নয়া দিল্লি: ছটপুজোর আগে যমুনার জল কতটা পরিষ্কার? তা নিয়েই এবার নতুন করে রাজনৈতিক তরজা। দিল্লির যমুনায় নেমে স্নান, এমনকী নদীর জল দিয়ে আচমন করে বিজেপি সাংসদ মনোজ তিওয়ারির দাবি, আগের তুলনায় অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে যমুনা। তাঁর কথায়, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত দেড় বছরে নদীর দূষণ প্রায় অর্ধেক কমেছে। কিন্তু সাংসদের এই দাবির সঙ্গে মিলছে না দূষণ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান। NDTV-র ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যমুনার একাধিক অংশে এখনও দূষণের মাত্রা নির্ধারিত সীমার অনেক উপরে। বিশেষ করে জৈব দূষণ এবং মলজাতীয় ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
যমুনায় ডুব দিয়ে কী বললেন মনোজ তিওয়ারি?
বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব দিল্লির সাংসদ মনোজ তিওয়ারি সোনিয়া বিহার ঘাটে যমুনায় নেমে স্নান করেন। শুধু তাই নয়, নদীর জল দিয়ে আচমনও করেন তিনি। এরপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে বিরোধীদের কটাক্ষ করেন বিজেপি সাংসদ। তাঁর বক্তব্য, এটি কোনও সাজানো ভিডিও নয়, বাস্তব ছবি। দিল্লির যমুনায় তিনি নিজে স্নান করেছেন এবং নদীর জল পানও করেছেন।
তিওয়ারির দাবি, গত দেড় বছরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আশীর্বাদ এবং মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার নেতৃত্বে যমুনা পরিষ্কারের কাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তাঁর কথায়, নদীর প্রায় অর্ধেক অংশ পরিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। আগামী তিন বছরের মধ্যে বাকি কাজও সম্পূর্ণ হবে।
যমুনার কয়েকটি অংশে পরিযায়ী পাখিদের উপস্থিতিকেও নদীর পরিবেশের উন্নতির প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর যুক্তি, নদীর জল পরিষ্কার না হলে ওই পাখিরা সেখানে আসত না। এমনকী, জলে কুমির থাকার প্রসঙ্গ টেনে তাঁর মন্তব্য, পরিষ্কার জলেই কুমিরের দেখা মেলে।
পাল্টা চ্যালেঞ্জ আপের, কোথায় দূষণ সবচেয়ে বেশি?
বিজেপি সাংসদের এই দাবির পাল্টা জবাব দিতে দেরি করেনি আম আদমি পার্টি। দিল্লি আপের সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজের দাবি, পল্লা থেকে ওয়াজিরাবাদ পর্যন্ত যমুনার প্রায় ২৬ কিলোমিটার অংশ বরাবরই তুলনামূলক পরিষ্কার। কিন্তু ওয়াজিরাবাদ পেরিয়ে দিল্লির নিকাশি নালার জল নদীতে মিশতে শুরু করলেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
তাঁর বক্তব্য, যমুনার দূষণের বড় কারণ নিকাশি নালার অপরিশোধিত জল। বিশেষ করে নজফগড় ড্রেনের জল নদীতে মেশার পর দূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। বিজেপি সরকারের দাবিকে রাজনৈতিক প্রচার বলেও কটাক্ষ করেছেন তিনি।
এখানেই শেষ নয়। মনোজ তিওয়ারি এবং দিল্লির জলমন্ত্রী প্রবেশ বর্মাকে কালিন্দী কুঞ্জ ঘাটে গিয়ে নদীর জল পান করার পাল্টা চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন সৌরভ ভরদ্বাজ। তাঁর দাবি, যমুনার ওই অংশের দূষণ নিয়ে প্রকৃত পরিস্থিতি সামনে আনা প্রয়োজন।
দূষণের পরিসংখ্যান কী বলছে?
রাজনৈতিক চাপানউতোরের বাইরে যমুনার জলের গুণমান নিয়ে NDTV Datafy-র বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। দিল্লি দূষণ নিয়ন্ত্রণ কমিটির (DPCC) পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, নদীর বিভিন্ন অংশে দূষণের মাত্রায় বড়সড় পার্থক্য রয়েছে। যমুনার জল কতটা দূষিত, তা বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হল বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড বা BOD। জলে থাকা জৈব বর্জ্য ভাঙতে অণুজীবের কতটা অক্সিজেন প্রয়োজন, তার হিসাব দেয় এই সূচক। BOD যত বেশি, সাধারণত জলে জৈব দূষণের মাত্রাও তত বেশি। স্নানের উপযোগী জলের ক্ষেত্রে BOD-এর নির্ধারিত মাত্রা প্রতি লিটারে ৩ মিলিগ্রাম বা তার কম। কিন্তু দিল্লির একাধিক জায়গায় সেই সীমা অনেকটাই অতিক্রম করেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পল্লায় যমুনার জলে BOD-এর মাত্রা প্রতি লিটারে ২ মিলিগ্রাম। অর্থাৎ নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু ISBT ব্রিজের কাছে সেই মাত্রা বেড়ে ৩০ মিলিগ্রাম। ITO এলাকায় BOD-এর মাত্রা ১৮ মিলিগ্রাম। অর্থাৎ ISBT-তে নির্ধারিত সীমার ১০ গুণ এবং ITO-তে ৬ গুণ বেশি। তবে কিছু ক্ষেত্রে উন্নতির ছবিও রয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ITO এলাকায় BOD-এর মাত্রা ছিল ৭০ মিলিগ্রাম। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তা কমে হয়েছে ১৮ মিলিগ্রাম। অর্থাৎ দূষণ কমেছে ঠিকই, কিন্তু এখনও স্নানের উপযোগী জলের নির্ধারিত মানের ধারেকাছেও পৌঁছয়নি।
যমুনা পরিষ্কারে ৮,৯৪১ কোটি টাকার প্রকল্প
যমুনার দূষণ কমাতে একাধিক প্রকল্পের কাজ চলছে দিল্লিতে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নদী পরিষ্কারের লক্ষ্যে ৮,৯৪১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৩টি প্রকল্পের সূচনা করেছেন। বিজেপি সরকারের লক্ষ্য, ২০২৯ সালের মে মাসের মধ্যে দিল্লির মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া যমুনার অংশ পরিষ্কার করা। দিল্লির জলমন্ত্রী প্রবেশ বর্মাও স্বীকার করেছেন, গোটা নদী পরিষ্কার করতে আরও আড়াই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে। তাঁর বক্তব্য, পল্লা থেকে ওয়াজিরাবাদ পর্যন্ত অংশ পরিষ্কারের কাজ সম্পূর্ণ হলেও ওয়াজিরাবাদ থেকে কালিন্দী কুঞ্জ পর্যন্ত অংশে এখনও কাজ চলছে। অর্থাৎ যমুনার জলের মানে কিছুটা উন্নতি হলেও গোটা নদীকে দূষণমুক্ত করার কাজ এখনও অনেকটাই বাকি। ছটপুজোর আগে রাজনৈতিক নেতাদের দাবি-পাল্টা দাবির মধ্যেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যমুনার জল আদৌ কতটা নিরাপদ? আর সেই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না শুধু নদীতে একবার ডুব দেওয়ায়, বরং জলের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার রিপোর্টেই।
