নয়াদিল্লি: বিরোধীদের আপত্তি উড়িয়ে সংসদে পাস হয়ে গেল ‘রূপান্তরকামী ব্যক্তিবর্গের অধিকার রক্ষা সংশোধনী বিল’। বুধবার রাজ্যসভায় ধ্বনিভোটে পাস হয়ে গেল বিলটি। লোকসভায় আগেই পাস হয়ে গিয়েছিল। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু সই করলেই সেই আইনে পরিণত হবে। যদিও বিলটি নিয়ে গোড়া থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছেন বিরোধীরা। এমনকি সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত প্যানেলও বিলটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। এতে রূপান্তরকামী বা ছকভাঙা লিঙ্গ পরিচয়কে আঁকড়ে বেঁচে থাকা মানুষজন বিপদে পড়বেন বলে আশঙ্কা। (Transgender Amendment Bill Passed)

Continues below advertisement

এর আগে, ২০১৯ সালের যে আইন ছিল, তাতে বলা ছিল, একজন নাগরিক নিজেই নিজের লিঙ্গ পরিচয় নির্ধারণ করতে পারবেন অর্থাৎ লিঙ্গ পরিচয় হবে স্ব-স্বীকৃত। নারী-পুরুষ হিসেবে যেমন বাকিরা নিজেদের পরিচয় নির্ধারণ করেন, তেমনই রূপান্তরকামী-সহ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষজন নিজ নিজ লিঙ্গ পরিচয় নির্ধারণ করতে পারবেন। এমনকি ২০১৪ সালে NALSA বনাম ভারত সরকারের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দেয়, তাতে রূপান্তরকামীদের তৃতীয় লিঙ্গের পরিচয়কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। Sex Reassignment Surgery বা লিঙ্গ পুনর্নির্ধারণের অস্ত্রোপচার না করিয়েই নিজ নিজ লিঙ্গ পরিচয় নির্ধারণ করার অধিকারকেও স্বীকৃতি দেয় সর্বোচ্চ আদালত। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষজন যাতে সামাজিক, শিক্ষাগত এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা পান, সংরক্ষণ পান, কেন্দ্রকে সেই মতো নির্দেশ দেওয়া হয়। (Transgender Amendment Bill)

কিন্তু নরেন্দ্র মোদি সরকারের ‘রূপান্তরকামী ব্যক্তিবর্গের অধিকার রক্ষা সংশোধনী বিল’ সুপ্রিম কোর্টের সেই রায়েরও পরিপন্থী বলে গোড়া থেকেই দাবি করে আসছেন বিরোধী থেকে সমাজকর্মীরা। কারণ বিলটিতে বলা হয়েছে-

Continues below advertisement

২০১৯ সালের আইনে বলা ছিল, জন্মের সময় লিখে দেওয়া লিঙ্গের সঙ্গে পরবর্তীতে যদি একাত্মবোধ না করেন কেউ, নিজের অন্য লিঙ্গ পরিচয়কে সামনে রাখেন, তাঁরাই রূপান্তরকামী বলে গণ্য হবেন। রূপান্তরকামীর এই যে ব্যাপক সংজ্ঞা, তা থেকে সরে এসেছে মোদি সরকার। নয়া বিলটিতে বলা রয়েছে, রূপান্তরকামী সুরক্ষা আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে রূপান্তরকামী ব্যক্তির সংজ্ঞা নিয়ে কিছু সন্দেহের উদ্রেক ঘটেছে, জটিলতা দেখা দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এমন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

নয়া বিলটিতে বলা হয়েছে, ‘কিন্নর’, ‘হিজড়া’, ‘আরবনী’, ‘যোগিতা’, শারীরিক ভাবে উভলিঙ্গ (ইন্টারসেক্সড)-এর মতো পরম্পরাগত গোষ্ঠীর মানুষজনই রূপান্তরকামী হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন। এই আইনের উদ্দেশ্য হল সামাজিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে রূপান্তরকামী হিসেবে পরিচিত মানুষ, যাঁরা সামাজিক বৈষম্যের শিকার, চরম নিপীড়নের শিকার, তাঁদের সুরক্ষা প্রদান করা। বিচিত্র লিঙ্গ পরিচয়, স্ব-স্বীকৃত যৌন বা লিঙ্গ পরিচয়, অথবা পরিবর্তনশীল লিঙ্গসত্তার (Gender Fluidity) অধিকারী প্রত্যেক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া কখনওই এই আইনের লক্ষ্য ছিল না। রূপান্তরকামী পরিভাষাটিকে একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা প্রদান এবং ভিন্ন ভিন্ন যৌন পরিচয় ও স্ব-স্বীকৃত লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষকে এই আইনের আওতা থেকে বাদ দেওয়াই লক্ষ্য।  স্পষ্ট ভাবে বলা হচ্ছে, ভিন্ন ভিন্ন যৌন অভিমুখ বা স্ব-স্বীকৃত লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষ রূপান্তরকামীর সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হবেন না। 

২০১৯ সালের আইনে বলা ছিল, স্ব-স্বীকৃত লিঙ্গ পরিচয়কে সামনে রেখে সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন জানানো যাবে। কিন্তু নয়া বিলটিতে স্ব-স্বীকৃত লিঙ্গ পরিচয় স্বীকৃতিই পায়নি। কেন্দ্রীয় সরকার বা রাজ্য সরকার অথবা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সরকার দ্বারা নিযুক্ত, চিফ মেডিক্যাল অফিসার বা ডেপুটি চিফ মেডিক্যাল অফিসার নেতৃত্বাধীন মেডিক্যাল বোর্ডের সুপারিশ পেলে, তা যাচাই করে দেখে তবেই সার্টিফিকেট দিতে পারবেন জেলাশাসক। 

২০১৯ সালের আইনে বলা ছিল, নিজের অনুভূতি অনুযায়ী লিঙ্গ পরিচয়কে সামনে রাখা যেত। কিন্তু নয়া বিলে বলা রয়েছে, কেউ যদি লিঙ্গ পরিবর্তনের অস্ত্রোপচার করান, তাঁদেরও রিভাইসড সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট হাসপাতালকে অস্ত্রোপচারের খুুঁটিনাটি জানাতে হবে জেলাশাসককে।

নয়া বিলে ‘জোরপূর্ব রূপান্তরকামী পরিচয় গ্রহণ’ সংক্রান্ত নতুন অপরাধের ক্যাটেগরি রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, ওষুধ খাইয়ে, অস্ত্রোপচার করিয়ে বা প্রতারণা করে কাউকে রূপান্তরকামী হতে বাধ্য করলে কড়া শাস্তি পেতে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক কাউকে রূপান্তরকামী পরিচয় গ্রহণে বাধ্য করা, জোর খাটানো বে অপহরণের ক্ষেত্রে ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। কোনও শিশুকে বাধ্য করা হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। 

নয়া বিলে নাম পরিবর্তন নিয়েও বিধান রয়েছেন। রূপান্তরকামীরা জন্মের শংসাপত্রে পদবী ছাড়া শুধুমাত্র নাম পরিবর্তন করা যাবে। লিঙ্গ পরিচয়ের সার্টিফিকেট দেখিয়ে সেই মতো পরিবর্তন ঘটানো যাবে অন্য নথিতেও। 

কেন্দ্রের দাবি, জৈবিক কারণে সামাজিক ভাবে যাঁরা কোণঠাসা, বৈষম্যের শিকার, তাঁদের সুরক্ষা দিতেই আইন সংশধন করা হচ্ছে। যদি বিরোধী শিবিরের রাজনীতিক এবং সমাজকর্মীরা বলছেন, এই বিল একটি পশ্চাদমুখী পদক্ষেপ। কারণ এতে আত্মপরিচয়ের অধিকার হরণ করা হচ্ছে। মানুষের মর্যাদা এবং মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে এই বিলে।

তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র এই বিল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। রূপান্তরকামী বা কোনও সংগঠনের সঙ্গে পরামর্শ না করেই এই বিল আনা হয় এবং মানুষের মর্যাদার সঙ্গে মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে ববে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর কথায়, "অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, যে সংসদের সাংসদ আমি, সেখানে ট্রান্সজেন্ডার বিলের নামে নাগরিকদের মর্যাদা, লিঙ্গ পরিচয়ের অধিকারের উপর বুলডোজার চালিয়ে দেওয়া হল। লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে আমার। বিজেপি সব কিছু ধ্বংস করে দেবে।" কংগ্রেসের তরফেও বিলটির তীব্র বিরোধিতা করা হয়।