কলকাতা: গণনা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। তবে তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে যে ধস নেমেছে, তা স্পষ্ট। বেলা ১২টা নাগাদ বিজেপি এগিয়ে ১৭২ আসনে। ১০১ আসনে এগিয়ে তৃণমূল। নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে যে তথ্য় মিলেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি-র ভোট বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। ৭ শতাংশ ভোট কমেছে তৃণমূলের। বিজেপি-র ভোট ৭ শতাংশ বেড়ে ৩৮ থেকে ৪৫.০৩ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছে। তৃণমূলের ভোট ৭ শতাংশ কমে ৪৮ থেকে কম হয়েছে ৪১.৬২ শতাংশে। (Reason for declining Trend of TMC)

Continues below advertisement

পশ্চিমবঙ্গে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে গেরুয়া হাওয়ার দাপট থাকলেও, ভোটবাক্সে এত বড় পরিবর্তন ঘটবে, তা আঁচ করতে পারেননি রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও। এমনকি ২০০-র বেশি আসনে জয় নিশ্চিত বলে শনিবারও দাবি করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। (TMC News) তাহলে কি দলের ভোটব্যাঙ্কে ধস আঁচ করতে পারেননি তাঁরা? নাকি দলকে চাঙ্গা রাখতেই ওই সংখ্য়া পেশ করেন? তৃণমূলের ভোটব্য়াঙ্কে এই ধস নামলই বা কেন? বিগত কয়েক বছরের ঘটনাবলীকে সামনে রেখে এর কিছু কার্যকারণ চিহ্নিত করা গিয়েছে---

১) দুর্নীতি: পার্থ চট্টোপাধ্যাকে দিয়ে শুরু হয়েছিল। তাঁর বান্ধবী অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকে ৫০ কোটি টাকা, কাঁড়ি কাঁড়ি সোনার গয়না পাওয়া গিয়েছিল। চাকরি চলে গিয়েছিল ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকার।  শিক্ষা দুর্নীতি যেমন রয়েছে, তেমনই দুর্নীতিতে রাশ টানা বা স্পষ্ট বার্তার অভাব। রেশন দুর্নীতিতে জেল খেটে ফেরা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক এখনও অভিযোগ থেকে মুক্ত হননি। তাঁকে ফের প্রার্থী করা হয় এবার। এমন আরও অনেকেই টিকিট পেয়েছেন।

Continues below advertisement

২) আইন-শৃঙ্খলা: আর জি কর হাসপাতালে চিকিৎসক পড়ুয়ার ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনাও প্রভাব ফেলেছে। সেই ঘটনার ক্ষত যেমন রয়ে গিয়েছে, তেমনই মানুষের মধ্যে বদ্ধপরিকর ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আর জি কর মামলায় বিচার হয়নি। 

৩) কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থতা: যতই বড় বড় সাংবাদিক বৈঠক হোক, যতই ফি বছর শিল্প সম্মেলন হোক, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যে, মানুষের চোখের সামনে বড় শিল্প, ভারী শিল্প আসেনি। ফলে কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। 

৪) পরিবারতন্ত্র ও স্বজনপোষণ: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিজেপি স্বজনপোষণ এবং পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ তুলে আসছে বরাবরই। এবারের প্রার্থিতালিকাতেও সেই ছায়া স্পষ্ট।  রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এমনকি দুর্নীতিতে অভিযুক্তদের পুনর্বাসন দেওয়াও ভাল ভাবে নেননি অনেকে।

৫) বিরোধীমুক্ত রাজনীতি করার চেষ্টা: রাজ্য রাজনীতিকে বিরোধী মুক্ত করে, গণতান্ত্রিক পরিসরকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর করে দেওয়ার অভিযোগে লাগাতার বিদ্ধ হতে হয়েছে তৃণমূলকে। 

আরও পড়ুন: তৃণমূল কি ১০০ ছুঁতে পারবে? ব্যবধান বাড়িয়েই চলেছে বিজেপি

৬) যা ইচ্ছে তা করার মনোভাব:  রাজনৈতিক সৌজন্যের অভাব, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মিথ্যে মামলার ভূরি ভূরি নজির রয়েছে।

৭) ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকা: সরকার এবং দলকে এক করে ফেলা। পুলিশকে স্বাধীন ভাবে কাজ না করতে দেওয়া। দলদাসদের গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং দেওয়া। 

৮) তোষণের রাজনীতি: শুধুমাত্র বিরোধীদের অভিযোগ নয়। তোষণের রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মের কার্ড খেলাও তৃণমূলের কাল হয়েছে বেল মনে করছেন অনেকেই।

আরও পড়ুন: পাঁচ জেলায় একটি আসনেও এগিয়ে নেই তৃণমূল, ‘একাধিক জায়গায় খাতা খুলতে পারবে না’, বলেছিলেন নরেন্দ্র মোদি

৯) ঔদ্ধত্য: উচ্চস্তর থেকে নিম্নস্তর পর্যন্ত এই ঔদ্ধত্য দেখা গিয়েছে। পাড়ার তৃণমূল নেতারাও কম যাননি। কাউকে পরোয়া না করার মনোভাব দেখা গিয়েছে যথেষ্ট।

১০) বিজেপি-র খেলা: সংখ্যালঘু ভোট দেবে না ধরে নিয়েই এবারে লড়াইয়ে নেমেছিল বিজেপি। সেই সঙ্গে অনুপ্রবেশ এবং সংখ্যালঘু তোষণকে হাতিয়ার করে তৃণমূলের বিরুদ্ধে নেমে পড়ে, যার মোকাবিলা করতে পারেনি তৃণমূল। দিঘায় জগন্নাথ মন্দির করে, মহাকাল মন্দিরের কথা বলে হিন্দুত্ব নিয়ে বিজেপি-কে টেক্কা দিতে ব্যর্থ তৃণমূল।

১১) মানুষের রায়: সরাসরি তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন সাধারণ মানুষ। বিজেপি-র পক্ষে ভোট নয়, তৃণমূলের বিরোধিতা করতেই ভোট দিয়েছেন দলে দলে।