নয়াদিল্লি: কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদন মিলেছে ইতিমধ্যেই। এবার ‘এক দেশ এক নির্বাচনে’ সমর্থন জানালেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। তাঁর মতে ‘এক দেশ এক নির্বাচন’ সুশাসনের সংজ্ঞা পাল্টে দেবে। এতে নীতিগত পক্ষাঘাত কাটিয়ে ওঠা যাবে, সম্পদের বিচ্যুতি প্রশমিত হবে এবং আর্থিক বোঝার ভার লাঘব হবে। (One Nation One Election)
৭৬তম প্রজাতন্ত্র দিবসের আগে শনিবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, “এই ধরনের সংস্কার ঘটাতে দূরদর্শিতা এবং সাহসের প্রয়োজন হয়। দেশের সমস্ত নির্বাচনের সমন্বয়সাধনের জন্য সংসদে উত্থাপিত ‘এক দেশ এক নির্বাচন’ বিলটি সুশাসনের সংজ্ঞা পাল্টে দিতে পারে। ‘এক দেশ এক নির্বাচন’ দেশের শাসনব্যবস্থায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে, নীতিগত পক্ষাঘাত কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে,সম্পদের বিচ্যুতি রুখবে, আরও অন্য সুবিধার পাশাপাশি, অর্থনৈতিক বোঝাও লাঘব করবে।” (Droupadi Murmu)
দেশ ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হলেও, ঔপনিবেশিক মানসিকতা রয়ে গিয়েছিল, যা বর্তমান সরকারের আমলে পাল্টাতে শুরু করেছে বলেও মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি। তাঁর কথায়, “১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা পেলেও, দীর্ঘ সময় ধরে ঔপনিবেশিক মানসিকতার বহু নিদর্শন রয়ে গিয়েছিল। ইদানীং সেই মানসিকতায় পরিবর্তন ঘটানোর প্রচেষ্টা লক্ষ্য করছি আমরা। ভারতীয় দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি এবং প্রমাণ আইনের জায়গায় জায়গায় ন্যায় সংহিতা, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা এবং ভারতীয় সাক্ষ্য অধিনিয়ম সেই প্রচেষ্টার অংশ। নতুন আইনে নারী এবং শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ দমনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রের বিজেপি সরকার বরাবরই ‘এক দেশ এক নির্বাচন’ আইন চালুর পক্ষে সওয়াল করে আসছে। তাদের দাবি, পঞ্চায়েত, পুরসভা, বিধানসভা এবং লোকসভা নির্বাচন একসঙ্গে করাতে পারলে বার বার নির্বাচন করাতে গিয়ে সময় নষ্ট হবে না, ব্যাহত হবে না উন্নয়নের কাজ, টাকা-পয়সার খরচও কমবে। এই ‘এক দেশ এক নির্বাচন’ বিল আনতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। তিনি জানান, সংবিধান প্রণেতারা একসঙ্গে নির্বাচন করার কথা বলেছিলেন, তাই একসঙ্গে নির্বাচন করানো সংবিধানের পরিপন্থী হতে পারে না। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচন একসঙ্গে হতো যখন, এখন আপত্তি কোথায়, এই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
যদিও বরাবর ‘এক দেশ এক নির্বাচনে’র বিরোধিতা করে আসছে কংগ্রেস, তৃণমূল, আম আদমি পার্টি, সমাজবাদী পার্টির মতো বিরোধী দলগুলি। তাদের দাবি, সংবিধানের মূল কাঠামোরই পরিপন্থী এই নীতি। ‘এক দেশ এক নির্বাচন’ দেশের গণতান্ত্রিক এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোরও বিরোধী বলে মত তাদের। পাশাপাশি, এই আইনের মাধ্যমে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার আসলে একটি দলের আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে বলেও অভিযোগ উঠছে।
এ প্রসঙ্গে বিরোধীরা তো বটেই রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরাও প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। তাঁদের মতে, 'এক দেশ এক নির্বাচন' চালু হলে, রাজ্যের স্থানীয় সমস্যাগুলি উপেক্ষিত থেকে যাবে। একসঙ্গে সব নির্বাচন হলে বড় দলগুলি যে পরিমাণ অর্থ খরচ করবে, তার সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারবে না ছোট দলগুলি। পাশাপাশি, নির্বাচনের পর পর সরকার পড়ে গেলে, কী ঘটবে, সেই নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থার উল্লেখ নেই বলেও দাবি বিরোধীদের।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও 'এক দেশ এক নির্বাচন' করানোর প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। কেন্দ্রকে সেই নিয়ে চিঠিও দেন তিনি। তাঁর দাবি, এই নীতি চালু হলে দেশে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। এই নীতি ভারতীয় সংবিধানের পরিপন্থী। মমতা প্রশ্ন করেন, "এক দেশের ধারণাটা ঠিক কী? ভারতীয় সংবিধান কি 'এক দেশ এক সরকার' নীতিতে চলে?" কংগ্রেস, সিপিএম-সহ অন্য বিরোধী দলগুলিও 'এক দেশ এক নির্বাচন' নীতিকে 'অগণতান্ত্রিক' বলে উল্লেখ করে।
শুধু তাই নয়, 'এক দেশ এক নির্বাচন' নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করতে যে কমিটি গঠন করা হয়, সেই নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কোবিন্দ ছাড়াও ওই কমিটিতে ছিলেন শাহ, রাজ্যসভায় প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা গোলাম নবি আজাদ, অর্থ কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান এনকে সিংহ, লোকসভা সেক্রেটারি জেনারেল সুভাষ সি কাশ্যপ, বর্ষীয়ান আইনজীবী হরিশ সালভে, ভিজিলান্স কমিশনের প্রাক্তন প্রধান সঞ্জয় কোঠারি, যাঁরা মোটামুটি ভাবে বিজেপি ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। ফলে বিশেষ একটি দলের রাজনৈতিক স্বার্থ মাথায় রেখেই এই নীতি আনতে এত তৎপরতা বলে অভিযোগ করেন বিরোধীরা।