নয়াদিল্লি: টানাপোড়েন চলছিল বেশ কিছু দিন ধরেই। হুঁশিয়ারি, পাল্টা হুঁশিয়ারিও শোনা যাচ্ছিল। তবে ভোররাতে হঠাৎ আক্রমণ নেমে আসবে, বুঝতে পারেননি কেউই। তাই আমেরিকা ভেনিজুয়েলা আক্রমণ করতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। ভোররাতে পর পর রকেট বর্ষণের পর ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে বন্দি করেছে আমেরিকা। ইতিমধ্যেই ভেনিজুয়েলা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাঁদের। আমেরিকার মাটিতেই দু’জনের বিচার হবে বলে জানিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকার। (US Attacks Venezuela)
বেশ কিছু দিন ধরেই ভেনিজুয়েলাকে হুঁশিয়ারি দিচ্ছিলেন ট্রাম্প। ক্যারিবিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরে তাদের জাহাজ লক্ষ্য করে কমপক্ষে ৩০ বার হামলাও চালানো হয়েছে, যাতে শতাধিক মানুষ মারা গিয়েছেন। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে ভেনিজুয়েলার তেলের ট্যাঙ্কারও। পাশাপাশি, ভেনিজুয়েলায় এর আগেও রকেট ছুড়েছে আমেরিকা। সম্প্রতি CIA-কে কঠোর পদক্ষেপের স্বাধীনতা দেন ট্রাম্প। ‘গ্রাউন্ড অপারেশন’ চালানো হবে বলে জানান নিজেও। আর তার পরই শনিবার ভোররাতে ভেনিজুয়েলায় পর পর বিস্ফোরণ ঘটে। বন্দি করা হয় মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে। (World Condemns US Attack on Venezuela
আচমকা ঘটনা চরমে পৌঁছে যাওয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মহলও। রাশিয়ার তরফে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়, 'ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে আমেরিকা যে সশস্ত্র আগ্রাসন দেখিয়েছে, তার তীব্র নিন্দা করছে মস্কো। বর্তমান পরিস্থিতিতে অবিলম্বে সংযত হতে হবে, আলাপ আলোচনার মাধ্যমে রাস্তা বের করতে হবে। ভেনিজুয়েলাকে নিজের ভাগ্য নিজেকে ঠিক করার অধিকার দিতে হবে অবশ্যই। বাইরে থেকে কোনও ধ্বংসাত্মক এবং সামরিক হস্তক্ষেপ চলবে না। ভেনিজুয়েলার সাধারণ মানুষের পাশে আছি আমরা, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে মাথায় রেখে দেশের নেতারা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তার প্রতি সমর্থন আছে'।
পরে আরও একটি বিবৃতি প্রকাশ করে বলা হয়, 'ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রী আমেরিকায় বলে নিশ্চিত ভাবে জানা গিয়েছে। আমরা পরিষ্কার বলছি, আমেরিকা নিজেদের অবস্থান বিবেচনা করে দেখুক এবং একটি সার্বভৌম দেশের, বৈধ ভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর স্ত্রীকে মুক্তি দিক'।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো লেখেন, ‘গোটা বিশ্বকে সতর্ক করছি যে ওরা ভেনিজুয়েলা আক্রমণ করেছে। যে কোও ধরনের সশস্ত্র সংঘাতের ক্ষেত্রেই কলম্বিয়া শান্তি ও আন্তর্জাতিক সম্মান রক্ষার পক্ষে, জীবন ও মর্যাদা রক্ষার পক্ষে’। অন্য একটি পোস্টে লেখেন, ‘ভেনিজুয়েলা ও লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের উপর এই আক্রমণ নিন্দনীয়’। ভেনিজুয়েলা সীমান্তে সেনা মেতায়েন করছেন বলেও জানিয়েছেন পেত্রো।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল লেখে, ‘ভেনিজুয়েলার উপর যে অপরাধমূলক আক্রমণ চালানো হয়েছে, তার তীব্র নিন্দা করছে তীব্র। আন্তর্জাতিক মহলকেও অবিলম্বে একবাক্যে এর নিন্দায় সরব হতে আর্জি জানাচ্ছে। ভেনিজুয়েলার সাহসি মানুষের বিরুদ্ধে, আমাদের আমেরিকার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চলছে। মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু, আমরা হাসিল করবই!’
এর আগে, চিনের তরফেও সতর্ক করা হয়েছিল আমেরিকাকে। বহির্শক্তির হস্তক্ষেপে লাতিন আমেরিকায় মানবিক সঙ্কট দেখা দিতে পারে বলে মত তাদের। কারও সার্বভৌমত্ব বা তৈলভাণ্ডারের উপর আক্রমণ বরদাস্ত করা বলে না বলে জানিয়েছে তারা। চিন ও ভেনিজুয়েলার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অত্যন্ত মজবুত। শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভেনিজুয়েলা চিনকে সহযোগিতাও জোগায়। ভেনিজুয়েলা থেকে বিপুল পরিমাণ অশোধিত তেল আমদানি করে চিন। পাশাপাশি,ভেনিজুয়েলায় বিনিয়োগও আছে তাদের। চিনের তৈরি অস্ত্রশস্ত্রই ব্যবহার করে ভেনিজুয়েলার সেনা। চিনের মতে, আমেরিকার জন্য লাতিন আমেরিকা 'নতুন যুদ্ধক্ষেত্র' হতে পারে না। তেমনটা ঘটলে গোটা বিশ্বকে মাশুল গুনতে হবে। 'আগুন নিয়ে খেলা করা উচিত নয়' বলে আমেরিকাকে সতর্ক করেছে চিন এবং রাশিয়া, দুই দেশই।
এদিন ফের বিবৃতি দিয়ে চিন বলে, 'যেভাবে একটি সার্বভৌম দেশের বিরুদ্ধে গায়ের জোর খাটিয়েছে চিন, তাতে চিন স্তম্ভিত এবং আমরা এর তীব্র নিন্দা করছি। আমেরিকার এই আধিপত্যবাদী আচরণ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে, ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হয়েছে, লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ানের শান্তি ও নিরাপত্তা লঙ্ঘিত হয়েছে। চিন কঠোর ভাবে এর বিরোধিতা করছে। আমরা আমেরিকাকে বলছি, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলুক তারা, রাষ্ট্রপুঞ্জের বিধিনিয়ম মেনে চলুক। অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা এভাবে লঙ্ঘন করা চলবে না'।
চিলের প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বরিক ফ্রন্ত লেখেন, 'আমরা শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে। আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আমরা, যার আওতায় বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ, জোরপূর্বক হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ। আন্তর্জাতিক বিরোধে শান্তিপূর্ণ সমাধান বের করা উচিত, রাষ্ট্রের আঞ্চলির অখণ্ডতা বজায় রাখা উচিত। ভেনিজুয়েলার এই সঙ্কট আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা উচিত, হিংসা বা বিদেশি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নয়'।
ইরানের সর্বোচ্চ শাসক আয়াতোল্লা আলি খামেনেই লিখিত বিবৃতিতে বলেন, 'একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে, শত্রুপক্ষ মিথ্যে অভিযোগ তুলে কোনও সরকার বা জাতির উপর কিছু চাপিয়ে দিতে চাইছে বুঝলে, দৃঢ় ভাবে সেই শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। আমরা মাথানত করব না। ওপরওয়ালা এবং আত্মবিশ্বাসে ভর পরে, মানুষের সমর্থনে শত্রুকে নতজানু করব আমরা'। ইরানের বিদেশমন্ত্রক জানিয়েছে, আমেরিকা যেভাবে হামলা চালিয়েছে ভেনিজুয়েলায়, তাতে দেশটির জাতীয় সার্বভৌমত্ব যেমন লঙ্ঘিত হয়েছে, তেমনই আঞ্চলিক অখণ্ডতার উপরও আঘাত হানা হয়েছে।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়েনের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি বিভাগের প্রতিনিধি কাজা কালাস জানিয়েছেন, আমেরিকার বিদেশ সচিব মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা হয়েছে তাঁর। কথা হয়েছে কারাকাসে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিনিধির সঙ্গেও। পরিস্থিতির দিকে লাগাতার নজর রাখা হচ্ছে। তবে মাদুরোকে মোটেই সমর্থন করছে না ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। তাদের বক্তব্য, 'ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বার বার বলেছে মাদুরো শাসনকার্য চালানোর আইনি বৈধতা হারিয়েছেন। শান্তিপূর্ণ ভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে বার বার। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রপুঞ্জের বিধিনিয়মকে সম্মান জানাতে হবে। আমরা সংযত হতে বলছি সকলককে। ওই দেশে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নাগরিকদের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ'।
স্পেনের তরফেও সব পক্ষকে সংযত হতে বলা হয়েছে। ভেনিজুয়েলায় আন্তর্জাতিক আইন যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে, সুপারিশ করেছে তারা। শান্তিপূ্রণ সমাধান বের করতে মধ্যস্থতাতেও রাজি স্পেন।
জার্মানির বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য়, 'আমরা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি। কারাকাসে দূতাবাসের সঙ্গেও যোগাযোগ রয়েছে'।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেন, "পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন তিনি। সেখানে ইতালীয় নাগরিকরা কী অবস্থায় আছেন, জানার চেষ্টা করছেন।" এই মুহূর্তে ভেনিজুয়েলায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার ইতালীয় রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি, যাঁদের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে।
সবিস্তার আসছে