নয়াদিল্লি: আমেরিকায় দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে শিক্ষামন্ত্রক তুলে দেওয়ার ব্য়বস্থা করেছেন দেশের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার দেশের ঐতিহ্যশালী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকেও বজ্রআঁটুনিতে বেঁধে ফেলতে উদ্যোগী হলেন তিনি। কলম্বিয়া, ব্রাউনের পর এবার শিক্ষাখাতে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির বরাদ্দ বন্ধ করে দিলেন ট্রাম্প। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার হার্ভার্ডের জন্য় গ্রান্ট বাবদ যে ২ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছিল, তা বাজেয়াপ্ত করার কথা জানিয়েছে হোয়াইট হাউস, ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১৭ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা। পাশাপাশি, আরও ৬০ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তিও স্থগিত করা হয়েছে, ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৫ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। (Harvard University Defies Trump)

হার্ভার্ড ট্রাম্পের দাবিদাওয়া মানতে অস্বীকার করেছে। বিবৃতি প্রকাশ করে জানিয়েছে, 'যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, বেসরকারি ইউনিভার্সিটিতে কী পড়ানো হবে, কাকে ভর্তি নেওয়া হবে, কাকে নিয়োগ করা হবে, কী কী বিষয় থাকবে, তা কোনও সরকার ঠিক করে দিতে পারে না'। আর হার্ভার্ডের পাশে দাঁড়িয়েছেন আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লেখেন, 'উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য উদাহরণ সৃষ্ট করল হার্ভার্ড---শিক্ষাক্ষেত্রের স্বাধীনতা হরণের বেআইনি চেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করেছে ওরা। একই সঙ্গে হার্ভার্ডের সমস্ত শিক্ষার্থী যাতে বুদ্ধিদীপ্ত পরিবেশে থেকে তর্কবিতর্কে অংশ নিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা থেকে উপকৃত হতে পারেন, তার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ করেছে। আশা করি অন্য প্রতিষ্ঠানগুলিও এটি অনুসরণ করবে'। (Donald Trump)

হার্ভার্ড অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি উদাহরণ স্থাপন করেছে - একাডেমিক স্বাধীনতা হরণ করার একটি বেআইনি এবং হাতিয়ারের প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে, একই সাথে হার্ভার্ডের সমস্ত শিক্ষার্থী বৌদ্ধিক অনুসন্ধান, কঠোর বিতর্ক এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিবেশ থেকে উপকৃত হতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছে। আসুন আশা করি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলিও এটি অনুসরণ করবে।

দ্বিতীয় বার আমেরিকায় ক্ষমতায় আসার তিন মাসের মধ্যেই দেশের তাবড় ইউনিভার্সিটিতে বেশ কিছু বিধিনিয়ম কার্যকর করতে উদ্যোগী হয়েছেন ট্রাম্প। গত কয়েক মাস ধরে আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্যালেস্তাইনের সমর্থনে সরব হয়েছেন পড়ুয়ারা। ইজরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে আমেরিকা প্রকৃতপক্ষে প্যালেস্তাইনে গণহত্যায় মদত জোগাচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে। আর তাতেই ইউনিভার্সিটিতে কড়া বিধিনিষেধ চালু করতে উদ্যোগী হয়েছে ট্রাম্প সরকার। সেই মতো গত সপ্তাহে হার্ভার্ডেও একগুচ্ছ দাবিদাওয়া পাঠানো হয়। 

ট্রাম্প অভিযোগ করেন, উচ্চশিক্ষায় বর্ণবৈষম্য চালু রয়েছে। শ্বেতাঙ্গ পড়ুয়াদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করা হয়। ইউনিভার্সিটিতে যে বৈচিত্র, সাম্য় এবং সকলের অন্তর্ভুক্তির নীতি চালু রয়েছে, তার পরিবর্তে বিদেশি পড়ুয়াদের ভর্তি নেওয়ার ক্ষেত্রে বাছবিচারের উপর জোর দেন ট্রাম্প। বিদেশি পড়ুয়ারা সন্ত্রাসী সংগঠনকে সমর্থন করেন কি না, তাঁরা ইহুদিবিদ্বেষী কি না, ভর্তি নেওয়ার আগে তা যাচাই করতে হবে। পৃথিবীর বঞ্চিত, শোষিত দেশের পড়ুয়াদের বিশেষ সুযোগ দেওয়ার যে রীতি রয়েছে আমেরিকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে, তার পরিবর্তে মেধাকে প্রাধান্য দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেন ট্রাম্প। 

হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়, 'এই ধরনের অবৈধ নীতি আমেরিকার নাগরিক অধিকারের মূল নীতি এবং চেতনাকেই শুধু লঙ্ঘন করে না, আমাদের জাতীয় ঐক্যও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ এই ধরনের নীতির জেরে পরিশ্রম, মেধাকে অস্বীকার করে। এতে আমেরিকার মূল্যবোধকে অসম্মান করা হয়। এই ব্যবস্থা পরিচয় ভিত্তিক লুণ্ঠনের সুযোগ তৈরি করে দেয়'।

ক্যাম্পাসে মাস্ক ব্যবহার করা যাবে না বলেও জানানো হয় দাবিপত্রে। এতে প্রতিবাদ, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া পড়ুয়াদের শনাক্ত করা যায় না, তাঁরা পরিচয় লুকনোর সুযোগ পেয়ে যান বলে জানানো হয়। প্যালেস্তাইনপন্থীদের ধরপাকড় করতেই এই নির্দেশ দেওয়া হয় বলে মনে করছেন আমেরিকার শিক্ষাবিদদের একাংশ। ইহুদি বিদ্বেষ নিয়ে মার্চ মাসে ৬০টি কলেজ এবং ইউনিভার্সিটির বিরুদ্ধে তদন্তও শুরু করে ট্রাম্প সরকার। ক্যাম্পাসে 'অতি জাগ্রত আদর্শে' দীক্ষিত পড়ুয়াদের নিয়েও অসন্তুষ্ট তারা। প্যালেস্তাইন নিয়ে বিক্ষোভের জেরে ক্যাম্পাসে ইহুদি বিদ্বেষ দূরীকরণে বিশেষ 'টাস্ক ফোর্স' তৈরির কথাও জানানো হয়। 

আমেরিকার সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত, কলম্বিয়া, ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি, হার্ভার্ড, জন হপকিন্স, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি, নর্থ-ওয়েস্টার্ন, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া ইন বার্কলি অ্যান্ড লস অ্যাঞ্জেলস, ইউনিভার্সিটি অফ মিনেসোটা, ইউনিভার্সিটি অফ সাদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া এই তালিকায় রয়েছে। ইতিমধ্যেই কলম্বিয়ার ৪০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান আটকে দিয়েছে ট্রাম্প সরকার, ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৩ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ৪ মিলিয়ন ডলার, কর্নেল ইউনিভার্সিটির ১ বিলিয়ন ডলার, নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ৭৯০ মিলিয়ন ডলার অনুদান আটকানো হয়েছে। জন হপকিন্সের ২০০০ কর্মীকে ছাঁটাই করতে বলা হয়েছে।