নয়াদিল্লি: আমেরিকার মসনদে দ্বিতীয় বার প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই গ্রিনল্যান্ড ‘দখলে’ হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিলেন। ভেনিজুয়েলা আক্রমণের পর, এবার কি সেই লক্ষ্যপূরণের পথে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প? হোয়াইট হাউসের মন্তব্যে অন্তত তেমনই ইঙ্গিত মিলছে। তারা জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের দখল পেতে সবদিক পর্যালোচনা করে দেখছেন ট্রাম্প। সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে যেমন আলোচনা চলছে, তেমনই টাকা দিয়ে কিনে নেওয়া যায় কি না, সেই নিয়েও কথা হচ্ছে। (Donald Trump)
গ্রিনল্যান্ডের দখল পেতে কী পরিকল্পনা ট্রাম্পের?
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর টিমের লোকজন একাধিক উপায় নিয়ে আলোচনা করছেন। সেনা নামানোর রাস্তা সবসময়ই খোলা। তবে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার ভাবনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন এক আধিকারিক। গ্রিনল্যান্ডকে Compact of Free Association চুক্তিতে অঙ্গীকারবদ্ধ করে ফেলার কথাও ভাবা হচ্ছে। (Donald Trump vs Greenland)
ইতিমধ্যেই মাইক্রোনেশিয়া, মার্শাল আইল্যান্ড এবং পালাউয়ের সঙ্গে Compact of Free Association চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার আওতায় তাদের বিভিন্ন পরিষেবা দিয়ে থাকে আমেরিকা, নিরাপত্তা প্রদান করে, শুল্কমুক্ত বাণিজ্য করতে দেয় এবং বিনিময়ে সেখানে অবাধে যা কাজ চালিয়ে যেতে পারে আমেরিকার সেনা।
আমেরিকায় ক্ষমতায় ফিরেই ডেনমার্কের হাত থেকে গ্রিনল্যান্ডকে পুরোপুরি মুক্ত করার ডাক দিয়েছিলেন ট্রাম্প। পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে গণভোট হতে হবে। ২০২৫ সালে সেই মতো একটি সমীক্ষাও হয়, যাতে দেখা যায়, গ্রিনল্যান্ডের ৫৬ শতাংশ নাগরিকই স্বাধীনতার পক্ষে। ডেনমার্কের অধীনে স্বতন্ত্র প্রদেশ হয়ে থাকতে সায় জানান ২৮ শতাংশ মানুষ। গ্রিনল্যান্ডে ইতিমধ্যেই ট্রাম্প সরকার বেশ প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে এবং বিবিধ ‘ক্যাম্পেন’ও চালাচ্ছে। ট্রাম্পের ডেপুটি চিফ অফ স্চাফ স্টিফেন মিলার CNN-কে বলেন, “গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ আমেরিকার সেনার সঙ্গে লড়তে আসবে না।”
গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকার অংশ করতে ইউক্রেনকে ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে বলেও মত কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের। ইউক্রেনকে রক্ষা করার নিশ্চয়তা প্রদান করবেন ট্রাম্প। বিনিময়ে গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকার অন্তর্ভুক্ত করতে ইউরোপের সমর্থন আদায় করবেন।
কোনও কিছুতে কাজ না হলে, সামরিক আগ্রাসনের পথও ট্রাম্প বেছে নিতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে। রয়্যাল ডেনিস ডিফেন্স কলেজের টমাস ক্রসবি বলেন, “সরাসরি ভূখণ্ড কেড়ে নেওয়ার রাস্তা, ইউক্রেন নিয়ে যে চেষ্টা করেছিলেন ভ্লাদিমির পুতিনও। উনি সেনা নামিয়ে দেশটিকে সরাসরি আমেরিকার অংশ ঘোষণা করে দিতে পারেন। গ্রিনল্যান্ডে ইচ্ছে মতো সেনা নামাতে পারে আমেরিকা, আকাশপথে, সমুদ্রপথে সেনা পাঠাতে পারে।” এতে যদিও বিপদ রয়েছে। ডেনমার্ক আগেই জানিয়েছে, আমেরিকা গ্রিনল্যান্ড দখল করতে চাইলে NATO-র অস্তিত্ব থাকবে না আর।
গ্রিনল্যান্ডের জন্য কেন এত উতলা ট্রাম্প?
হোয়াইট হাউসের যুক্তি, দেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার হাতে থাকা জরুরি। কিন্তু তাদের এই যুক্তি হজম হচ্ছে না কূটনৈতিক মহলের। বরং তাদের যুক্তি, যে কারণে ভেনিজুয়েলায় হামলা চালানো হয়েছে, যে কারণে নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করেছে আমেরিকা, সেই একই কারণে যেনতেন প্রকারে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ হাতে পেতে চায় আমেরিকা। ভেনিজুয়েলার মতো গ্রিনল্যান্ডও খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ। ১৯৫৩ সালে ঔপনিবেশিক শাসনের নিষ্পত্তি ঘটলেও, ডেনমার্কের স্বতন্ত্র অংশ হিসেবেই বিরাজ করছে আজও। ২১ লক্ষ ৬৬ হাজার ৮৬ বর্গ কিলোমিটারের আয়তন গ্রিনল্যান্ডের। সেই তুলনায় জনসংখ্যা মাত্র ৫৭ হাজার। বাসিন্দারা মূলত সেখানকারই আদি বাসিন্দা। তবে কিছু উপকূল এলাকা ছাড়া ৮০ শতাংশ অংশই ঢাকা বরফে। মৎস্যশিকারের উপরই মূলত টিকে অর্থনীতি। ডেনমার্ক সরকারও ভর্তুকি দেয় বিপুল পরিমাণ। নাগরিকরা মূলত দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে, রাজধানী নুকে বসবাস করেন
তবে ডেনমার্কের অংশ হলেও, ভৌগলিক ভাবে আমেরিকার পূর্ব উপকবলের কাছাকাছি নুক। আমেরিকা জাতীয় নিরাপত্তার কথা বার বার তুলে ধরছে। কারণ মেরুসাগরে লাগাতার সামরিক মহড়া দিয়ে চলেছে চিন এবং রাশিয়া। ডেনমার্কের প্রতি তাদের ঠেকানো সম্ভব হবে না বলে মত ট্রাম্পের। ডেনমার্কের বিদেশ মন্ত্রী লার্স লক্কে রাসমুসেন যদিও ট্রাম্পের সেই যুক্তি খারিজ করে দিয়েছেন। গত বছরই ডেনমার্ক সরকার মেরুসাগরে নজরদারিতে বাড়াতে ৬.৬৮ বিলিয়ন ডলারও মঞ্জুর করে। পাশাপাশি, NATO-র অংশ ডেনমার্ক। দেশে আমেরিকা সেনা বেশি সংখ্যক মোতায়েন করলেও আপত্তি নেই বলে জানিয়েছে তারা। কিন্তু আমেরিকার তরফে সেই নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করা হয়নি।
গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদেই কি নজর?
তাই আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আসলে গ্রিনল্যান্ডে বরফের নীচে যে খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার রয়েছে, তার উপরই নজর আমেরিকার। তেজ, প্রাকৃতিক গ্যাস, বিরল খনিজ, কিছুর অভাব নেই গ্রিনল্যান্ডে। সেখানে মাটির নীচে ৩ হাজার ১৪০ কোটি ব্যারেল তেল আছে বলে অনুমান। কিন্তু ভৌগলিক পরিবেশের কারণেই সেই উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। গ্রিনল্যান্ডে মাটির নীচে যে বিরল খনিজ সম্পদ আছে, তা দিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে সামরিক সরঞ্জাম, সবকিছুই তৈরি সম্ভব। যে বিপুল পরিমাণ ইউরেনিয়াম এবং গ্রাফাইট মজুত রয়েছে, তাতে হাতই পড়েনি এখনও পর্যন্ত। গ্রিনল্যান্ডে বরফের আস্তরণ কোথাও কোথাও ১.৬ কিলোমিটার পর্যন্ত পুরু। জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে তা গলতে শুরু করেছে কিছু জায়গায়। ফলে এখন সম্পদের নাগাল পেতে বেশি কাঠখড় পোড়াতে হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু পরিকাঠামো গড়ে তুলতে বিপুল টাকা খরচ করতে হবে। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে গ্রিনল্যান্ড উপকূলের বরফও গলছে। ধস নামছে জায়গায় জায়গায়। ফলে সেখানে সোনার খনি গড়তে যাওয়া ব্যয়সাপেক্ষ। তাই ভূ-বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ নিয়ে এত উৎসাহী ট্রাম্প যে আগুপিছু চিন্তাভাবনা করছেন না।
সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বিগত ৩০০ বছর ধরে ডেনমার্কের অংশ গ্রিনল্যান্ড। সেখানকার মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে হলেও, ডেনমার্কের পরিবর্তে আমেরিকার রাজত্ব বরদাস্ত করবেন না তাঁরা। ডেনমার্কের চেয়ে আমেরিকাকে ঢের বেশি বিপজ্জনক মনে করেন তাঁরা। সেখানকার অন্তত ৮৫ শতাংশ নাগরিক আমেরিকার কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে। যে কারণে স্থানীয় সরকার বার বার আমেরিকার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।