Continues below advertisement

নয়াদিল্লি:  ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯। কাশ্মীরের পুলওয়ামা এক আত্মঘাতী হামলা কেড়ে নিয়েছিল ৪০ জন সিআরপিএফ জওয়ান রক্তে ভিজেছিল উপত্যকা। সে হামলার প্রতিশোধও নিয়েছিল ভারত বালাকোট প্রত্যাঘাতে। ৬ টা বছর পর আবার একবার রক্তগঙ্গা বইল ভূস্বর্গে। এবার আরও ভয়ঙ্কর জঙ্গি হামলা, এমন হামলা কার্যত নজিরবিহীন। ২০১৯ সালের অগাস্ট মাসে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদটি বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ অধিকার বিলোপ করা হয়। এরপর একটু একটু করে সন্ত্রাসবাদের অসুখ থেকে সেরে উঠছিল কাশ্মীর। পর্যটনের হাত ধরে হাসছিল উপত্যকা। কিন্তু সেসব কিছু তছনছ হল সেদিন। ২২ এপ্রিল।

Continues below advertisement

সেদিন কী ঘটেছিল 

কাশ্মীরের পহেলগাঁওতে জঙ্গি হামলায় মৃত্যু হয় ২৬ পর্যটকের। একেবারে ধর্ম পরিচয় জিগ্যেস করে করে পুরুষদের হত্যা করে সন্ত্রাসবাদীরা। কখনও কলমা পড়তে বলে, কখনও শরীরী লক্ষণ পরীক্ষা করে, কখনও হিন্দুত্বের চিহ্ন দেখে দেখে শেষ করে দেওয়া হয় ২৬ টি অমুসলিম প্রাণ। মৃত্যু হয় এক ঘোড়সওয়ারীরওপহেলগাঁওয়ের বৈসরন ভ্যালির হাসিখুশি পরিবেশের ত্রাসের রাজত্ব চালায় বন্দুকধারীরা। হাতে-পায়ে পড়েছিলেন কেউ কেউ...আমার স্বামীকে ছেড়ে দিন...ছেলেটাকে ছেড়ে দিন...আর উত্তরে জঙ্গিরা বলেছিল...যা মোদিকে গিয়ে বল ! ভারত দেখল সন্ত্রাসের ভয়ঙ্করতম রূপ। রক্ত ঝরল, কেঁপে উঠল শহর, ডুকরে উঠল অসংখ্য পরিবার। রক্তে লেখা হল সেই ভয়ঙ্কর অধ্যায়

হামলার দায় স্বীকার

নৃশংস জঙ্গি হামলার দায় স্বীকার করে পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠী লস্করতইবারছায়া সংগঠন’ দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (টিআরএফ)। পাকিস্তান সরাসরি এই জঙ্গিহানার দায় অস্বীকার করলেও প্রতিটি ক্ষেত্রেই পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ মদতের ছায়া স্পষ্ট হয়ে যায়। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “পাকিস্তানের এর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। এটা পুরোপুরি ভারতের অভ্যন্তরীন ঘটনা।'' কিন্তু তদন্তে স্পষ্ট হয়ে যায় এই হামলার পেছনে পাক জঙ্গি সংগঠনই।

কারা মারা গিয়েছিলেন 

মৃত ২৬ জনের তালিকায় ছিলেন ২৬ বছর বয়সি নৌসেনা আধিকারিক লেফটেন্যান্ট বিনয় নারওয়াল। তাঁর বিয়ে হয়েছিল ওই ঘটনার মাত্র ৬ দিন আগে। মধুচন্দ্রিমায় কাশ্মীর গিয়ে প্রাণ হারান তিনি। নববিবাহিতা স্ত্রীর সেই ডুকরে ওঠা কান্না ও সামনে স্বামীর মরদেহ পড়ে থাকার ভয়ঙ্কর ছবিটি ভাইরাল হয়এছাড়াও প্রাণ হারান এক আইবি আধিকারিক, অরুণাচলের বাসিন্দা বায়ুসেনার এক কর্মীওতালিকায় ছিল তিন বাঙালি। মারা যান দক্ষিণ কলকাতার বৈষ্ণবঘাটা লেনের বাসিন্দা বিতান অধিকারী। কাশ্মীরে জঙ্গি হামলায় নিহত হন বেহালার বাসিন্দা সমীর গুহ। প্রাণ যায় হায়দরাবাদে কর্মরত IB অফিসার পুরুলিয়ার বাসিন্দা মণীশ রঞ্জনের। তদন্তে কী কী উঠে এল 

তদন্তে নেমে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উঠে আসে ভারতের গোয়েন্দাদের হাতে। জানা যায়, এই জঙ্গিরা বহুদিন ধরেই রেকে করছিল। নানারকম ছকও ছিল। শেষমেষ পর্যটকদেরই টার্গেট করার সিদ্ধান্ত হয়। জানা যায়, প্রথমে আইইডি বিস্ফোরণের ছক করে জঙ্গিরা। পরে পরিকল্পনা বদলে হাইএন্ড অস্ত্র নিয়ে পর্যটকদের উপর হামলা চালানো হয় একেবারে ধর্ম বেছে বেছে, উদ্দেশ্য ছিল সরাসরি ভারত সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানানো, মানুষের মনে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজনের মানসিকতা  আরও উস্কে দেওয়া। জানা যায়, এই সব জঙ্গিরাই পাক ডেরায় প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। সবাই সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তান থেকে ভারতে আসেঅনেকদিন ধরেই পর্যটকদের গতিপ্রকৃতি দেখছিল তারাএই ঘটনা কার্যত স্তম্ভিত করে দেয় গোটা দেশকে। সে সময় সৌদি আরবে ছিলেব প্রধানমন্ত্রী মোদি। তিনি সফরসূচি ফিরে আসেন দেশে। হামলার রাতেই কাশ্মীরে পৌঁছোন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। একের পর এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক চলতে থাকে। এদিকে দেশের মানুষ ফুঁসতে থাকে - প্রতিশোধ চাই...প্রতিশোধ চাই।

বিরোধীদের প্রশ্ন

অন্যদিকে আবার বিরোধীরা প্রশ্ন তোলে, হামলার দিন বৈসরনে কেন কোনও সেনাকে দেখা যায়নি? কী ভাবে এত সময় নিয়ে এমন ঘৃণ্য হত্যালীলা চালাতে পারল জঙ্গিরা? দিল্লিতে সর্বদল বৈঠকে মূলত এই প্রশ্নই তোলেন কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে, আম আদমি পার্টি সাংসদ সঞ্জয় সিং-সহ বাকিরা। এই প্রশ্ন তোলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ওপাকিস্তানকে ভারতের জবাব  এই হামলার পরে আসমুদ্র হিমাচলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঘৃণা আরও তীব্র হয়। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনার পারদ আরও চড়তে থাকে। অস্ত্রে জবাব দেওয়ার আগে ভারত পাকিস্তানকে কূটনৈতিক ভাবে জবাব দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। সেই উদ্দেশে ভারত সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত করে। গর্জে ওঠে পাকিস্তান। ভারতকে রীতিমতো হুমকি দেওয়া শুরু করে পাকিস্তান। এরপর ভারত একে একে পাকিস্তানি কূটনীতিকদের দেশ ছাড়তে বলে। তারপর এদেশ থেকে পাক নাগরিকদের চলে যেতে বলে এক্কেবারে সময় বেঁধে দিয়ে । বন্ধ করা হয় সীমান্তসীমান্ত বন্ধ, জল ও স্থল বন্দরের মাধ্যমে আমদানি বন্ধ, সিন্ধু জলচুক্তি রদ করা-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। এরপর ২২ এপ্রিলের জঙ্গি হানার ১৫ দিনের মধ্যে ৬ মে রাতে পাকিস্তান ও পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে প্রত্যাঘাত চালায় ভারতীয় সেনা। অপারেশ সিঁদুরের ধুলোয় মিশে যায় ৯ টি জঙ্গি ঘাঁটি , তার মধ্যে ছিল মৌলানা মাসুদ আজাহারের সাম্রাজ্য।