কেরল: ঘরের মাঠে মোহনবাগান সুপার জায়ান্টকে চাপে ফেলে দিয়েছিল কেরল ব্লাস্টার্স (Kearala Blaster vs Mohun Bagan)। কিন্তু সেই চাপ তারা কাটাল তো বটেই, উল্টে তাদের ৩-০-য় হারিয়ে শহরে ফিরছে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। ইন্ডিয়ান সুপার লিগে কোচির জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়াম কখনও খালি হাতে ফেরায়নি সবুজ-মেরুন বাহিনীকে। শনিবারও তাদের তিন পয়েন্ট এনে দিল কোচির পয়া মাঠ। এ দিন জেমি ম্যাকলারেনের জোড়া গোল এবং আলবার্তো রড্রিগেজের জয়সূচক গোলে ব্লাস্টার্সকে হারিয়ে লিগ শিল্ডের আরও কাছে পৌঁছে গেল। পরের ম্যাচে ওডিশা এফসি-কে হারাতে পারলেই টানা দ্বিতীয়বার শিল্ড জয় করবে তারা। শনিবার ২৮ ও ৪০ মিনিটের মাথায় জেমি ম্যাকলারেনের দু’টি অনবদ্য গোলে এগিয়ে যায় গতবারের শিল্ডজয়ীরা। দ্বিতীয়ার্ধে ৬৬ মিনিটের মাথায় দলকে তৃতীয় গোল এনে দেন সুযোগসন্ধানী আলবার্তো রড্রিগেজ। এ দিন সারা ম্যাচে দশটি শট নেয় মোহনবাগান, যার মধ্যে চারটি ছিল লক্ষ্যে, যার মধ্যে তিনটিকে গোলে পরিণত করে তারা। অন্য দিকে, ব্লাস্টার্সের ন’টি শটের মধ্যে দু’টি ছিল লক্ষ্যে। এ দিন সারা ম্যাচে ছ’টি গোলের সুযোগ তৈরি করে মোহনবাগান, আটটি সুযোগ পায় ব্লাস্টার্স। হোম টিম যেখানে প্রতিপক্ষের বক্সে ২২ বার বল ছোঁয়, সেখানে বাগান-বাহিনী ১৫বার বল ছুঁয়েছে। ফাইনাল থার্ডে কেরলর দল যেখানে ঢুকেছে ৬৩বার, সেখানে সবুজ-মেরুন বাহিনী ঢুকেছে ৩৯বার। ২৮টি ক্রস দেয় হলুদ বাহিনী। কিন্তু দুর্ভেদ্য সবুজ-মেরুন রক্ষণে চিড় ধরাতে পারেনি তারা। বরাবরের মতোই অবনদ্য পারফরম্যান্স দেখান শুভাশিস বোস, যিনি এ দিন ছ’টি ক্লিয়ারেন্স করেন, ছ’বার বল পুনর্দখল করেন এবং দশটির মধ্যে ছ’টি ডুয়াল জেতেন। এই নিখুঁত রক্ষণ ও আক্রমণের ভারসাম্য এনেই সাফল্য অর্জন করে সবুজ-মেরুন বাহিনী। এই নিয়ে শেষ পাঁচটি ম্যাচের সবকটিতেই গোল অক্ষত রাখল মোহনবাগান এসজি। শেষ দশটি ম্যাচের মধ্যে সাতটিতেই ক্লিন শিট রাখলেন সবুজ-মেরুন গোলপ্রহরী বিশাল কয়েথ। সব মিলিয়ে দশটি ক্লিন শিট রাখলেন তিনি। তাদের অস্ট্রেলীয় স্ট্রাইকার জেমি ম্যাকলারেন এ দিনের জোড়া গোলের সঙ্গে দশ গোলের ক্লাবে ঢুকে পড়েন। চলতি লিগের সর্বোচ্চ স্কোরারদের তালিকায় তিনি সেরা পাঁচেও চলে এলেন তিনি। আর টানা তিন ম্যাচে চারটি অ্যাসিস্ট দিয়ে রেকর্ড বইয়ে ঢুকে পড়লেন আর এক অস্ট্রেলীয় জেসন কামিংসও। দিমিত্রিয়স পেট্রাটস ও রয় কৃষ্ণার পরে আইএসএলে মোহনবাগানের হয়ে টানা তিন ম্যাচে অ্যাসিস্ট করা তৃতীয় ফুটবলার তিনি। এ দিন টম অলড্রেড, কামিংস ও আপুইয়া বাগান-বাহিনীতে ফেরেন গ্রেগ স্টুয়ার্ট, আশিস রাই ও সহাল আব্দুল সামাদের জায়গায়। শুরু থেকেই মোহনবাগান এসজি-কে প্রবল চাপে ফেলে দেয় কেরল ব্লাস্টার্স। ঘন ঘন আক্রমণের ঝড় তুলে মোহনবাগান রক্ষণকে হিমশিম খাইয়ে দেন ইয়েসুস জিমিনিজ, কোয়ামে পেপরা, আদ্রিয়ান লুনা, কোরু সিংরা। তাদের প্রবল ও তীব্র আক্রমণের চাপে সবুজ-মেরুন রক্ষণে প্রায় সব সময়ই পাঁচ-ছ’জন ফুটবলারকে দেখা যাচ্ছিল। তাদের প্রায় পুরো দলটাই নীচে নেমে আসে প্রতিপক্ষের আক্রমণ রোখার জন্য। ম্যাচের ২১ মিনিটের মাথায় জিমিনিজ ও ২৬ মিনিটের মাথায় আমাউইয়া প্রায় অবধারিত গোলের সুযোগ হাতছাড়া করেন। প্রথমটিতে শুভাশিস বোসের অসাধারণ ব্লক ও পরের বার বিশাল কয়েথের দুরন্ত সেভ তাদের সাফল্যের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ব্লাস্টার্সের আক্রমণের তীব্রতা দেখে মোহনবাগান কী ভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, সেই প্রশ্ন জেগে ওঠে সমর্থকদের মনে। আক্রমণে ঝড় তোলা ব্লাস্টার্সকে পাল্টা চাপে ফেলতে প্রতি আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করে বাগান-বাহিনী এবং ২৮ মিনিটের মাথাতেই এসে যায় আকাঙ্খিত সাফল্য, যখন কোলাসোর ক্রস থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন জেমি ম্যাকলারেন। বাঁ দিক দিয়ে ওঠা লিস্টন কোলাসো প্রতিপক্ষের লুনা ও সন্দীপ সিংকে ড্রিবল করে বল পাঠান প্রথম পোস্টের সামনে ম্যাকলারেনের কাছে। তাঁকেও ঘিরে ছিলেন দুই ডিফেন্ডার। কিন্তু তাঁদের ধোঁকা দিয়ে গোলে শট নেন তিনি, যা গোলের ছাদের জালে জড়িয়ে যায় (১-০)। এই গোলের পরেই ম্যাচে ফিরতে শুরু করে মোহনবাগান এবং তারা পাল্টা চাপে ফেলে দেয় ব্লাস্টার্সকে। তবু সমতা আনার চেষ্টা চালিয়ে যান জিমিনিজরা। কিন্তু ব্যবধান বাড়ানোর জন্য মরিয়া মোহনবাগানের আক্রমণের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। ৩৪ মিনিটের মাথায় বক্সের বাঁ দিক থেকে লিস্টনের হাওয়ায় বাঁক খাওয়ানো অনবদ্য শট অল্পের জন্য দ্বিতীয় পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়। তবে দ্বিতীয় গোল পেতে বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি গতবারের শিল্ড চ্যাম্পিয়নদের। ৪০ মিনিটের মাথায় ফের অনবদ্য গোল করে দলকে আরও এগিয়ে দেন ম্যাকলারেন। মাঝমাঠ থেকে আপুইয়ার হেড করা বল প্রথমে ম্যাকলারেনের পায়ে পড়ে এবং তিনি জেসন কামিংসকে ব্যাক পাস করে তীব্র গতিতে গোলের দিকে এগিয়ে যান। এগিয়ে যাওয়া ম্যাকলারেনকে ফরোয়ার্ড থ্রু বাড়ান কামিংস এবং গোলকিপার শচীন সুরেশের মাথার ওপর দিয়ে বল গোলে পাঠিয়ে দেন ম্যাকলারেন (২-০)। সংযুক্ত সময়ের প্রথম মিনিটেও ফের জালে বল জড়ান তিনি। তবে তিনি অফসাইডে থাকায় সেই গোল বাতিল হয়ে যায়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে ফের আক্রমণাত্মক মেজাজে দেখা যায় ব্লাস্টার্সকে। তবে প্রথমার্ধের মতো মোহনবাগানকে কোণঠাসা করে দিতে পারেনি তারা। প্রতি আক্রমণে ওঠে তারা বারবার। এমনই এক প্রতি আক্রমণে উঠতে গিয়ে ব্লাস্টার্সের বক্সের ডানদিক থেকে ফ্রি কিক পায় সবুজ-মেরুন বাহিনী এবং সেই ফ্রি কিক থেকেই ফের গোল পায় তারা। ৬৫তম মিনিটে মনবীর সিং ডান প্রান্ত থেকে একটি ফ্রি-কিক আদায় করেন এবং সেট-পিস থেকে মোহনবাগান একাধিক সুযোগ তৈরি করে। কামিংস দূর থেকে বাঁ-পায়ের শট নেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে সেটি ব্লক হয়ে যায়। এরপর দীপক টাংরি ও আলবার্তো রড্রিগেজ বলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গোলে শট নেওয়ার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত, বাঁ দিক থেকে বল জালে জড়ান স্প্যানিশ ডিফেন্ডার এবং দলের তৃতীয় গোলটি করে দলের তিন পয়েন্ট নিশ্চিত করেন (৩-০)। তবে তিন নম্বর গোলের পরও মোহনবাগান ব্যবধান বাড়ানোর চেষ্টা ছাড়েনি। তাদের আক্রমণাত্মক ফুটবল কেরল ব্লাস্টার্স এফসি-র রক্ষণভাগকে নিয়মিত পরীক্ষার মুখে ফেলে। ৮০তম মিনিটে কামিংসের জায়গায় নামা দিমিত্রিয়স পেট্রাটসের ক্রস সরাসরি টম অলড্রেডের কাছে পৌঁছয়, যার হেড পোস্টের বাঁ দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আশিক কুরুনিয়ান ডান দিকের কঠিন কোণ থেকে পেট্রাটসকে বল দেন, তবে তিনি পাস না দিয়ে সরাসরি শট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তিনি সফল না হলেও তাঁর দল অবশ্য সেরার শিরোপার দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে যায় এ দিন। অপেক্ষা আর মাত্র তিন পয়েন্টের।
(তথ্য: আইএসএল মিডিয়া)
আরও পড়ুন: লিগ তালিকার তলানিতে দুই দল, কলকাতা ডার্বিতে আত্মসম্মানের লড়াইয়ে মুখোমুখি ইস্টবেঙ্গল-মহামেডান