কলকাতা : ক্যান্সার। চিকিৎসাশাস্ত্রে অগ্রগতি হয়েছে অনেক। প্রতিনিয়ত নানা গবেষণায় উঠে আসছে আশাব্যাঞ্জক তথ্য। তবু যেন ভয় যায় না। চিকিৎসাশাস্ত্র প্রতিদিন যতটাই উন্নত হচ্ছে, যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কর্কটরোগের উদ্বেগ। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ এই রোগে মারা যাচ্ছে। ২০২৩ সালের তথ্য অনুসারে, সারা বিশ্বে ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছন প্রায় ৯৬ লক্ষ থেকে ১ কোটি মানুষ । গড়ে প্রায় ২৬,৩০০ জন ক্যান্সারআক্রান্তের মৃত্যু হয়েছে । পরিসংখ্যানটি এই রোগের ভয়াবহতা বোঝাতে যথেষ্ট। এই পরিস্থিতিতে সকলের একটাই প্রশ্ন আশার আলে কি একেবারেই নেই ? আছে। বলছেন চিকিৎসকরাই। কর্কটরোগ ঠিক সময় নির্ণয় করা গেলে এখন তা নিয়ন্ত্রণে রাখা বা সারিয়ে তোলার হার আগের থেকে অনেকটাই ভাল হচ্ছে। সেই সঙ্গে আশার আলো দেখাচ্ছে,কম যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসাপদ্ধতির প্রয়োগও। বিশ্বজুড়ে ক্যান্সারের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এর প্রতিরোধ সম্পর্কে ধ্যানধারণা দিতেই প্রতি বছর ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ক্যান্সার দিবস পালিত হয় ।
সেই সঙ্গে আশার সঞ্চার করছে ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের ভ্যাকসিন সম্পর্কে গবেষণা। সেই গবেষণায় অগ্রগতিও খুবই আশাব্যাঞ্জক জায়গায় দাঁড়িয়ে। তা যদি আবিষ্কার হয়, তাহলে বহু মানুষ বেঁচে থাকার নতুন আলো দেখতে পাবেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা, ফার্মাস্যুটিক্যাল জায়ান্ট জিএসকে-এর সহযোগিতায়, এমন একটি টিকা তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছেন যা শরীরে 'অজানা ক্যান্সার' কোষ সনাক্ত করতে পারে রোগটি হওয়ার ২০ বছর আগে থেকেই । অন্যদিকে আবার ক্যানসারের ভ্যাকসিন আবিষ্কার নিয়ে রাশিয়ার দাবি ঘিরেও চড়ছে প্রত্যাশা। এই মারণরোগকে এবার নাকি আটকে দেওয়া যাবে বলে দাবি করেছে রাশিয়া। রাশিয়ায় ক্যানসার রোগীদের বিনামূল্যে দেওয়া হতে পারে বলেও আশা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। তবে ভবিষ্যতের কথা তো ভবিষ্যতই বলবে। এই মুহূর্তে ক্যান্সার চিকিৎসায় ইতিবাচক কী কী বার্তা আছে ? জানালেন পিয়ারলেস হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট অঙ্কোলজিস্ট ড. মধুছন্দা কর (Clinical Director, Department of Oncology, Peerless Hospital)।
চিকিৎসক জানালেন, এখন ক্যান্সার মানেই মৃত্যু নয়। এক তৃতীয়াংশ ক্যান্সার কিন্তু সারিয়ে তোলা যায়। ক্যান্সারকে ক্রনিক ডিসিজের মতো করে চিকিৎসা করা হয়। ওষুধপত্র ও চিকিৎসা নিয়ে একটা মোটামুটি ভালভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন আক্রান্তরা। আর বাকিদের ক্ষেত্রে উপসর্গগুলির উপশম করা যাবে। প্রথামিক অবস্থায় এগিয়ে এলে আরও অনেক বেশি হারে ক্যান্সার রোগী সেরে উঠতে পারেন। যেমন স্তন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে চিকিৎসাশাস্ত্র এতটাই এগিয়ে গিয়েছে যে, ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে রোগী সেরে উঠতে পারেন। তবে দরকার প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়া। তাই নিজের সচেতনতা তৈরি দরকার আর ডাক্তারের কাছে সমস্যাটা নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ইতস্তত করলে চলবে না। এখন স্ক্রিনিং পদ্ধতিও অনেক উন্নত। এছাড়া সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, হরমোন থেরাপির মতো চিকিৎসা নিয়ে তিনি ভালভাবে বাঁচতে পারবেন, জীবনের ছন্দে থাকতে পারবেন। যাঁরা মনে করেন স্তন ক্যান্সার মানেই স্তন বাদ দেওয়া, সেটা কিন্তু নয়। এখন কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই ব্রেস্ট বাদ না দিয়েও ক্যান্সারের চিকিৎসা করা যায়। স্বাভাবিক জীবনে ফেরা যায়। এমন উদাহরণও ভুরি ভুরি। তাই নেতিবাচকতা পার হয়ে ইতিবাচক ভাবনা ভাবার সময় এসেছে।
এছাড়াও ড. মধুছন্দা কর জানাচ্ছেন, আগেকার বেসিক কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি বা হরমোন থেরাপির থেকে এখন অনেক এগিয়ে গেছে চিকিৎসা পদ্ধতি। এখন আর কেমোথেরাপি মানেই খালি বমি করা, দুর্বল হয়ে পড়া, চুল উঠে যাওয়া , শয্যাশায়ী হয়ে যাওয়া নয়। বরং আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি ও সাপোর্টিভ ওষুধের সাহায্যে এই সব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। একজন রোগী ডে-কেয়ারে এসে ৫-৬ ঘণ্টা হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন। তারপর আবার দিন তিনেক ভাবেই স্বাভাবিক ভাবে নিজের কাজে যোগ দিতে পারেন। তাই অন্ধকার সময়টা অনেকটাই পেরিয়ে আসা গিয়েছে। রেডিওথেরাপিতেও এসেছে বিবর্তন, যা অনেক কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেই প্রয়োগ করা সম্ভব।
এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একবার ক্যান্সার থেকে সেরে ওঠার পরও পরে অন্য কোথাও ক্যান্সার দেখা যায়। আগে এই পরিস্থিতিটা সাঙ্ঘাতিক হতাশাজনক হত। এখন উন্নত ইমিউনোথেরাপির গুণে সেই সব ক্যান্সারও বাগে আনা সম্ভব। ফিফথ লাইন অবধিও ক্যান্সারের চিকিৎসা করা যায়। নানারকম টার্গেট থেরাপি , ইমিউনো থেরাপির গুণে ক্যান্সারের চিকিৎসা আটকানো যায়।
তাই পরিস্থিতিটা কঠিন ঠিকই, কিন্তু হাতের বাইরে নয়। চিকিৎসাশাস্ত্রের গুণে একজন ক্যান্সার রোগী চিকিৎসকের পরামর্শে থেকে আগের থেকে অনেকটাই দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন পেতে পারেন। আতঙ্কে দিন-রাত্রি শেষ না হলেও, সুড়ঙ্গ শেষে আশার আলোটা বেশ স্পষ্ট।