হরিয়ানার একেবারে সাধারণ ঘরের মেয়ে, সন্দেহভাজন পাক গুপ্তচর জ্যোতি মালহোত্রাই এখন শিরোনামে। এই ইউটিউবারের বৈভবে ভরা জীবনযাপন এখন সকলের নজরে। সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দুতে তার চালচলন। একের পর এক দেশে বেড়ানো, পাঁচতারা হোটেলে থাকা, এসবের খরচা বহন করতেন কি জ্যোতি একাই? সন্দেহভাজন পাক গুপ্তচরের সোর্স অফ ইনকামও চলে এসেছে তদন্তকারীদের নজরে। এই পরিস্থিতি মনে করিয়ে দিচ্ছে সেজল কপূরের কথা। এই নাম ব্যবহার করেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বহু দুঁদে ভারতীয় অফিসারকে আবিষ্ট করেছিলেন এক মহিলা। জানা যায়, ৯৮ জন আধিকারিককে ফাঁসিয়ে ভারতের সরকারি ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত তথ্য জানার চেষ্টা হয়েছিল। সেজলের রূপ-যৌবন-লাস্যের চুম্বকে আকৃষ্ট হতেন বহুজনই। সেটাই ছিল পাকিস্তানের হানি ট্র্যাপ।
জ্যোতির আগেও অনেক পুরুষ ও মহিলাকে ব্যবহার করেছে পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। ভারতীয় নাম পরিচয় ব্যবহার করে তারা সহজেই এই সব আধিকারিকদের মোহাবিষ্ট করত। প্রেমের ফাঁদে ফেলে বের করে আনত দেশের গোপন তথ্য ।
আইএসআই গুপ্তচর ' সেজল কপূর' একটি ভুয়ো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে, নানা ভাবে কয়েক বছরের মধ্যে ৯৮ জনকে টার্গেট করে জালে ফেলেছিল। টাইমস অফল ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি, ২০১৯ সালে এই 'সেজল কপূর' নাম ব্যবহার করে হানিট্র্যাপ বিস্তার করেছিল। পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থার হয়ে ভারতীয় প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের টার্গেট করা হত।
জানা যায়, 'সেজল কপূর' নাম ব্যবহার করে একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট তৈরি করে, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাব এবং উত্তরপ্রদেশে ভারতীয় সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, আধাসামরিক বাহিনী এবং রাজ্য পুলিশ কর্মী সহ বিভিন্ন বিভাগের ৯৮ জনেরও বেশি কর্মকর্তার কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক করা হয়। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনের মতে, পাকিস্তানের এই গুপ্তচর ফেসবুকে নানা নাম ব্যবহার করত। সেজল কপূর, নেহা শর্মা, পূজা রঞ্জন, অনামিকা শর্মা ও অদিতি অগ্রওয়ালের মতো ভারতীয় নামে ভুয়ো আইডি তৈরি করে ভারতীয় কর্মকর্তাদের প্রলোভন দেখাত।
সেজল কপূর নামে করা ফেসবুক প্রোফাইলে দেখা যায়, তিনি ইউকে-তে হেজ অ্যাভিয়েশনে কাজ কর্মরত। একটি থার্ড-পার্টি সার্ভার থেকে সব কাজটাই হত। একটি ম্যালওয়্যারের সাহায্যে তার ভিডিও ও ছবি দেখিয়ে মানুষকে টার্গেট করা হত। এই সেজল কপূর নামক ফাঁদের কথা সামনে আসে ২০১৮ সালে ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের তথ্য ফাঁসের ঘটনায়ও।
কীভাবে সেজল কপূরের পর্দাফাঁস হল?
উত্তরপ্রদেশের এটিএস ও সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ (এমআই) সেজল কপূর নামে অ্যাকাউন্টের কীর্তি ফাঁস করে। ব্রহ্মোসের ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পের ইঞ্জিনিয়ার নিশান্ত আগরওয়াল গ্রেফতার হওয়ার পরই বিষয়টা সামনে আসে। নিশান্তকেও সেজল হানিট্র্যাপে ফাঁসিয়েছিল। ইউপি পুলিশ ও এমআই এই মহিলা গুপ্তচরের ৬০টিরও বেশি চ্যাটের সন্ধান পায়। সেজল যে স্পাই অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করত, সেটি স্টিলথ মোডে কাজ করত। এতে সেলফ-অ্যাওয়ার ডিটেকশন টেকনোলজি ছিল, যার ফলে কম্পিউটারে ইন্সটল করা অ্যান্টি-ম্যালওয়্যার প্রোগ্রাম তার পরিচয় শনাক্ত করতে পারত না।
নাগপুরে ব্রহ্মোস অ্যারোস্পেস প্রাইভেট লিমিটেডের ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত একজন ইঞ্জিনিয়ারকে ২০১৮ সালে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ওই ইঞ্জিনিয়ার পাকিস্তানের আইএসআই (ISI)-কে এই প্রকল্প সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
ব্রহ্মোস অ্যারোস্পেস ইউনিটে কাজ করতেন নিশান্ত
ইউপি এটিএস নিশান্তকে গ্রেফতার করে। তিনি ব্রহ্মোস অ্যারোস্পেস ইউনিটের একজন সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তিনি ব্রহ্মোসের প্রোডাকশন ডিপার্টমেন্টের হাইড্রোলিক্স-নিউমেটিক্স ও ওয়ারহেড ইন্টিগ্রেশন উইংয়ের প্রধান ছিলেন। প্রতিবেদনের মতে, তিনি নাগপুর ও পিলানিতে ব্রহ্মোসের সাইটগুলিতে নতুন প্রকল্পের তত্ত্বাবধানও করছিলেন। ইউপি এটিএস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিনি ২০১৭-১৮ সালে তিনি ভারত সরকারের থেকে যুব বিজ্ঞানী পুরস্কারও পান।
ইউপি এটিএস-এর তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানতে পারেন এভাবে ঝোপ বুঝে কোপ মারা হত। নানা নামে আকর্ষণের জাল বিছানো হত। ইউপি এটিএস-এর মতে, সেজল অন্য একজন ভারতীয় বিমানবাহিনীর কর্মীর কাছে বলেছিলেন যে তিনি ম্যানচেস্টারের একজন ছাত্রী।
পাকিস্তান থেকে সক্রিয় ছিল ফেসবুক অ্যাকাউন্ট
পুলিশ জানিয়েছে, নিশান্ত আগরওয়ালের ফেসবুকে আরও দুজন বন্ধু ছিলেন। নেহা শর্মা ও পূজা রঞ্জন। এদের অ্যাকাউন্টও পাকিস্তান থেকে সক্রিয় ছিল। ইউপি এটিএস আদালতকে জানায়, সেজলের নির্দেশে নিশান্ত আগরওয়াল তিনটি লিঙ্কে ক্লিক করেছিলেন এবং তার ব্যক্তিগত ল্যাপটপে তিনটি অ্যাপ কুইস্পার, চ্যাট টু হায়ার ও এক্স-ট্রাস্ট ইন্সটল করেছিলেন। তাতেই সব তথ্য হ্যাক হয়ে যায়।