দুই মাসের যুদ্ধবিরতির পর ফের উত্তপ্ত পশ্চিম এশিয়া। সোমবার গভীর রাতে ইজরায়েলের দিকে বৃষ্টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে হামলা চালাল ইরান। আকাশজুড়ে একের পর এক আগুনের রেখা। আগুনের ঝলক। মুহূর্তে বেজে ওঠে সাইরেন। আতঙ্কে লক্ষ লক্ষ মানুষ ছুটে যান বাঙ্কার ও নিরাপদ আশ্রয়ে। ভয়াবহ পরিস্থিতি ইজরায়েলের বিভিন্ন শহরে।
ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র মাঝআকাশেই প্রতিহত করা গিয়েছে। যদিও দেশের উত্তরাংশে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছে বলে রিপোর্ট সংবাদ মাধ্যমে। পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর সেনার তরফে জানানো হয়, সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে বেরোতে পারেন।
ইরানের এই হামলার তীব্র নিন্দা করেছে ইজরায়েল।তাদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফরিন বলেন, “ইরান বড় ভুল করল এটা।” ইজরায়েলের সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এয়াল জামির স্পষ্ট জানিয়ে দেন, নির্দেশ পেলেই কড়া জবাব দেওয়া হবে। অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইজরায়েলের তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর নিশ্চিত করেছে। সম্ভাব্য পাল্টা হামলার আশঙ্কায় পশ্চিমাঞ্চলের আকাশসীমাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই বেইরুটর দক্ষিণ উপকণ্ঠে হামলা চালায় ইজরায়েল। সেই ঘটনার জবাব দিতেই এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ৮ এপ্রিল কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর এই প্রথম সরাসরি বড়সড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটল। ফলে নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। BBC-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে সংঘাত ক্রমশ তীব্র আকার নিয়েছে। ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার দিনই ইসরায়েল ঘোষণা করে যে তারা মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে লেবাননে ১০০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। লেবাননের কর্মকর্তাদের দাবি, এই হামলায় ৩০০-রও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনগুলির একটি। ইরান এই ঘটনাকে যুদ্ধবিরতির ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ বলে আখ্যা দেয়। এরপর ১৩ এপ্রিল পাকিস্তানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলিকে লক্ষ্য করে নৌ অবরোধ শুরু করে। ১৬ এপ্রিল ট্রাম্প ঘোষিত ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং তা ১০ দিন স্থায়ী হওয়ার কথা ছিল। পরদিন ১৭ এপ্রিল ইরান জানায়, যুদ্ধের সময় বন্ধ থাকা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালী সাময়িকভাবে জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে, যদিও চলমান মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে পরে তা ফের বন্ধ করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। ২৩ এপ্রিল ওয়াশিংটনে লেবানন-ইসরায়েল দ্বিতীয় দফার আলোচনার কথা ছিল এবং ট্রাম্প দাবি করেন, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও তিন সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে। ২৪ এপ্রিল মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের পাকিস্তানে ইরানের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা থাকলেও ট্রাম্প সেই সফর বাতিল করেন এবং দাবি করেন, “সব ক্ষমতা এখন আমেরিকার হাতেই।” এর জবাবে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, আমেরিকা কূটনীতি নিয়ে সত্যিই আন্তরিক কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এরপর ৩ মে ট্রাম্প ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ঘোষণা করেন, যার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে আটকে পড়া জাহাজগুলিকে নিরাপদে পথ দেখানো। যদিও ৫ মে নাগাদ তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে আপাতত এই প্রকল্প স্থগিত রাখা হবে। ১২ মে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, ইরান-আমেরিকার যুদ্ধবিরতি কার্যত ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে। একই সময়ে ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ গালিবফ হুঁশিয়ারি দেন, ইরানের সেনাবাহিনী যেকোনও আগ্রাসনের জবাব দিতে প্রস্তুত। ২৪ মে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি নিয়ে ‘অনেকটাই আলোচনা’ হয়েছে এবং শীঘ্রই তার বিস্তারিত ঘোষণা করা হবে, যদিও ইরানের বিদেশমন্ত্রকের পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়, অবস্থানের মিল মানেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে চুক্তি হওয়া নয়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ৬ জুন, যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হামলা - পাল্টা হামলা শুরু হয়। মার্কিন বাহিনী ইরানের ড্রোন ও রাডার ঘাঁটিতে হামলা চালায়, আর ইরান মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এর ঠিক একদিন পর, ৭ জুন, ইরান ইজরায়েলের দিকে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর এই হামলাকে ‘এক সপ্তাহব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন অভিযানের সূচনা’ বলে বর্ণনা করেছে। দক্ষিণ বেইরুটে হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে ইজরায়েলের হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের এই পাল্টা আক্রমণ শুরু হয়।
