নয়াদিল্লি: ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে শহিদের নামে স্কুল। অথচ স্কুলটিতে সেই শহিদের নামই আর রইল না। পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর নামে স্কুলের নয়া নামকরণ হল। সেই নিয়ে তপ্ত হয়ে উঠেছে উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি। মরণোত্তর ‘পরমবীর চক্র’ প্রাপক শহিদের নাম মুছে দেওয়ার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন স্থানীয় মানুষ থেকে বিরোধী শিবিরের রাজনীতিকরা। সেই আবহে পিছু হটার কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। আগের নাম ফিরিয়ে আনা হবে বলে জানিয়েছে। (Uttar Pradesh News)

উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরের 'অমর শহিদ বীর আব্দুল হামিদ বিদ্যালয়ে'র নাম পাল্টানো নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ওই স্কুলেরই ছাত্র ছিলেন আব্দুল হামিদ, যিনি ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে শহিদ হন। সেই স্কুলের নাম পাল্টে সম্প্রতি PM Shri Composite School করে দেওয়া হয়। স্কুলের মূল ফটকের সামনে থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় আগের ‘অমর শহিদ বীর আব্দুল হামিদ বিদ্যালয়’ নামটিও। বিষয়টি সামনে আসতেই শোরগোল পড়ে যায়। ধামুপুর নিবাসী শহিদ হামিদের পরিবার অসন্তোষ উগরে দেয়। স্থানীয়রাও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত সোমবার পুরনো নামই ফের ফিরিয়ে আনা হয়। (Veer Abdul Hamid)

পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধে, তাদের Patton ট্যাঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে মৃত্যুবরণ করেন হামিদ। অসীম সাহসের জন্য মরণোত্তর ‘পরমবীর চক্র’ সম্মানে সম্মানিত করা হয় তাঁকে। ছোটবেলায় যে স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন হামিদ, তার নামকরণও হয় তাঁর নামেই। কিন্তু বলা নেই কওয়া নেই, স্কুল থেকে তাঁর নাম মুছে দেওয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান স্থানীয়রা। হামিদের পৌত্র জামিল আলম জানিয়েছেন, স্থানীয়দের এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি। নাম মুছে দিয়ে হামিদকে অসম্মান করা হয়েছে বলেও মত তাঁর। 

যদিও প্রাথমিক শিক্ষা আধিকারিক হেমন্ত রাও দাবি করেন, স্কুলের অধ্যক্ষ আগেই নাম পরিবর্তনের কথা জানিয়েছিলেন তাঁকে। সরকারি রেকর্ডে  ‘শহিদ বীর আব্দুল হামিদ বিদ্যালয়’-এর উল্লেখ নেই। বরং ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে ‘Composite School Dhamupur’ নামটিই নথিভুক্ত বলে দাবি করেন তিনি। হামিদের অসম্মান যাতে নাম হয়, বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে আশ্বাস দেন শিক্ষা আধিকারিক। আগের নাম ফিরিয়ে আনা হবে বলেও জানিয়েছেন।

দেশের গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলিকে মডেল স্কুলে পরিণত করতে ২০২২ সালে ‘PM-Shri’ প্রকল্পের সূচনা হয়। ১৪,৫০০ স্কুলকে ফেলা হয় ওই প্রকল্পের আওতায়।  এর আওতায় কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকার যথাক্রমে ৬০:৪০ অনুপাতে আর্থিক সহায়তা প্রদানে সম্মত হয়। কিন্তু শহিদের নামে নামাঙ্কিত স্কুলের নাম পরিবর্তন ঘিরে উত্তরপ্রদেশ সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করেন স্থানীয়রা। সেই মর্মে অভিযোগও জানান শিক্ষা আধিকারিকের কাছে। 

বিষয়টি নিয়ে সরব হন সমাজবাদী পার্টির সাংসদ আফজল আনসারি। তাঁর মতে, পরিকল্পনা মাফিকই দেশনায়কদের স্মৃতি মুছে দিতে চাইছে উত্তরপ্রদেশ সরকার। দেশনায়কদের অসম্মান করা হচ্ছে। তাঁর কথায়, “আব্দুল হামিদই প্রথম নন। কিছু দিন আগে প্রয়াত ব্রিগেডিয়ার মহম্মদ উসমানের নামে নামাঙ্কিত রাস্তার একটি প্রবেশদ্বার বুলডোজার দিয়ে সরানো হয়। জবরদখলের অভিযোগ তুলে প্রাক্তন কংগ্রেস সভাপতি মুখতার আহমেদ আনসারির নামে নামাঙ্কিত কলেজের দেওয়াল গুঁড়িয়ে পাল্টে দেওয়া হয়েছে।” 

উত্তরপ্রদেশের কংগ্রেস সভাপতি অজয় রাই লেখেন, ‘বীর আব্দুল হামিদের নামে নামাঙ্কিত স্কুলের নাম পাল্টানোর অর্থ দেশের ইতিহাসের সঙ্গে ছেলেখেলা করা হচ্ছে’। দেশনায়কদের কেন শত্রু মনে করছে সরকার, প্রশ্ন তোলেন তিনি। ভীম আর্মির প্রধান চন্দ্রশেখরও গোটা ঘটনার নিন্দা করেন। দেশের জন্য আত্মবলিদান দিয়েছেন যাঁরা, তাঁদের সঙ্গে এমন হওয়া কাম্য নয় বলে জানান তিনি। রাজ্য শিক্ষা দফতরকে ক্ষমা চাইতে হবে বলেও দাবি জানান।

যে শহিদ হামিদ আনসারির নাম মুছে দেওয়া নিয়ে বিতর্ক, গতবছর জুলাই মাসেই তাঁর জীবনীর উদ্বোধনীতে উপস্থিত ছিলেন বিজেপি-র অভিভাবক সংস্থা রাষ্ট্রীয় স্বয়ম সেবক সঙ্ঘ (RSS)-এর প্রধান মোহন ভাগবত। ‘মেরে পাপা পরমবীর’ বইটির লেখক রামচন্দ্রণ শ্রীনিবাসীন। শহিদ হামিদের ছেসে জয়নুল হাসানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা বইটি।

তবে যোগী আদিত্যনাথের আমলে উত্তরপ্রদেশে বিজেপি-র সরকার এমন নাম পরিবর্তনের কাজ আগেো করেছে। মুসলিম নাম মুছে দেওয়ার উদ্য়োগ চোখে পড়েছে বিশেষ করে। আলিগড়ের নাম পাল্টে হরিগড় করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি, এলাহাবাদের নাম পাল্টে প্রয়াগরাজ করা হয়। মুঘলসরাই স্টেশনের নাম এখন পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় স্টেশন। ফৈজাবাদ জেলে এখন অযোধ্যা।