কলকাতা: জামনগর থেকে কোলাপুরে ফিরছে ‘মহাদেবী’। যদিও কোলাপুরবাসীর কাছে ‘মহাদেবী’ আসলে 'মাধুরী'। সকলের বড্ড আদরের সে। গত বছরের ৩০ জুলাই মাধুরীকে জামনগরের ভান্তারায় পাঠানো হয়েছিল। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির (HPC) নির্দেশে মাধুরী জামনগরের রাধে কৃষ্ণ টেম্পল এলিফ্যান্ট ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টে (Radha Krishna Temple Elephant Welfare Trust - RKTEWT) এসে পৌঁছায়। এই নির্দেশিকা বোম্বে হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টও বহাল রেখেছিল। ভান্তারা তার কাস্টডি চায়নি। আদালতের নির্দেশ মেনেই তার দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছিল। কিন্তু এবার ফেরার পালা। ভান্তারা জানিয়েছে যে, ৩৬ বছর বয়সী আদরের 'মাধুরী' ফিরে গেলেও তার স্বাস্থ্য ও দেখভালের উপর নজরদারি অব্যাহত রাখবে তারা। 

Continues below advertisement

হাতিটির ঘটনাটি মহারাষ্ট্রে, বিশেষ করে কোলাপুরের মানুষের কাছে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। কারণ, এখানে সে নন্দনী জৈন মঠে কয়েক দশক কাটিয়েছিল। এরপর তার স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, প্রাণী কল্যাণ কর্তৃপক্ষ ও পেটা ইন্ডিয়ার আইনি কার্যক্রমের পর তাকে স্থানান্তর করা হয় ভান্তারায়।

ভান্তারা জানিয়েছে যে, কোলহাপুরে তৈরি হওয়া মাধুরীর প্রতি গভীর আবেগ ও অনুভূতির বিষয়টি তাঁরা বোঝেন। তাই, তারা শুধু উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করবে।

Continues below advertisement

কোলাপুরে ফেরার অনুমতি দিল এইচপিসি (HPC)

মাধুরীকে নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট একটি নির্দেশিকা জারি করে। যেখানে বলা হয় যে, মাধুরীকে নিয়ে সব পক্ষকে তাদের বক্তব্য উচ্চ পর্যায়ের কমিটির (HPC) সামনে পেশ করতে হবে। এই নির্দেশ মেনে, সব পক্ষই তাদের বক্তব্য পেশ করেন এবং সবার বক্তব্য শোনার পর, বিভিন্ন রিপোর্টগুলো যাচাই করে এবং নন্দিনি নামক জায়গাটি পরিদর্শন করার পর গত ৯ সেপ্টেম্বর উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে মাধুরীকে কোলাপুরে ফেরত পাঠানোর অনুমতি দেয়।

কী কী শর্ত মেনে চলতে হবে ?১. মাধুরীকে কোনও শোভাযাত্রা বা অন্য কোনও উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না।২. মাধুরীকে সর্বক্ষণ যথাযথ যত্নে রাখতে হবে। ৩. প্রতি ১৫ দিন অন্তর মাধুরীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে।

ভান্তারা জানিয়েছে, তারা এইচপিসি-র এই সমস্ত সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছে এবং মাধুরীর ফেরার সঙ্গে যুক্ত শর্তগুলো যথাযথ ভাবে পালন করবে। ভান্তারা কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে যে, মাধুরীকে নিয়ে তারা সবসময়ই পশু চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়েছে এবং তার সুস্থতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। 

নিয়মিত চিকিৎসা ও যত্নের কারণে বর্তমানে মাধুরীর শারীরিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে তার দীর্ঘদিনের যে শারীরিক সমস্যাগুলি ছিল, সেগুলি পুরোপুরি সেরে যায়নি। তাই এখনও তার চিকিৎসা, বিশেষ যত্ন এবং নিয়মিত পশুচিকিৎসকের নজরদারির প্রয়োজন। ভান্তারায় তার চিকিৎসা হওয়ার পর বেশ কিছু দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা ঠিক হয়েছে, কিন্তু এখনও পশুচিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী তত্ত্বাবধান এবং সহায়ক পরিচর্যা প্রয়োজন।

ভান্তারা জানিয়েছে, মাধুরী এখন আর জামনগরে না থাকলেও তাদের সম্পৃক্ততা অব্যাহত থাকবে। মাধুরীর জন্য নন্দিনীতে উপযুক্ত থাকার জায়গা, চিকিৎসার পরিকাঠামো, চিকিৎসার সরঞ্জাম, ওষুধপত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এইচপিসি-র নির্দেশনা অনুযায়ী, ভান্তারার পশু চিকিৎসকরা প্রতি ১৫ দিন অন্তর কোলাপুরে গিয়ে মাধুরীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন এবং এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিকিৎসার রিপোর্ট জমা দিতে হবে। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হল, চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং মাধুরীর যত্ন যাতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকে তা নিশ্চিত করা। মাধুরী যে জায়গায় ফিরে যাচ্ছে, তার প্রত্যাবর্তনের আগে ভান্তারা নন্দিনী এনক্লোজারেও (Nandani Enclosure) অতিরিক্ত কাজ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে যতদূর সম্ভব জায়গাটির উন্নতি করা হয়েছে। যদিও নগর পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু ক্ষেত্রে নির্মাণকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সংস্থাটির মতে, ট্রাস্টের জমির মধ্যে দিয়ে একটি রাস্তা চলে যাওয়ায় উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা কমে গেছে।

ভান্তারা জানিয়েছে, মাধুরী তার চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার পর সেই জায়গাটি আরও উন্নত করতে সহায়তা করবে। তারা আরও জানায় যে, আদালত বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পেলে তারা জায়গাটিতে আরও আধুনিক ভাবে উন্নয়ন করতে পাশে থাকবে।

ভান্তারা জানাচ্ছে, মাধুরীকে কোথায় রাখা হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে নয়, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পশুচিকিৎসা ও প্রাণী কল্যাণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ভান্তারা বিশ্বাস করে যে, প্রকৃত প্রাণী কল্যাণের জন্য প্রয়োজন হয় তথ্য, পশুচিকিৎসা বিজ্ঞান, দায়িত্বশীল যত্ন, যথাযথ প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা এবং জীবনকে চিরতরে রক্ষা করার এক অটল অঙ্গীকার। মাধুরীকে নিয়ে নির্দেশ দেওয়ার জন্য ভান্তারা সুপ্রিম কোর্ট, বম্বে হাইকোর্ট এবং কমিটিকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। মহারাষ্ট্র ও গুজরাট সরকার এবং তাদের আধিকারিকদের সহযোগিতা, জৈন মঠ এবং কোলাপুরের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে তারা।

সবশেষে ভান্তারা জানিয়েছে, মাধুরীর সুস্থতা এখনও তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সে কোথায় থাকছে, তার উপর ভান্তারার দায়িত্ব বা তাঁর স্বাস্থ্যের প্রতি নজরদারি নির্ভর করবে না। মাধুরীর সুস্থতা, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি থাকবে।

এইচপিসি-র সামনে মাধুরীর শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরার জন্য পেটা ইন্ডিয়ার (PETA India)-র ভূমিকাকেও সাধুবাদ জানিয়েছে তারা। কিন্তু সবকিছুর উর্দ্ধে মাধুরীর মঙ্গলই ভান্তারার সর্বাগ্রে। ভান্তারার মতে, সে কোথায় বাস করে তার উপর নির্ভর করে না তার স্বাস্থ্য ও নজরদারি। আমরা তার সুস্বাস্থ্য এবং নিরাপদ ও সুখী জীবন কামনা করি।