নয়া দিল্লি: ইথানল উৎপাদনের জন্য চিনি সরিয়ে নেওয়ার কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে দেশে চিনির দাম বেড়েছে—এমন দাবি সঠিক নয় বলে জানাল কেন্দ্র। সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, ইথানল উৎপাদনের জন্য সরিয়ে নেওয়া চিনির পরিমাণ ২০২২-২৩ সালে প্রায় ১২ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫-২৬ সালে প্রায় ৯ শতাংশে নেমে এসেছে।

Continues below advertisement

কেন্দ্র এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে উৎপাদিত ইথানলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই শস্য থেকে তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল ভুট্টা। সরকার জানিয়েছে, চিনির বর্তমান পরিস্থিতির উপর তারা কড়া নজর রাখছে। একইসঙ্গে দেশের বাজারে পর্যাপ্ত চিনি সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের জন্য দাম স্থিতিশীল রাখতে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

গত কয়েক সপ্তাহে চিনির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০ জুলাই প্রতি কেজি চিনির দাম ছিল ৪৮.১৮ টাকা। ২০ অগস্ট সেই দাম বেড়ে হয়েছে ৫৫.৭০ টাকা। মন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে চিনির দাম বৃদ্ধির পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রত্যাশার তুলনায় কম দেশীয় উৎপাদন, উৎসবের মরশুমের আগে চাহিদা বৃদ্ধি, আবহাওয়াজনিত কারণে আখের ক্ষতি, বিশ্ববাজারে চিনির সরবরাহ কমে যাওয়া এবং শিল্পের কিছু অংশের জল্পনা ও মজুতদারি।

Continues below advertisement

চলতি মরশুমে দেশে চিনি উৎপাদন প্রায় ৩০৬ লক্ষ মেট্রিক টন (LMT) হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। অথচ আখ উৎপাদনকারী রাজ্যগুলির প্রাথমিক অনুমান ছিল প্রায় ৩৪৩ LMT চিনি উৎপাদনের। এছাড়াও আখের জমিতে রোগের প্রকোপ এবং অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে জল জমে যাওয়ায় চিনি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে উৎপাদন প্রত্যাশার তুলনায় কম হলেও দেশে পর্যাপ্ত চিনির মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্র। অক্টোবরে নতুন করে আখ ঝাড়াইয়ের মরশুম শুরু হওয়া পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত চিনি রয়েছে। সরকার আরও জানিয়েছে, বিশ্বজুড়েই চিনির সরবরাহ কমছে। এই সমস্যা শুধু ভারতের নয়।

২০২৬-২৭ সালে বিশ্বে চিনির ঘাটতি প্রায় ৩৩ লক্ষ মেট্রিক টন হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে। আবহাওয়া নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিশ্ববাজারে চিনির সরবরাহের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিও আরও অনিশ্চিত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। 

সরকারের বিবৃতি অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬-এ প্রতি টন চিনির আন্তর্জাতিক দাম ছিল ৪৭৪ ডলার। ২০ অগস্ট সেই দাম বেড়ে হয়েছে ৫৫২ ডলার। অর্থাৎ দু'মাসেরও কম সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বেড়েছে ১৬ শতাংশের বেশি। ভারতে সাধারণত প্রতি বছর প্রায় ৩২০-৩৪০ LMT চিনি উৎপাদন হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রায় ২৮০-২৯০ LMT।

উৎপাদন বেশি হলে অতিরিক্ত চিনি মজুত হয়ে যায়। এর ফলে চিনিকলগুলির অর্থ আটকে থাকে এবং আখ চাষিদের পাওনা মেটাতেও দেরি হতে পারে। কেন্দ্রের দাবি, অতিরিক্ত চিনিকে ইথানল উৎপাদনের দিকে সরিয়ে দেওয়ার ফলে এই দীর্ঘদিনের সমস্যার কিছুটা সমাধান হয়েছে। একইসঙ্গে চিনিকলগুলির আর্থিক অবস্থারও উন্নতি হয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, এর ফল ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। ২০ অগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত ২০২৫-২৬ চিনির মরশুমে আখ চাষিদের পাওনার ৯৭ শতাংশ ইতিমধ্যেই মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। চিনিকলগুলির আর্থিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় সরকারি সহায়তার উপর তাদের নির্ভরতাও কমেছে।

২০১৪ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে চিনি শিল্পকে প্রায় ১৪,৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২১-২২ সালের পর থেকে আর কোনও নতুন ভর্তুকি ঘোষণা করা হয়নি।

একইসঙ্গে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে চিনির দামও মোটের উপর স্থিতিশীল থেকেছে বলে দাবি কেন্দ্রের। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত চিনির দাম বছরে গড়ে মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ হারে বেড়েছে।

এদিকে চিনির মজুত নিয়েও বড় পদক্ষেপ করেছে কেন্দ্র। ১ অগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত সারা দেশে চিনি ব্যবসায়ীদের জন্য সর্বোচ্চ ৪০০ টন মজুতের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ১ সেপ্টেম্বর থেকে bulk consumers বা বড় পরিমাণে চিনি ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলি ১৫ দিনের ব্যবহারের বেশি চিনি মজুত রাখতে পারবে না।

সরকারের দাবি, এই পদক্ষেপগুলির মাধ্যমে দেশে চিনির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।