কলকাতা: পুরসভার স্ক্যানারে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তি। ১৭টি ঠিকানায় পৌঁছে গিয়েছে নোটিসও। বেআইনি নির্মাণ সাত দিনের মধ্যে ভাঙা না হলে, পুরসভাই ভেঙে দেবে এবং সেই টাকা আদায় করা হবে বলে জানানো হয়েছে। সেই নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যে অভিষেকের হয়ে মাঠে নামলেন তৃণমূল নেতৃত্ব। অভিষেকের সম্পত্তি নিয়ে দলের অবস্থান জানালেন কুণাল ঘোষ, ফিরহাদ হাকিমরা। বেছে বেছে তৃণমূলের নেতাদের কালিমালিপ্ত করা করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ তুলেছেন কুণাল। ফিরহাদের দাবি, কলকাতা পুরসভার মেয়র হলেও, বিষয়টি তাঁর এক্তিয়ারের বাইরে। নোটিসের ব্যাপারে কিছুই জানতেন না তিনি। অভিষেকের কী বক্তব্য, তাও এদিন তুলে ধরা হয়। তবে নোটিসের প্রশ্নে ফিরহাদ দায় এড়ালেন বলেই মনে করা হচ্ছে। (Abhishek Banerjee Assets)
বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন কুণাল এবং ফিরহাদ। সেখানে দলের অবস্থান নিয়ে জানান, বিজেপি-র তরফে একটি তালিকা ফাঁস করে দেওয়া হয়েছে। কলকাতা পুরসভার নোটিস বলে দাবি করে একাধিক অভিষেকের সম্পত্তির তালিকা দেখানো হয়েছে নথিতে। অন্য নেতাদেরও নামও জড়ানো হয়েছে তাতে। গত কয়েক দিন ধরে যে নোটিস ঘুরছে, যা রটানো হচ্ছে, তা মিথ্যে, ভুয়ো এবং সাজানো। কিন্তু যে একাধিক ঠিকানায় নোটিস গিয়েছে, তার দায় নেননি কুণাল। তাঁকে বলতে শোনা যায়, "বাড়ি কার, নোটিস গিয়েছে কি না, এটা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়।" (TMC News)
আরও পড়ুন: বিধানসভায় বিরোধী দলের মর্যাদা নিয়ে জটিলতা, স্পিকারকে চিঠি দিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্য়ায়
এদিন সাংবাদিক বৈঠকের শুরুতেই দলের বিবৃতি পড়ে শোনান কুণাল। তিনি বলেন, "আমাদের অনুরোধ, আপনারা দয়া করে ঠিকানাগুলি ধরে চেক করে নেন, মনে হয় সেক্ষেত্রে সত্য উঠে আসবে। তৃণমূল মনে করছে, বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে, দল এবং দলের কিছু নেতাকে কালিমালিপ্ত করতে, সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং আর একজনকে জড়িয়ে এই ধরনের প্রচার চলছে। এটাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যে, সাজানো এবং বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে চিহ্নিত করছে দল।" অভিষেকের প্রতিক্রিয়াও এদিন তুলে ধরেন কুণাল। বলেন, "অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য়, তিনি এই ধরনের অপপ্রচারের কাছে কোনও অবস্থায় মাথানত করবেন না।"
আরও পড়ুন: কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পেলেন তৃণমূল সাংসদ, বেসুরো হয়ে মুখ খোলার পরই, জল্পনা তুঙ্গে
কলকাতায় অভিষেকের ২৪টি সম্পত্তি আছে বলে সম্প্রতি মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এর পরই কলকাতার ১৭টি ঠিকানায় পুরসভার তরফে নোটিস পৌঁছয়। অভিষেক, তাঁর মা, বাবা এবং লিপস অ্যান্ড বাউন্ডসের ঠিকানায় পৌঁছয় নোটিস। সায়নী ঘোষ নামের কারও সঙ্গে অভিষেকের যৌথ সম্পত্তি রয়েছে বলেও গুঞ্জন শোনা যায়। সেই সায়নী তৃণমূল সাংসদ সায়নী কি না, শুরু হয় জল্পনা। সায়নী যদিও সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়ে দেন, তাঁর তেমন কোনও সম্পত্তি নেই। নিজের সব সম্পত্তির খতিয়ান নির্বাচনী হলফনামাতেই দিয়েছেন তিনি। সেই আবহেই এদিন এই সাংবাদিক বৈঠক।
যে কলকাতা পুরসভার তরফে নোটিস পাঠানো হয়, তার মেয়র এখনও ফিরহাদ। অভিষেককে নোটিস পাঠানোর বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছিল। এদিন ফিরহাদ বলেন, "আমি স্পষ্ট ভাবে বলতে চাই যে, এব্য়াপারে কিছু জানি না আমি। জানার কথাও নয়। পুরসভার বিল্ডিং বিভাগ কাকে নোটিস দেবে, কাকে দেবে না, কোন নোটিসে কী সেকশন, তা আমাদের পলিসি ম্যাটার নয়। আমার এক্তিয়ারে পড়ে না। এই ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নই আমি। পুরো ঘটনাটি জানা নেই আমার।"
কিন্তু মেয়রকে না জানিয়ে কি এই ধরনের নোটিস দেওয়া যায়? ফিরহাদের যুক্তি, "মেয়রকে জানানোর কথাই নয়। কারণ নোটিসটা বিল্ডিংটা বিভাগের। কোন বিল্ডিং হচ্ছে, না হচ্ছে, রেগুলার মনিটর করা, রক্ষণাবেক্ষণ...এটা আমাকে জানানোর কথা নয়।" কলকাতা পুরসভার লোগো বসানো যে তালিকা ঘুরছে, তা নিয়ে ফিরহাদ বলেন, "আমার মনে হয় একটু ভেরিফাই করে নিন আপনারা।" নোটিস পাঠানোর কথাও তিনি জানেন না বলে দাবি ফিরহাদের। তিনি আরও বলেন, "মেটিয়াবুরুজে বিল্ডিং পড়ে যাওয়ার সময়ই বলেছিলাম, নির্বাচিত হন যাঁরা, তাঁরা নীতি তৈরি করেন। এগজিকিউশন করে কমিশন। এটাই পুরসভা আইন। দৈনন্দিন কাজ, নোটিস, বেআইনি বিল্ডিং আটকানো, নতুন বিল্ডিং স্যাংশন করায় জনপ্রতিনিধিরা থাকতে পারেন না। কাকে GST নম্বর দেওয়া হচ্ছে, না হচ্ছে, তা দেখা কাজ নয় নির্বাচিত বিধায়ক-সাংসদদের। তেমনই পুরসভার নোটিস সংক্রান্ত বিষয়টিও আমার এক্তিয়ারের বাইরে।"
যে তালিকা সামনে এসেছে, যে নোটিস এসেছে, তা নিয়ে তদন্তের দাবি তুলেছে কুণাল। তাঁর কথায়, "কার বাড়িতে কী নোটিস যাচ্ছে, সেটা সেই বিভাগের স্পিসিফিক কাজ। দলের পক্ষেও জানা সম্ভব নয়। দলের মুখপাত্র হিসেবে বলছি, বাড়িটা সত্যিই কার, পুরোদস্তুর তদন্ত হোক। যেটা ঘুরছে, ভিত্তিহীন জিনিস ছড়ায় যারা, কারা এসব রটাচ্ছে, তা নিয়েও তদন্ত হোক। আসল হলে আইন আইনের পথে চলবে! একটা তালিকা ঘুরছে, দল স্পষ্ট ভাবে বলছে, পুরসভার নোটিস যেটা আনঅফিসিয়ালি বিজেপি ফাঁস করেছে, যার সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম জড়ানো হচ্ছে এবং অন্য নেতাদেরও জড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে...সেই নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে যা চলছে, তা সাজানো, মিথ্যে এবং ভুয়ো।"
এ নিয়ে বিজেপি-র মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার ফিরহাদ এবং কুণালকে কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, “কী নিষ্পাপ কথাবার্তা! ১৫ বছর…কেউ কিছু জানেন না! সেই রাবীন্দ্রিক কবিতা। খুকি তোমার কিচ্ছু বোঝে না মাগো, খুকি তোমার ভারী ছেলেমানুষ। এত বড় বড় বাড়ি তৈরি হয়ে গেল। শান্তিনিকেতনের বোর্ড বসে গেল। ১৪ বার সেখানে গিয়ে মিটিং করতেন। সামনে দিয়ে মাছি গলতে পারত না। মশাকেও পারমিশন নিয়ে আসতে হতো। আজ আর আপনারা কিছু জানেন না! মেয়র কিছু জানেন না! কুণাল ঘোষ, প্রধান মুখপাত্র। আরও কী সব দায়িত্বে ছিলেন, রাষ্ট্রপুঞ্জের সমান দায়িত্ব। এসব বললে আর হবে না। সবাই মিলে চুরি করেছেন। সবাই চোর। সবাই যুক্ত। সেটাই মানুষ বলছেন। কোর্টে যখন বিচার হবে বোঝা যাবে কে চোর, কে সাধু। এমন একটা লোকের অধীনে কাজ করেছেন, মুখ খোলেননি কেন? তার কি উত্তর দেবেন এঁরা?”
