাধীন হয়ে গিয়েছে। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের মানুষ দেখতে পাচ্ছেন, যেদিন থেকে এসআইআরের মাধ্যমে ভোটার তালিকায় সংশোধনের চেষ্টা শুরু হয়েছে, তখন থেকে মানুষ কীভাবে হেনস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। মানুষ কী ধরনের সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। যখন নির্বাচন হয়, তখন স্বাভাবিক নিয়মেই নির্বাচনের সময় যাঁরা প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকেন, তাঁদের বদলি করা হয়। প্রতি বছরই সেটা হয়। কিন্তু এই বছরে, এই নির্বাচনে কমিশন যে বদল করেছে সেখানে একটা অদ্ভুত প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে সেই দায়িত্বে রাখা হচ্ছে না। অদ্ভুত ভাবে বাইরে থেকে নিয়ে এসে এই নির্বাচন করার একটা চেষ্টা চলছে। করানোও হচ্ছে সেটা। এবং কোথাও গিয়ে আমি যদি দেখি আমাদের পশ্চিমবঙ্গে গত ১৫ বছরে আমরা যে খুব ভাল করে সুস্থ সবল ভাবে নির্বাচন করতে পেরেছি, তা তো নয়। সেখানেও আমরা একাধিক ঘটনা দেখেছি। গত ১৫ বছরে তৃণমূলের যে সমস্ত অত্যাচার, সেটাও আমাদের সহ্য করতে হয়েছে। সেইগুলো সহ্য করে নির্বাচনে টিকে থাকতে হয়েছে, লড়াই করতে হয়েছে। কিন্তু তার পরও দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গের যে প্রশাসন রয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে যা যা অত্যাচার করার, আমাদের রাজ্যের সরকার করেছে। কিন্তু তা বলে পশ্চিমবঙ্গের যে প্রশাসন রয়েছে সেটাকে রাতারাতি সম্পূর্ণ লোপাট করে দেওয়ার যে একটা চেষ্টা, সেটকেও কোনও ভাবে সমর্থন করা যায় না। ফলত, সেটা করার একটা চেষ্টা করা হয়ছে।
যে ভাবে মানুষের উপর অত্যাচার করা হচ্ছে, এই এসআইআরের নাম করে, আমরা যদি দেখি, তাহলে সেখানে যারা এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অধিকার পাচ্ছেন, তাঁদের একটা বিশেষ ভূমিকা থাকবে। তাঁদের বিশেষ ভূমিকা থাকবে বিজেপির বিরুদ্ধে, তাঁদের বিশেষ ভূমিকা থাকবে নির্বাচন কমিশনের অত্যাচারের বিরুদ্ধে। আশা রাখছি তাঁর সেই বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করবেন।
আমাদের যে বিচার বিভাগ, তাঁদের যে আচরণ বহু সিদ্ধান্ত সেটা খানিকটা কষ্টদায়ক বা বেদনাদায়ক। মনে হচ্ছে খানিকটা আনমনেই হয়তো বিভিন্ন সিদ্ধান্ত তাঁর নিচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনের বহু যে দোষ বা ত্রুটি রয়েছে সেগুলোকে দেখেও দেখছেন না। এটা খানিকটা আমার মনে হচ্ছে।
সময়র যদি এসআইআর প্রক্রিয়ায় দেখি, কীভাবে বেছে বেছে মুসলিম সম্প্রদায়, মতুয়া সম্প্রদায়, দলিত সম্প্রদায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রান্তিয় অঞ্চলের যে সব মানুষজন রয়েছেন, তাঁদের নামগুলো বাদ দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের উপ অত্যাচারটাকে নামিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে। আসলে সামাজিক ভাবে তাঁর অনেকটা পিছিয়ে পড়া। কিন্তু সেই মানুষগুলোর উপর অত্যাচার করে সেই মানুষগুলোর যে অধিকার রয়েছে, সেটাকে খর্ব করার চেষ্টা চলছে। এবং সেটার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই মানুষ করছে। সেটার বিরুদ্ধে আমরাও আমাদের যা যা লড়াই, আমরা করব।
আমি যদি আরও একটা প্রসঙ্গে যাই, আমাদের আসন্ন নির্বাচনে যে কেন্দ্রীয় বাহিনী আসছে তাদের বিরুদ্ধে নাকি FIR করা যাবে না। তাহলে তারা নির্বিচারে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার করতে পারে? এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনও FIR করা যাবে না। কিন্তু সেটা কী কাম্য? আর এইগুলো নিয়ে কি প্রতিবাদ করা যাবে না? এগুলো রইল আমার প্রশ্ন হিসাবে।
আমার আরও একটি প্রশ্ন রয়েছে। মাননীয় শুভেন্দু অধিকারী ও তাঁর যে সমস্ত অনুগামীরা রয়েছেন, তাঁরা তো এই এসআইআর হওয়ার আগে চিৎকার করেছিলেন যে ১ কোটি রোহিঙ্গা আছে। আমরা তাঁদের কাছে প্রশ্ন করতে চাইছি যে এসআইআরে এতজন মানুষের নাম বাদ পড়ছে, কোথায় রোহিঙ্গা? কারা রোহিঙ্গা? কাদের দিকে ইঙ্গিত করলেন? তাহলে যাঁদের নাম বিচারাধীন ছিল, এখন ডিলিট হয়েছে। তাহলে কি যাঁদের নাম বাদ গেল, তাঁদের রোহিঙ্গা বলে দগিয়ে দেওয়া হচ্ছে? এই যে বাংলায় ঘৃণার রাজনীতি করা হচ্ছে, ঘৃণার চাষ করা হচ্ছে, এই যে আমাদের মধ্যে যে সন্দেহটা বা সংশয়টা ঢুকিয়ে দেওয়া হল, যে মানুষগুলোকে দগিয়ে দেওয়া হল, সেইগুলো কি এত সহজে মিটে যাবে? সেই প্রশ্নগুলো রইল।
আরও একটা প্রশ্ন রইল। খুবই বেদনাদায়ক ভাবে আমি এটা জিজ্ঞাস করছি। মাননীয় শুভেন্দু অধিকারীকে যে প্রশ্ন করলেন না, কোথায় গেল রোহিঙ্গা? তাহলে ওঁর কাছে কেন প্রশ্ন করা হচ্ছে না? তার সঙ্গে আমি আরও একটা কথা বলতে চাই। যে জ্ঞানেশ কুমার, প্রেস কনফারেন্স করে বলেছিলন, ২০০২ সালে যাঁদের নাম আছে, তাঁদের কোনও সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে না। যাঁদের বাবা-মায়ের নাম আছে, তাঁদেরও কোনও সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে না। কিন্তু আদপে তো সেটা হল না। আদপে তো ২০০২ সালের তালিকায় নাম আছে জাঁদফয়ের, তাঁদের অনেকের নামই বিচারাধীন হল, ডিলিটেড হল। তাহলে উনি এমন একটা মিথ্যা কথা কেন বলেছিলেন। এই প্রশ্নও রইল, কেন কমিশনকে কাঠগড়ায় তোলা হবে না।
কিন্তু দিনের শেষে সাধারণ মানুষই ডিলিটেড হচ্ছেন। তাঁদের অধিকারগুলোই খর্ব হচ্ছে। এবং অদ্ভুত ভাবে আরও একটা জিনিস সত্য। এই যে আমাদের রাজ্যের যে শাসক দল, তৃণমূল। তারা অদ্ভুত ভাবে, খুবই যথাযথ ভাবে শো অফের স্টান্ট করে দেখালেন। বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন প্রতিবাদ করলেন। কিন্তু আসল জায়গাগুলোয় তাঁরা ফাঁক দিয়ে গেলেন। যখন এসআইআর করা হপল, তখন যত কর্মীর প্রয়োজন ছিল, রাজ্য থেকে ততজন কর্মী দেওয়া হয়নি। কেন দেওয়া হয়নি? প্রশ্নটা রইল। পর্যাপ্ত কর্মী না থাকায় BLO-রাও নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। সেখান থেকে দাঁড়িয়ে কোথাও তাঁদের উপর অমানুষিক চাপ পড়েছে। আর কোথাও গিয়ে নির্বাচন কমিশন তো আদালতে বলার সুযোগ পেয়ে গেল যে রাজ্য যথাযথ কর্মী দেয়নি বলেই এমন ভুল। ফলে, আমার এই প্রশ্নটা তাদের প্রশ্নটা তাদের উদ্দেশ্যেও রইল। তাহলেকি এটা স্টান্টবাজি ছিল? তাহলে কি এটা আসলে আপনারা করতে চাননি। আসলে কি ইচ্ছাকৃতভাবে এই কাজটা করা হয়েছে যাতে প্রান্তিক মানুষের নাম বাদ যায়? যাতে গরীব খেটে খাওয়া মানুষদের নাম বাদ যায়। এই বাংলাকে রক্ষা করার দায়িত্ব তো ছিল আপনাদের উপর। আপনারা করলেন না কেন? নির্বাচনের ঘণ্টা বেজে গিয়েছে। সেখানে দাঁড়িয়ে এখনও কেন সেই কাজ করা হল না। এই প্রশ্নটাও আমার রইল। এবং আর একটা জিনিস আম বলতে চাই। সামাজিক ভাবে মেয়ের পিছিয়ে রয়েছে। এবং প্রান্তিক অঞ্চলে মেয়েরা আরও বেশি পিছিয়ে পড়া। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের কাগজ থাকে না। তাহলে কি তাঁদের দায়িত্ব সরকার নেবে না? আমরা তো রোজই খবর পাচ্ছি কীভাবে মহিলার অত্যাচারিত হচ্ছেন। তাহলে তাঁদের অধিকার রক্ষা কারা করবে? তাঁদের দায়িত্ব কারা নেবে। সেই প্রশ্ন রইল।"
