গ্রামীণ স্বাস্থ্যপরিষেবায় এক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সাক্ষী থাকল বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর সিএমও CMO কার্যালয়ের অডিটোরিয়াম। ‘EzeCheck’ নামে একটি আধুনিক নন-ইনভেসিভ (রক্তবিহীন) হিমোগ্লোবিন মাপার যন্ত্রের উদ্বোধনী প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নিলেন ১১০-রও বেশি স্বাস্থ্যকর্মী। বিষ্ণুপুর মহকুমার এই উদ্যোগকে গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা বলেই মনে করা হচ্ছে।

Continues below advertisement

এই প্রযুক্তি এনেছে EzeRx পশ্চিমবঙ্গ-ভিত্তিক একটি ভারতীয় Health Tech সংস্থা, যারা ব্যথাহীন ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যপরীক্ষার জন্য কাজ করছে। তাদের তৈরি ‘EzeCheck’ যন্ত্রটি আঙুলে সেন্সর ব্যবহার করে মাত্র ৬০ সেকেন্ডের মধ্যে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা নির্ণয় করতে সক্ষম, যেখানে কোনও রক্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয় না।

উল্লেখযোগ্যভাবে, এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে   একাধিক শীর্ষ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে, যেমন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং অ্যাপোলো হাসপাতালে পরীক্ষিত ও স্বীকৃত হয়েছে, যা এই উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও দৃঢ় করেছে। 

Continues below advertisement

গ্রামে স্বাস্থ্যপরীক্ষায় নতুন দিশা

গ্রামীণ এলাকায় রক্তাল্পতা (Anemia) একটি বড় সমস্যা হলেও, সূঁচের ভয় এবং প্যাথলজি ল্যাবের দূরত্বের কারণে অনেকেই পরীক্ষা করাতে চান না। এই প্রেক্ষিতে ‘EzeCheck’ এক কার্যকর সমাধান হিসেবে সামনে এসেছে। এটি সম্পূর্ণ সূঁচবিহীন, ব্যথাহীন এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য ফলে শিশু, কিশোরী গর্ভবতী মহিলাদের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তশূন্যতা শুধু একটি সাধারণ স্বাস্থ্যসমস্যা নয় এটি ক্লান্তি, গর্ভপাত, শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া এবং মাতৃমৃত্যুর মতো গুরুতর ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই দ্রুত ও সহজ স্ক্রিনিং অত্যন্ত জরুরি।

প্রযুক্তির বৈশিষ্ট্য কার্যকারিতা

EzeCheck’ অপটিক্যাল সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-ভিত্তিক অ্যালগরিদম ব্যবহার করে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা নির্ধারণ করে। যন্ত্রটি ব্যাটারি চালিত হওয়ায় বিদ্যুৎবিহীন এলাকাতেও সহজে ব্যবহার করা যায়। এছাড়া এতে কোনও স্ট্রিপ, রিএজেন্ট বা ডিসপোজেবল সামগ্রী লাগে না, ফলে দীর্ঘমেয়াদে খরচও কম।

এই যন্ত্রটি ICMR–RMCBB দ্বারা ক্লিনিক্যালি পরীক্ষিত এবং প্রায় ৯৩% নির্ভুলতার সঙ্গে ফলাফল প্রদান করতে সক্ষম। পাশাপাশি, এটি CDSCO অনুমোদিত এবং ISO ও IEC-সার্টিফায়েড Class B মেডিক্যাল ডিভাইস হিসেবে স্বীকৃত, যা এর গুণমান ও নিরাপত্তার মানদণ্ডকে নিশ্চিত করে।

একইসঙ্গে, IoT-ভিত্তিক ডেটা সিস্টেমের মাধ্যমে পরীক্ষার ফলাফল ক্লাউডে সংরক্ষণ করা যায় এবং রিয়েল-টাইমে বিশ্লেষণ সম্ভব হয়।

উল্লেখযোগ্যভাবে, এই প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্য কর্মসূচি যেমন Anemia Mukt Bharat, RBSK (স্কুলপড়ুয়া শিশুদের জন্য), Beti Bachao Beti Padhao, Swasth Nari Sashakt Parivar এবং POSHAN অভিযান এ ব্যবহৃত হচ্ছে, যা দেশজুড়ে অ্যানিমিয়া প্রতিরোধ ও পুষ্টি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ।

এছাড়াও, বিভিন্ন CSR অংশীদার, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা (NGO), স্কুল, হাসপাতাল, ব্লাড ব্যাংক, হাসপাতালের OPD এবং কর্মক্ষেত্রভিত্তিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

যন্ত্র বিতরণের আগে পূর্ণদিবসের নিবিড় অধিবেশন

যন্ত্র ব্যবহারের আগে বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর সিএমও CMO কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে একটি পূর্ণ-দিনের নিবিড় প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেন কমিউনিটি হেলথ অফিসার (CHO), অক্সিলিয়ারি নার্স মিডওয়াইফ (ANM) সহ ১১০-রও বেশি স্বাস্থ্যকর্মী। অনেকেই দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা স্বাস্থ্যকর্মীরাও এই প্রশিক্ষণে অংশ নেন।

প্রশিক্ষণে স্বাস্থ্যকর্মীরা শিখেছেন-

  • কীভাবে যন্ত্রটি পরিচালনা করতে হয়
  • হিমোগ্লোবিনের রিপোর্ট কীভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়
  • RBSK ও ‘অ্যানিমিয়া মুক্ত বাংলা’ প্রকল্পে ডেটা কীভাবে লগ করতে হয়
  • রোগী, বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী মহিলাদের কীভাবে আশ্বস্ত করতে হয়

এই কর্মশালা শুধু প্রযুক্তিগত নয়, আবেগঘনও ছিল। অনেক স্বাস্থ্যকর্মী জানান, সূঁচের ভয়ের কারণে পূর্বে বহু রোগী পরীক্ষা করাতে রাজি হতেন না। এখন এই যন্ত্রের মাধ্যমে সেই বাধা অনেকটাই দূর হবে।

সরকারি প্রকল্পে সংযুক্তি উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা:

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের (CMO) তত্ত্বাবধানে ‘EzeCheck’ এখন RBSK (রাষ্ট্রীয় বাল স্বাস্থ্য কর্মসূচি) এবং ‘অ্যানিমিয়া মুক্ত বাংলা’ (Anemia Mukt Bengal) প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে। এর ফলে শিশু, কিশোরী ও গর্ভবতী মহিলাদের বৃহৎ পরিসরে দ্রুত স্ক্রিনিং সম্ভব হবে।

প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন জেলা ও মহকুমা স্তরের একাধিক স্বাস্থ্য আধিকারিক, ডেপুটি সিএমওএইচ(DMCHO), বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারসহ, সিএমওএইচ(CMOH) বিষ্ণুপুর, অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাঁরা শুধু উদ্বোধনে সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং পুরো প্রশিক্ষণ পর্যবেক্ষণ করেন এবং যন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্বেও অংশ নেন।

সোনামুখীতে দ্রুত অ্যানিমিয়া শনাক্ত করছে EzeCheck, মাঠে মিলছে ইতিবাচক সাড়া

প্রশিক্ষণের পর থেকেই সোনামুখী সরকারি গ্রামীণ হাসপাতালে ‘EzeCheck’ ব্যবহার শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা এখন ক্যাম্প ও নিয়মিত পরিদর্শনের সময় দ্রুত হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা করতে পারছেন। আগে যেখানে দিনে ১৫–২০ জনের বেশি পরীক্ষা করা কঠিন ছিল, এখন সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, রোগীদের ভয় কমায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণের হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই উদ্যোগের পাশাপাশি, ডায়মন্ড হারবার সরকারি মেডিক্যাল কলেজের ব্লাড ব্যাংকেও একটি ‘EzeCheck’ যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে রক্তদাতাদের প্রাথমিক স্ক্রিনিং আরও দ্রুত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে।

Disclaimer: This is a sponsored article. ABP Network Pvt. Ltd. and/or ABP Live does not in any manner whatsoever endorse/subscribe to the contents of this article and/or views expressed herein. Reader discretion is advised.