উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায়, অনির্বাণ বিশ্বাস ও ঐশী মুখোপাধ্যায়: বিনামূল্যে বিদ্যুৎ, জল দেওয়ার ট্র্য়াক রেকর্ড ছিল অরবিন্দ কেজরিওয়ালের। বরং বিজেপি-র খয়রাতির প্রতিশ্রুতিতেই বিশ্বাস রাখলেন দিল্লিবাসী। আর এখানেই প্রশ্ন, তাহলে কী কোন দল ক্ষমতায় এলে কত কী দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবে, তার উপরই নির্ভর করবে কি বাংলার ভোটের ফলাফল? কারণ, কে কত দেবে, তা নিয়ে এখন থেকেই প্রতিযোগিতা করছে তৃণমূল বিজেপি। (West Bengal Assembly Elections 2026)
কেউ কেউ বলেন, 'ভেট দিয়ে ভোট কেনা'। কেউ আবার বলেন 'জনমুখী প্রকল্প'। যে যাই বলুন না কেন, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শনিবার দিল্লির ভোটের ফলে জনমোহিনী প্রকল্পের জয়ও হল, আবার হারও হল। কারণ, এবারের দিল্লির ভোটে বিজেপি এবং আম আদমি পার্টির মধ্যে কে ভোটারদের কোন প্রকল্পে কত টাকা দিতে পারে, কিংবা কত কী ফ্রি দিতে পারে, তারই লড়াই হয়েছে। ফ্রি বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে, ফ্রি ওষুধ, এরকমই নানা ফ্রি-এর ছড়াছড়িকে হাতিয়ার করে গত ১০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন কেজরিওয়াল। এবার, তাঁরই কৌশল হাতিয়ার করে তাঁকে হারাতে ঝাঁপায় বিজেপি। (Delhi Elections 2025)
কেজরিওয়াল মহিলাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, মাসে ২ হাজার ১০০ টাকা অর্থ সাহায্যের। আর বিজেপি-র প্রতিশ্রুতি ছিল মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়ার। পাশাপাশি, বিজেপি বলেছিল, ক্ষমতায় এলে গর্ভবতী মহিলাদের ২১ হাজার টাকা সাহায্য দেবে। এলপিজি গ্যাসে ছাড় দেবে ৫০০ টাকা। পাল্টা, আম আদমি পার্টি বলেছিল, তারা অটো-ট্যাক্সি চালকদের জন্য জীবনবিমা ও দুর্ঘটনাজনিত বিমা এবং তাঁদের মেয়েদের বিয়েতে ১ লক্ষ টাকার সাহায্য দেবে।
দিনের শেষে দেখা গেল, কেজরিওয়ালের ১০ বছরের ফ্রিতে দেওয়ার ট্র্যাক রেকর্ডে নয়, বিজেপির প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রাখলেন দিল্লিবাসী। দিল্লিতে জয়ী হওয়ার পর যে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, তাতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, "দেশের নারীশক্তির আশীর্বাদ আমাদের সবচেে বড় রক্ষাকবচ। আজ ফের একবার নারীশক্তি আমাদের আশীর্বাদ দিয়েছেন। ওড়িশা হোক বা মহারাষ্ট্র, অথবা হরিয়ানা, প্রত্যেক রাজ্যে নারীশক্তিকে দেওযা সব প্রতিশ্রুতি পালন করেছি আমরা। দিল্লির নারীশক্তিকে বলছি, আপনাদের দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হবে। এটা মোদির গ্যারান্টি। আর মোদির গ্যারান্টি মানে পূরণ হওয়ার গ্যারান্টি।"
এখন প্রশ্ন হল, পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬-এর নির্বাচনে কী হবে? কারণ, এখানেও 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার', 'কন্যাশ্রী', 'যুবশ্রী'-এমন নানা প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষের হাতে টাকা পৌঁছে দিচ্ছে তৃণমূল সরকার এবং একের পর এক ভোটে জয়ীও হচ্ছে তারা। তৃণমূল ১ হাজার টাকার 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' দিচ্ছে, তো বিজেপি বলছে ক্ষমতায় এলে ৩ হাজার দেবে। তৃণমূল সরকার বাংলার বাড়ি প্রকল্পে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা দিচ্ছে। পাল্টা, শুভেন্দু অধিকারী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, ক্ষমতায় এলে তা বাড়িয়ে ৩ লক্ষ টাকা করে দেবেন তাঁরা।
শুভেন্দুকে বলতে শোনা যায়, "১ হাজার টাকার ভাতা দেয় রাজ্য়। এবারের বাজেটে ৫০০ টাকা বাড়বে বলে গেলাম। ১৫০০০ টাকা হবে। আমরা এলে ৩০০০ করে দেব। ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা বাড়ি হয় না। যা পেয়েছেন নিয়ে নিন। যাঁরা ১ লক্ষ ২০ পেয়েছেন, আমরা এলে তিন মাসের মধ্যে আরও ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা দেব। আর যাঁরা পাননি, তালিকা তৈরি রাখুন, ৩ লক্ষ টাকার বাড়ি।"
এ নিয়ে যদিও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি তৃণমূলের রাজ্য সম্পাদক কুণাল ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, "বাংলায় বিজেপি দিশাহারা। অপমান করেছিল। এবার লোকে হাসবে। মমতার ইচ্ছে আছে বাড়ানোর। কিন্তু কেন্দ্র টাকা দেয় না।" তাহলে ক্ষমতায় এলে কোন দল কত টাকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবে, তার উপর কি বাংলার নির্বাচনের ফলাফলও নির্ভর করবে আগামী দিনে? দিল্লির ফলাফল নিয়ে রাজ্য বিজেপি-র সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেন, "ফ্রি-র প্রলোভনে পড়েননি মানুষ। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দুর্নীতিমুক্ত সরকারের জন্য রায় দিয়েছেন।"
কিন্তু দুর্নীতি না খয়রাতি? ডবল ইঞ্জিন না বাঙালির জাত্যাভিমান? ২০২৬ সালের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ভোটের প্রধান ইস্যু হবে কোনটি? অধ্যাপক জাদ মামুদের মতে, দিল্লির বার্ষিক আয় এবং বাংলার বার্ষিক আয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। রাস্তা, নিকাশি, অনেক কিছু রয়েছে। অর্থাৎ দিনের শেষে গণতন্ত্রে মানুষই ভগবান। কাকে ভোট দেবেন, সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁরাই।