নয়াদিল্লি: লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব জমা পড়ল। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৪সি-র আওতায় তাঁকে পদ থেকে সরানোর প্রস্তাব জমা দিল বিজেপি বিরোধী শিবির। চলতি বাজেট অধিবেশনে বিরোধীদের প্রতি স্পিকারের আচরণ, বিশেষ করে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গাঁধীর বক্তৃতায় বাধা দেওয়া এবং কংগ্রেস সাংসদদের সাসপেন্ড করা নিয়ে তীব্র আপত্তি দেখা দিয়েছে। সেই মতোই স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব জমা পড়ল। (No-confidence Motion)

Continues below advertisement

কংগ্রেসের তরফে চিফ হুইপ কে সুরেশ অনাস্থা প্রস্তাবটি জমা দিয়েছেন। বিজেপি বিরোধী শিবিরের ১১৪ জন সাংসদের সই রয়েছে প্রস্তাবে। কংগ্রেস ছাড়াও সমাজবাদী পার্টি, DMK ওই প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়েছে।  তবে তৃণমূলের সাংসদরা ওই প্রস্তাবে সই করেননি। তাদের দাবি, প্রথমেই অনাস্থা প্রস্তাবের পরিবর্তে, স্পিকারকে চিঠি লিখে, তিন দিন সময় দেওয়ার পক্ষে ছিল তারা। অন্য দিকে, কংগ্রেস সূত্রে খবর, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গাঁধী নিজেও ওই অনাস্থা প্রস্তাবে সই করেননি। বিরোধী দলনেতা হিসেবে সংসদীয় গণতন্ত্রের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতেই তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। তবে বিরোধী দলনেতা সই না করলেও অনাস্থা প্রস্তাব জমা দিতে পারেন বিরোধীরা। (INDIA Alliance)

এখনও পর্যন্ত যা খবর, বিরোধীদেেরে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। লোকসভার সেক্রেটারি জেনারেল নোটিস পেয়েছেন। বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখে, নিয়মমাফিক পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে। কংগ্রেস সাংসদ গৌরব গগৈ বলেন, "৯৪সি-র আওতায় স্পিকার ওম বিড়লার অপসারণ চেয়ে, আজ দুপুর ১টা বেজে ১৪ মিনিটে অনাস্থা প্রস্তাব জমা দিয়েছি আমরা। লোকসভার বিরোধী দলনেতাকে সংসদে কথা বলতে দেওয়া হয়নি একাধিকবার। অনেক বিরোধী দলই সেই নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।" ( Om Birla)

Continues below advertisement

অনুচ্ছেদ ৯৪সি-র আওতায় লোকসভার স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারকে অপসারণের প্রস্তাব তোলা যায়। আইন অনুযায়ী, লোকসভার সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পেলে পদ থেকে অপসারণ করা যেতে পারে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারকে। তবে প্রস্তাব বেশ হওয়ার ১৪ দিন আগে নোটিস জমা দিতে হয়। আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি লোকসভার বাজেট অধিবেষনের সমাপ্তি। পুনরায় অধিবেশন শুরু হবে ৯ মার্চ। 

স্পিকার ওম বিড়লার বিরুদ্ধে এই অনাস্থা প্রস্তাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শাসকদল বিজেপি এবং বিরোধীদের মধ্যে দূরত্ব এবং অনাস্থা যে লাগাতার গভীর হচ্ছে, এতে তা পরিষ্কার। আগেও বার বার ওম বিড়লার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীরা। তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় খোদ তাঁকে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার আর্জি জানান। তবে এবারের বাজেট অধিবেশনের গোড়া থেকেই স্পিকারের আচরণ নিয়ে ক্ষোভ ধরা পড়ে বিরোধীদের মধ্যে। 

বিশেষ করে রাহুলের ভাষণে বার বার বাধা দেওয়া, তাঁকে বলতে না দেওয়া, কংগ্রেস সাংসদদের সাসপেন্ড করা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। প্রাক্তন সেনাকর্তা মনোজ মুকুন্দ নরবণের লেখা বইয়ের সঙ্গে দেশের জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা জড়িয়ে, তাই রাহুলকে বলতে দেওয়া হোক বলে একজোটে দাবি করেন বিরোধী শিবিরের সাংসদরা। সমাজবাদী পার্টির সাংসদ অখিলেশ যাদব লোকসভায় সেই নিয়ে সওয়াল করেন। কিন্তু তার পরও শেষ পর্যন্ত ভাষণ দিতে পারেননি রাহুল। সেই নিয়ে বিরোধীরা প্রতিবাদ জানালে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও আর ভাষণ দেননি। বিরোধীদের সেই আচরণের তীব্র নিন্দা করেন কেন্দ্রের মন্ত্রীরা। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর উপর হামলা হতে পারত বলেও দাবি করেন কেউ কেউ। ওম বিড়লা জানান, তিনিই প্রধানমন্ত্রীকে ভাষণ দিতে আসতে নিষেধ করেন। কিন্তু স্পিকার কি এমন আচরণ করতে পারেন? সেই নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিরোধীরা। তাঁদের দাবি, আগেও বার বার সংসদে বিরোধীরা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন, মনমোহন সিংহকে ঘিরে ধরে চলে স্লোগানও। কিন্তু কখনও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। 

তবে এদিন যে অনাস্থা প্রস্তাব জমা পড়ল, তাতে সই করেনি বিরোধী শিবির I.N.D.I.A-তে শামিল তৃণমূল। অভিষেক বলেন, "আমরা চাই, সংসদ চলুক। সংসদ চালানোর দায়িত্ব সরকারের। বিরোধীদের কথা বলার সময় দিতে হবে। আমরা সবসময় সংযম দেখিয়েছি। আমরা মহাত্মা গাঁধী, সুভাষচন্দ্র বসু, স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে বিশ্বাসী। চেয়ারকে সম্মান করি। সর্বদা গঠনমূলক আচরণ দেখিয়েছি আমরা। পেশিশক্তি প্রদর্শন না করে চেয়ারকে একটা সুযোগ দিতে চাই আমরা। গতকালও পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দিই, তৃণমূলের সাংসদরা অনাস্থা প্রস্তাবে সই করবে। তবে আমাদের প্রস্তাব ছিল, আগে সমস্যার কথা জানিয়ে, বিরোধী শিবিরের সাংসদদের সাসপেনশন, বিরোধী দলনেতাকে কথা বলতে না দেওয়া, মহিলা সাংসদদের বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ এবং চেয়ার যে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে, তা নিয়ে চিঠি দেওয়া হোক, যাতে বিরোধী শিবিরের সব সাংসদের সই থাকবে। দু'-তিনদিন সময় দেওয়া হোক স্পিকারকে। তার পরও যদি পদক্ষেপ না করেন, সেক্ষেত্রে অনাস্থা প্রস্তাবের রাস্তা খোলাই আছে, কোনও অসুবিধা হবে না।" যদিও কংগ্রেস এবং অন্য শরিকরা সরাসরি অনাস্থা প্রস্তাব জমা দেওয়ার সিদ্ধান্তই নেয়। 

যদিও স্পিকারের সমালোচনা করা থেকে বিরত হননি অভিষেক। তিনি বলেন, "দেশগঠনে প্রত্যেক প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু বিজেপি-র সাংসদরা তাঁদের চরিত্র নিয়ে কথা বলবেন এবং তাঁদের সেটা করতে দেওয়া হবে, এটা উচিত নয়। স্পিকারকে নিরপেক্ষ হতে হবে। আমরা চাই সংসদ চলুক। কীভাবে চলবে এটা সরকারের দায়িত্ব। কাল ২টর সময় স্থগিত করে দেওয়া হল অধিবেশন, বিরোধীদের কিছু না জানিয়েই। আজ সকাল ১১টায় ফের শুরু হল। আপনি আধ ঘণ্টা স্থগিত রাখতে পারেন, এক ঘণ্টা, দু'ঘণ্টার জন্য করা যেতে পারে। একেবারে ১৮-২০ ঘণ্টার জন্য স্থগিত রাখা হল। আজ তো স্পিকার আসেনইনি। সংসদ চালানোর মানসিকতা তো থাকা চাই!"