কলকাতা: ভাত খেতে হলে হাঁড়িতে জল বসাতে হবে, চাল দিতে হবে, তারপর অপেক্ষা করতে হবে—এটাই তো চিরাচরিত নিয়ম। কিন্তু ভারতেরই এক রাজ্যে এমন এক বিশেষ ধরনের চাল রয়েছে, যা খাওয়ার আগে গ্যাসে বসিয়ে রান্না করার প্রয়োজনই হয় না! শুধু জলে ভিজিয়ে রাখলেই নরম হয়ে যায় চাল। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই অসমের ঐতিহ্যবাহী Komal Saul, বা Komal Chaul-এর বিশেষত্ব।

Continues below advertisement

কী এই Komal Saul?

অসমের এই ঐতিহ্যবাহী চাল তৈরি হয় Chokuwa নামের এক বিশেষ ধরনের ধান থেকে। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এতে amylose-এর পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। চালটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় parboil বা সেদ্ধ করে শুকিয়ে নেওয়া হয়। ফলে পরে শুধু জল শোষণ করিয়েই তা নরম করে খাওয়া সম্ভব হয়।

Continues below advertisement

অর্থাৎ বিষয়টি এমন নয় যে কাঁচা চাল কোনও জাদুবলে রান্না হয়ে যাচ্ছে। বরং বিশেষ প্রক্রিয়াজাতকরণের কারণেই চালটি রান্না ছাড়াই খাওয়ার উপযোগী হয়ে ওঠে।

কীভাবে তৈরি হয় ‘রান্না ছাড়া’ ভাত?

সাধারণ চালের মতো Komal Saul-কে সরাসরি হাঁড়িতে বসিয়ে রান্না করতে হয় না। গবেষণার উল্লেখ অনুযায়ী, গরম জলে প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখলেই চাল যথেষ্ট নরম হয়ে যায়। প্রচলিত পদ্ধতিতে ঠান্ডা বা হালকা গরম জলও ব্যবহার করা হয়।

জল শোষণ করার পর চালের দানা নরম হয়ে যায় এবং সেটি সরাসরি খাওয়ার উপযোগী হয়।

অসমে কীভাবে খাওয়া হয় এই চাল?

Komal Saul শুধু অদ্ভুত এক খাবার নয়, অসমের খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গেও এর গভীর যোগ রয়েছে। এটি সাধারণত ‘জলপান’ (Jolpaan) নামে পরিচিত অসমের ঐতিহ্যবাহী প্রাতরাশ বা হালকা খাবারের অংশ হিসেবে খাওয়া হয়।

ভিজিয়ে রাখা চালের সঙ্গে যোগ করা যায়—

দইগুড়দুধকলাসর্ষের তেলপেঁয়াজআচার

এর মধ্যে দই ও গুড়ের সঙ্গে Komal Saul খাওয়ার চল বিশেষভাবে জনপ্রিয়। ফলে অল্প সময়েই তৈরি হয়ে যায় পেট ভরানো একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার।

কেন এমন চালের প্রয়োজন হয়েছিল?

আজকের দিনে রান্না ছাড়া খাবার মানেই অনেকের কাছে ‘ইনস্ট্যান্ট ফুড’। কিন্তু Komal Saul-এর গল্প তার চেয়ে অনেক পুরনো।

অসমে কৃষক ও এমন মানুষদের জন্য এই চাল অত্যন্ত সুবিধাজনক ছিল, যাঁদের দ্রুত খাবার তৈরি করতে হত এবং সবসময় রান্নার জন্য সময়, জ্বালানি বা সুযোগ থাকত না। শুধু জলে ভিজিয়েই খাওয়া যায় বলে এটি হয়ে উঠেছিল সহজ ও ব্যবহারিক খাবার।

শুধু খাবার নয়, অসমের ঐতিহ্য

Komal Saul-এর বিশেষত্বের স্বীকৃতি মিলেছে Geographical Indication বা GI Tag-এর মাধ্যমেও। এই স্বীকৃতি অসমের সঙ্গে এই ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্যের বিশেষ সম্পর্ক এবং তার সাংস্কৃতিক ও কৃষিগত গুরুত্বকে তুলে ধরে।

আজ যখন দ্রুত তৈরি খাবারের চাহিদা বাড়ছে, তখন বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ‘soak-and-eat’ খাবারটিও নতুন করে নজর কাড়ছে।

ভাবুন তো—হাঁড়িতে জল ফুটল না, গ্যাস জ্বলল না, তবু ভাত তৈরি!

তবে এর পেছনে কোনও জাদু নেই। রয়েছে অসমের প্রাচীন খাদ্যজ্ঞান, বিশেষ ধানের জাত এবং এক অভিনব প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি। আর সেই কারণেই Komal Saul আজও ভারতের অন্যতম কৌতূহলোদ্দীপক ঐতিহ্যবাহী খাবার।